ষাটের দশকের মধ্যভাগেও দেশের নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে নৌপরিবহনযোগ্য নৌপথের দৈর্ঘ্য মাত্র পাঁচ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সেটি আরো কমে গিয়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৮৬৫ কিলোমিটারে। বিগত ৬৫ বছরে দেশের নৌপথ কমেছে প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার।
নদীতে নাব্যতা সংকটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নৌপথ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ডুবোচরে আটকা পড়ছে বহু পণ্যবাহী নৌযান। এতে দেশের অর্থনীতির বহুমুখী ক্ষতি হচ্ছে। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অভ্যন্তরীণ নৌপথে প্রতিবছর প্রায় ৫০ থেকে ৫৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করা হয়, যা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। সড়ক ও রেলপথের তুলনায় পণ্য পরিবহনে খরচ প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কম হওয়ায় ভারী পণ্য, সার, জ্বালানি এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে কাঁচামাল পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হলো এই নৌপথ।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১২০টি লাইটার জাহাজ সারা দেশে পণ্য পরিবহন করে থাকে। অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় পণ্য পরিবহনের জন্য দুই হাজারের বেশি কার্গো এবং হাজারের বেশি লাইটার জাহাজ ব্যবহৃত হয় বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। নদীপথে কি শুধু পণ্য পরিবহন হয়? বহু মানুষের পছন্দ এই নৌপথ। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ভোলা-বরিশাল-পটুয়াখালী ছাড়াও চাঁদপুর অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত নৌপথে যাতায়াত করে থাকে। এক হিসাবে দেখা যায়, ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন নৌ রুটে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করে। একসময় চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া হয়ে ভোলা ও বরিশাল রুটে নিয়মিত যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল করত। পরবর্তী সময়ে ডুবোচর ও নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে চট্টগ্রাম-বরিশাল রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
দেশের নৌ রুটের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় নৌ রুট চিহ্নিতকরণ, পুরনো রুটগুলো ড্রেজিং করে সচল করতে ২০১৮ সালে একটি মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই প্ল্যান বাস্তবায়ন ও পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১১ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। সে সময় এই কমিটি নৌপথ চিহ্নিতকরণের মাস্টারপ্ল্যানের একটি ধারণাপত্র জমা দেয়। ধারণাপত্রে ৪৯১টি নদী চিহ্নিত করা হয়। এসব নদী খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে দেশের নৌপথকে ১৫ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছিল। ৪৯১টি নদীর মধ্যে ১৭৮টি নদী রক্ষণাবেক্ষণ ও নৌপথ উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর দায়িত্ব ছিল পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো বড় নদীসহ ৩৩১টি নদীর নৌপথের উন্নয়ন তত্ত্বাবধানের। গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গঠিত ১১ সদস্যের কমিটিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে কমিটির প্রধান রাখা হয়েছিল।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, নদীপথ উন্নয়নের মাস্টারপ্ল্যানের প্রায় ৩৪ বছর আগে দেশের নৌ রুট নির্ণয়, নৌ রুটের সংস্কারসহ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে ১৯৮৪ সালে সর্বশেষ জরিপ হয়েছিল। নেদারল্যান্ডসের সহায়তায় তিন বছর মেয়াদি ওই জরিপ কার্যক্রম শেষ হয় ১৯৮৭ সালে, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রথম জরিপ কার্যক্রম। আশির দশকের দিকে হাইওয়ে, হাইওয়ের সঙ্গে জেলার সংযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং যোগাযোগব্যবস্থায় সড়ককে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী নদীপথের গুরুত্বকে অবহেলা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, গত ৩৪ বছরে দেশের নদী ও নৌপথের বিস্তারিত জরিপ হয়নি। তবে বিআইডব্লিউটিএ দেশের নৌ রুটগুলো সচল রাখার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিছু নদীপথের জরিপ ও ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়কপথের চেয়ে কম খরচে পণ্য পরিবহনের জন্য উপযুক্ত এই যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘ সময় অবহেলিত হয়ে আসছিল। দীর্ঘ তিন দশক পর দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌপথ পুনরায় চালু, নতুন নৌপথ সৃষ্টি, নৌ রুট বৃদ্ধি—সর্বোপরি নৌপথের সুরক্ষার জন্য একটি ধারণাপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। ধারণাপত্রে নদীর নাব্যতা সংকট দূর করতে বিভিন্ন নদী ও নৌপথের ড্রেজিংয়ের জন্য একটি মডেল তৈরি এবং ড্রেজিং কিভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয় সেই বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রাথমিক ও জরুরি ভিত্তিতে কতটি নদী পরিকল্পনায় আনা হবে, তা-ও উল্লেখ রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের নদীতে প্রকৃতিগতভাবেই পলি জমতে থাকে। অতিপলির কারণে দেশের নৌপথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীর মাঝে মাঝে চর জেগে ওঠে। পৃথিবীর যেসব নদী পলি তৈরি করে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলি প্রবাহিত হয় পদ্মা দিয়ে। প্রবহমান এই পলির কিছু পরিমাণ জমতে জমতে একসময় চর জেগে ওঠে।
বিআইডব্লিউটিএর তথ্যানুসারে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন নৌ রুটে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করে। এ ছাড়া ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা একলাফে কয়েক লাখ বৃদ্ধি পায়। সারা বছর এই সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যায়। পদ্মা সেতু চালুর পর স্বাভাবিক সময়ে নৌপথের যাত্রীসংখ্যা প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। বর্তমানে প্রতিদিন ঢাকা সদরঘাট থেকে প্রায় ৫০টির মতো লঞ্চ দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন রুটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এবং সমপরিমাণ লঞ্চ ঢাকায় প্রবেশ করে। ঈদের ছুটিসহ যেকোনো উৎসবে লম্বা সরকারি ছুটি হলে নৌপথে যাত্রীর চাপ বৃদ্ধি পায়, তা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখে পৌঁছায়।
নদীপথ সুরক্ষায় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর যে পরিকল্পনা এর আগে গৃহীত হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে আশা করছি।
লেখক : সাংবাদিক



পরবর্তী সময়ে ব্রি
