ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করা এবং দেশের ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের মাঝে ঋণ বিতরণ করা। ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে অর্থ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে একটি সেতুবন্ধ বা ব্রিজিং প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে। ব্যাংক মূল কাজের বাইরে আরো কিছু কাজ করে; যেমন—অর্থ স্থানান্তর, বৈদেশিক বাণিজ্য বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট), অবিনিয়োগ খাতে ঋণ প্রদান, যথা—ক্রেডিট কার্ড, ভোগ্যপণ্য ঋণ প্রভৃতি। তবে ব্যাংকের এসব সেবা মূলত আনুষঙ্গিক কাজ।
উন্নত বিশ্বে অবশ্য ব্যাংকের কার্যক্রমের যথেষ্ট আধুনিকায়ন এবং বহুমুখীকরণ সাধিত হয়েছে। সেখানে ব্যাংক একজন ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীর আর্থিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করে। গ্রাহকের পক্ষে মার্জার ও অ্যাকুইজিশন, ঋণ ক্রয়-বিক্রয় বা লোন ট্রেডিং, গ্রাহকের ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট, সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট, গ্রাহকদের বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দেওয়া, কমোডিটি ট্রেডে অংশ নেওয়া এবং এ রকম আরো অনেক আর্থিক সেবা উন্নত বিশ্বের ব্যাংক থেকে প্রদান করা হয়। এতসব আধুনিক ব্যাংকিং সেবার প্রচলন এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের ব্যাপক বহুমুখীকরণ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদান। কেননা ব্যাংক যদি এই দুটি মৌলিক কার্যক্রমকে গুরুত্বহীন করে ফেলে, তখন ব্যাংক আর ব্যাংক থাকে না, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
উন্নত বিশ্বের এসব আধুনিক ব্যাংকিং সেবার কিছু প্রোডাক্ট অনেক উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংকিং খাত অনুসরণ করলেও আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত এসবের ধারেকাছেও নেই। আমাদের দেশের ব্যাংক মূলত সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সম্প্রতি অনেক ব্যাংক সঞ্চয় সংগ্রহের কাজটি ঠিক রাখলেও ঋণদান কার্যক্রমে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ঋণ প্রদানের বিকল্প হিসেবে অনেক ব্যাংকই এখন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করছে। কিছু ব্যাংক এই ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে তাদের বার্ষিক মুনাফার লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে। ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের ব্যাপক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে এই বন্ডের উচ্চ সুদের হার এবং সর্বনিম্ন বা শূন্য খেলাপি ঝুঁকি। কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে ট্রেজারি বন্ডে গড় সুদের হার ছিল ১২ শতাংশ বা তার বেশি। সম্প্রতি এই সুদের হার কিছুটা হ্রাস পেলেও এখনো ১০ শতাংশের কাছাকাছি বলেই জেনেছি। ট্রেজারি বন্ডে সুদের হার এত বেশি হবে কেন। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১০ শতাংশ মূলত বাণিজ্যিক ঋণের ১৫ শতাংশ সুদের সমান বা তার বেশি। কেননা ট্রেজারি বন্ড হচ্ছে সার্বভৌম বিনিয়োগ খাত, যেখানে খেলাপি বা ডিফল্ট ঝুঁকি নেই বললেই চলে। ফলে সুদের হার নির্ধারণে ঝুঁকির মূল্য বা রিস্ক প্রিমিয়াম থাকে না।
বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার নির্ণয় করা হয় কস্ট অব ফান্ডের সঙ্গে পরিচালনা খরচ, মুনাফার অংশ এবং রিস্ক প্রিমিয়াম যোগ করে। বাণিজ্যিক ঋণে সাধারণত ৫-৬ শতাংশ রিস্ক প্রিমিয়াম হওয়ার কথা। অথচ ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারের ক্ষেত্রে রিস্ক প্রিমিয়াম শূন্য। এই হিসাব-নিকাশ আবার ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে হুবহু খাটে না। সরকার তাঁর সুবিধামতো মুদ্রাবাজারের গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে ট্রেজারি বন্ড বা সরকারি বন্ডের সুদের হার নির্ধারণ করে থাকে। সাধারণত সার্বভৌম বন্ডে সুদের হার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে হওয়ার কথা। অনেকেই বলার চেষ্টা করবেন যে এত কম সুদে কেউ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাবে না। ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। কম সুদেও মানুষ সার্বভৌম বন্ডে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। মূলকথা হচ্ছে, সরকারের পক্ষে এত বেশি সুদ দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা মোটেই বাস্তবসম্মত হতে পারে না। কেননা এতে ভবিষ্যতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এমনকি সরকার এমন এক পর্যায়ে চলে যেতে পারে, যখন ঋণ নিয়ে ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই গলদঘর্ম হয়ে যেতে পারে। এককথায় সরকার ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে যেতে পারে, যেখান থেকে খুব সহজে বের হওয়া সম্ভব হবে না।
সুদের হার বেশি থাকায় আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে লাভজনক কার্যক্রম। কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে আমানতকারী তাঁর সঞ্চয় এই লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে বছরে শত শত কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করছেন। বিনিয়োগ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা নেই। কোনো রকম প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। ওয়েটেড অ্যাভারেজ অ্যাসেটের ভিত্তিতে পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণের যে বিধান আছে, সেখানেও বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা যায়। এসব কারণে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্য আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক কার্যক্রম। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব মোটেই ভালো হবে না এবং বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, ব্যাংকের যে ঋণদান কার্যক্রম আছে, সেটি দুর্বল হয়ে যাবে এবং সময়মতো কাজে লাগানো যাবে না। দ্বিতীয়ত, দেশের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাবেন না। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অর্থ নিজে থেকে সংগ্রহ করেন না। কিছু অংশ নিজে থেকে সংগ্রহ করেন এবং বাকিটা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু ট্রেজারি বন্ডে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে ব্যাংক তখন বাণিজ্যিক খাতে ঋণ দিতে পারবে না। আর ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ কখনোই হবে না। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না এবং জিডিপিও বৃদ্ধি পাবে না। এককথায় দেশের অর্থনীতি একটা মন্দা অবস্থার মধ্যে আটকে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের ব্যাংকিং খাতে। এমনটা হলে ট্রেজারি বন্ডের বিনিয়োগ দিয়ে শুধু মুনাফা বাড়িয়ে শেষ রক্ষা হবে না। এ কারণেই শুধু মুনাফার বিষয়টি না দেখে সার্বিকভাবে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রেজারি বন্ডে অতিবিনিয়োগ থেকে ব্যাংককে বিরত রাখার উপায় কী? আসলে কোনো উপায় আপাতত নেই। ব্যাংক যদি সার্বিক লাভের বিষয়টি বিবেচনা করে নিজ উদ্যোগে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত না থাকে, তাহলে নিয়ম করে তাদের বিরত রাখা সম্ভব নয়। সুযোগ থাকলে ব্যাংক বিনিয়োগ করবে, এটিই স্বাভাবিক। তা ছাড়া সরকার যেভাবে প্রতিবছর বিশাল ঘাটতির বাজেট প্রণয়ন করে, তাতে সরকারকে সব সময়ই বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আবার দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট না থাকায় সরকারকে ট্রেজারি বন্ডের ওপর উচ্চ হারেই সুদ দিতে হবে। আর উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করলে ব্যাংক সেখানে বিনিয়োগ করবেই। এ যেন মুদ্রাবাজার থেকে সরকারি অর্থ সংগ্রহের এক দুষ্টচক্র। এই অবস্থার একমাত্র সমাধান হবে তখনই, যখন দেশে সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপন করে সরকার কম সুদে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করা শুরু করবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে।
সরকার যদি অধিক পরিমাণে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ অব্যাহত রাখতে চায়, তাহলে দেশে অবশ্যই কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপন করতে হবে। সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত সব বন্ড এবং অন্যান্য সংস্থা ও অনুমোদিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যু করা সব বন্ড সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেটে নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয় হবে। নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয়ের কারণে বন্ডের বাজারমূল্য বেড়ে যায়। বন্ডের লিখিত মূল্য বা ফেস ভ্যালু যদি এক হাজার টাকা হয়, তার বাজারমূল্য এক হাজার ২০০ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে। যেহেতু সার্বভৌম বন্ডে খেলাপি বা ডিফল্ট ঝুঁকি নেই, তাই এই বন্ডের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাই বেশি। বন্ডের বাজারমূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণেই সুদের হার কম বা এমনকি নামমাত্র হওয়া সত্ত্বেও মানুষ সার্বভৌম বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এ কারণেই বন্ডের ক্ষেত্রে সুদের হারের পাশাপাশি প্রকৃত আয় বা ইল্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ইল্ড আবার সুদের হার এবং বন্ডের বাজারমূল্য দ্বারা প্রভাবিত। যেখানে ইল্ড নেই, সেখানে বন্ডেরও গুরুত্ব নেই। আধুনিক আর্থিক খাতে বন্ড মার্কেট একটি বিশাল অধ্যায়, যা নিয়ে এই অল্প পরিসরে আলোচনা করা দুরূহ কাজ।
আমাদের দেশে সরকারের পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থানের জন্য। অথচ দেশে কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট নেই। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়েই উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করতে হচ্ছে, যার একচেটিয়া সুযোগ নিয়ে চলেছে দেশের অনেক ব্যাংক। এতে কিছু ব্যাংক সাময়িক লাভবান হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনবে না। কেননা ব্যাংকগুলো তাদের মৌলিক কার্যক্রম থেকে সরে আসছে, ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে যখন ব্যাপক ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, তখন তাদের সমস্যায় পড়তে হবে। ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাভাবিক বিনিয়োগ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর। এ কারণেই ট্রেজারি বন্ডে ব্যাংকের অতিবিনিয়োগ দেশের মুদ্রাবাজার ও অর্থনীতির জন্য মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।
লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা