প্রসেসর, এআই অ্যাকসেলারেটর, জিপিইউ, স্টোরেজ ও র্যামের মতো হার্ডওয়্যার তৈরিতে ব্যবহৃত হয় সিলিকন চিপ। সিলিকন ওয়েফার থেকে লিথোগ্রাফি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব চিপ তৈরি করা হয়। লিথোগ্রাফি প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল, এ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি করে থাকে। সর্বাধুনিক ২ বা ৩ ন্যানোমিটার লিথোগ্রাফিতে ব্যবহৃত যন্ত্র মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, যার নাম এএসএমএল। নেদারল্যান্ডভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানের যন্ত্র কাজে লাগিয়ে চিপ তৈরি করে টিএসএমসি, ইন্টেল ও স্যামসাংয়ের মতো চিপ জায়ান্ট। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, এএসএমএল কোনো যন্ত্র চীনের কাছে বিক্রি করতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞার আগে যেসব যন্ত্র কিনেছে চীন, সেগুলোও সার্ভিস করা যাবে না। অর্থাৎ চীনকে কোনোভাবেই অত্যাধুনিক প্রসেসর বা এআই হার্ডওয়্যার তৈরি করতে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। হুয়াওয়ে বা লুংসুনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো শক্তিশালী এবং ব্যাটারি সাশ্রয়ী প্রসেসর বানাতে না পারার নেপথ্য কারণ এটাই।
ঘোস্ট মেশিন
১৫ জুন যুক্তরাষ্ট্রের কমার্স সেক্রেটারি হাওয়ার্ড লাটনিক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, গোপন সূত্রে জানা গেছে যে এএসএমএল তাদের সর্বাধুনিক ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির লিথোগ্রাফি মেশিন চীনের কাছে বিক্রি করেছে। বর্ডাররক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেটি চোরাচালানি পথে চীনে প্রবেশ করেছে বলে তিনি জানান। এএসএমএলের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এমন দাবি হাস্যকর। লিথোগ্রাফি মেশিনের ওজন প্রায় ১৮০ টন, সেটি বহনের জন্য এএসএমএল নিজস্ব কাস্টোমাইজড বোয়িং ৭৪৭ বিমান ব্যবহার করে থাকে। বিশ্বে মোট ৩১৪টি মেশিন ডেলিভারি করেছে তারা, এর কোনোটিই বর্তমানে চীনে অবস্থান করছে না। লিথোগ্রাফি মেশিন ঠিকমতো সেটআপ করা অত্যন্ত কঠিন, এএসএমএলের ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কেউ করতে পারবেন না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে বলা হচ্ছে অযৌক্তিক। এএসএমএলের যন্ত্র চীনে প্রবেশ করেছে কি না, এ নিয়ে চলমান আলোচনার মাধ্যমে উঠে এসেছে চীনা প্রযুক্তি বাজারের বর্তমান চিত্র নিয়ে বেশ কিছু আশ্চর্যজনক তথ্য।
নিষেধাজ্ঞার চাপে উদ্ভাবন
এখন চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট (ইইউভি) প্রযুক্তির লিথোগ্রাফি, যা চীনের কাছে সরবরাহ করা নিষেধ। চীনা চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রয়েছে পুরনো প্রযুক্তির ডিপ আলট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) মেশিন। ফলে এখনো চীনের কোনো নির্মাতা ৫ বা ৩ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির চিপ তৈরি করতে পারেনি। তবে একপ্রকার ওয়ার্ক অ্যারাউন্ড তারা ঠিকই বের করেছে।
নতুন এ পদ্ধতির নাম মাল্টি প্যাটার্ন এচিং। পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার করেও আধুনিক ৭ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির চিপ তৈরি করা যায় এতে। লিথোগ্রাফির প্রক্রিয়ায় লেজারের মাধ্যমে সিলিকন ওয়েফার কেটে (বঃপযরহম) চিপ তৈরি করা হয়। সাধারণত এক ধাপেই এচিং সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। মাল্টি প্যাটার্ন প্রক্রিয়ায় একাধিক ধাপে একটু একটু করে এচিং করা হয়। এ প্রক্রিয়ার সমস্যা, প্রতিটি ধাপে ঠিক একই জায়গায় লেজার ফোকাস করা জরুরি। এক ন্যানোমিটার এদিক-সেদিক হলেও পুরো ওয়েফার বাতিল, অর্থাৎ নষ্ট হয় কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার চিপ।
শেষ রক্ষা হবে কি?
পুরনো যন্ত্র দিয়ে আপাতত কাজ চালিয়ে নিচ্ছে চীন। কিন্তু পুরনো যন্ত্রগুলো কত দিন সচল থাকবে, সেটি ভাবার বিষয়। লিথোগ্রাফির যন্ত্রগুলো কিছুদিন পরপরই নতুন করে ক্যালিব্রেট করতে হয়, বদলাতে হয় কিছু পার্টস। পার্টস ও সার্ভিসের জন্য এএসএমএলের সঙ্গে কাজ করা জরুরি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে কোনো ধরনের ব্যবসা করতে পারবে না এএসএমএল। পুরনো যন্ত্রগুলোর ভবিষ্যৎ তাই হুমকির মুখে। নতুন প্রযুক্তি যতই উদ্ভাবন করা হোক, সেটি তৈরির উপায় না থাকলে চীনা প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
মনোপলি ভাঙা জরুরি
আশ্চর্য হলেও সত্য, বিশ্বের সিলিকন চিপ ইন্ডাস্ট্রির পুরোটাই মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। এ তালিকায় রয়েছে এএসএমএল, টিএসএমসি, কার্ল-জাইস থেকে শুরু করে জাপানের আজিনোমটো পর্যন্ত। ভবিষ্যতে যদি এসব প্রতিষ্ঠানের বিকল্প তৈরি না হয়, সে ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই রয়ে যাবে। দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ ক্রেতারা। যেমনটা এখন দেখা যাচ্ছে র্যাম ও স্টোরেজের ক্ষেত্রে, এআই ডেটাসেন্টারের চাহিদা মেটাতে বাদ পড়ছে অন্যান্য ডিভাইসের জন্য প্রয়োজনীয় র্যাম ও স্টোরেজ চিপ তৈরি। এতে বাজারে সৃষ্টি হয়েছে চরম সংকট। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৮ পর্যন্ত প্রতি প্রান্তিকে র্যামের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হারে বাড়তেই থাকবে।