• ই-পেপার

ফুটবলের কবিতা যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে

  • মাসুদুজ্জামান

জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি

অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা সূর্যমুখী সূত্র

ভূমিকা ও অনুবাদ : আনীকা তাসনিম হোসেন

অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা সূর্যমুখী সূত্র

অ্যালেন গিন্সবার্গ। জন্ম তিন জুন, ১৯২৬, আমেরিকার নিউজার্সিতে। মৃত্যু পাঁচ এপ্রিল, ১৯৯৭; নিউ ম্যানহাটানের ইস্ট ভিলেজে, লিভার ক্যানসারে। আইকোনিক বিট জেনারেশনের’ কবি। হিন্দু, বুদ্ধ ও জায়নবাদী দর্শনে ভাবিত ছিলেন। সূর্যমুখী সূত্র’ কবিতাটি গিন্সবার্গের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হাওল’ (প্রকাশিত ১৯৫৬)-এ অন্তর্ভূক্ত। আমেরিকায় কাব্যগ্রন্থটি নিষিদ্ধ ছিল। আদালত নিষেধ তুলে নেয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১-এ কবি এসেছিলেন যশোর রোডে। লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি।

 

আমি হেঁটেছিলাম ফেলে দেওয়া টিনের কৌটায় ভরা কলার ঘাটে, দক্ষিণ প্যাসিফিক-লোকোমোটিভের বিশাল ছায়াতলে বসে কেঁদেছিলাম বক্স হাউস পাহাড়ের ওপরে ডুবে যাওয়া সূর্য দেখে। জ্যাক ক্যারুয়াক এসে এক মরচে ধরা লোহার খুঁটির ওপর আমার পাশে বসল। আমরা সহযাত্রী, চিন্তাপ্রবাহ একই আত্মার। বিবর্ণ, নীল এবং বিষণ্ন চোখ যন্ত্রের মতো গাছের ইস্পাত-শিকড়ে আবদ্ধ।

নদীর তৈলাক্ত জলে লাল আকাশের প্রতিচ্ছবি, সূর্য ডুবেছিল শেষ ফ্রিসকো পাহাড়ের চূড়ায়। সে স্রোতে কোনো মাছ নেই, পাহাড়ে কোনো তপস্বী নেই, শুধু আমরা দুজন, ভেজা চোখে, নদীর পারে মাতাল ক্লান্ত বৃদ্ধ ভবঘুরের মতো।

ওই সূর্যমুখীকে দেখো, সে বলল। আকাশের বিপরীতে ধূসর মৃত ছায়া মানুষের মতো বড়, বসে আছে শুকনো প্রাচীন করাতের গুঁড়ার স্তূপের ওপরমোহাচ্ছন্ন আমি ছুটে গেলামআমার প্রথম সূর্যমুখী, ব্লেকের স্মৃতি, আমার সব দর্শনহার্লেম আর পূর্ব নদীগুলোর নরক, সেতুদের ঝনঝন জোসে গ্রিজি স্যানডুইসেচ, মৃত শিশুর অশ্ববাহিত বাহন, বিস্মৃত আর না ফিরে আসা কালো টায়ারের বৃত্ত, নদীতীরের কবিতা, জন্মনিরোধক আর গঞ্জিকা, ইস্পাতের ছুরি, কোনো কিছুই নিষ্কলঙ্ক নয়, শুধু নোংরা কাদার মতো আবর্জনা; আর রেজারের মতো ধারালো শিল্পের অতীত ভ্রমণ

আর সেই ধূসর সূর্যমুখী সূর্যাস্তের সময় সামনে দাঁড়িয়ে ধুলো আর ধোঁয়ায় কলুষিত, চোখে পুরনো লোকোমোটিভের কালো ধোঁয়াতোমার মলিন কাঁটার মুকুট নুয়ে পড়ছে পরাজিত ক্ষতবিক্ষত রাজমুকুটের মতো; আলোকিত বাতাসে অচিরেই দাঁত পড়ে যাওয়া মুখ থেকে পড়ে গেছে বীজ।

বিলুপ্ত সূর্যরশ্মি মাকড়সার শুকনো জালে, শুকনো পাতা বেরিয়ে আছে প্রসারিত হাতের মতো, কাঠের গুঁড়োর ভিতর থেকে উঠে আসা ইশারা, কালো ডালপালার গা থেকে খসে পড়া প্লাস্টারের টুকরো, তোমার কানের কাছে আটকে ছিল একটা মৃত পোকা!

তোমরা ছিলে জীর্ণ অপবিত্র; আমার আত্মা সূর্যমুখী, আমি ভালোবেসেছিলাম।

এ আবর্জনা মানুষের নয়, ছিল মৃত্যু আর মানব-লোকোমোটিভের। ধুলোর সেইসব পোশাক, রেলপথের কালো হয়ে যাওয়া আবরণ, গালের ধোঁয়াশা, চোখের পাতায় জমে থাকা অন্ধকার দুর্দশা, কালিমাখা হাত কিংবা পুরুষাঙ্গ, অথবা কৃত্রিম আবর্জনার চেয়েও নিকৃষ্ট কোনো স্ফীতি শিল্পের, আধুনিকতার, সবই তোমার উন্মত্ত সোনালি মুকুট জুড়ে সেইসব সভ্যতার দাগ।

আর ঝাপসা মৃত্যুচিন্তা ধুলাঢাকা প্রেমহীন চোখ, অবসান আর শুকিয়ে যাওয়া স্মৃতি, নিচে ধুলো আর কাঠের গুঁড়োর স্তূপে রবারে বাঁধা নোটে, যন্ত্রের উপরিভাগে কাঁদতে কাঁদতে কাশতে থাকা গাড়ির যন্ত্রাংশে, মরচে ধরা জিহ্বা বের করা নিঃসঙ্গ ফাঁক টিনের কৌটোগুলোয়, আমি নাম দিতে পারতামকোনো দাঁড়ানো সিগারের ধোঁয়া আকীর্ণ ছাই, জীর্ণ চেয়ারের ক্ষয়ে যাওয়া পশ্চাদ্দেশ, মোটরগাড়ির শ্বেতশুভ্র স্তন, আর ডায়নামোর স্ফিঙ্কটারসবকিছু জড়িয়ে আছে তোমার মমি হয়ে যাওয়া শিকড়েআর তুমি সূর্যাস্তের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার অবয়বে তুমি মহিমান্বিত!

সূর্যমুখীর নিখুঁত সৌন্দর্য! চমৎকার, তুলনারহিত ভালোবাসায় সুর্যমুখীর অস্তিত্ব! পূর্ণিমার দিকে মধুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে জেগে ওঠা প্রাণ, আর আবেগে মাসিক সূর্যাস্তের সোনালি ছায়ায় মৃদুমন্দ বাতাস!

তোমার চারপাশে কত পতঙ্গের গুঞ্জন যখন তুমি দুষেছিলে রেলগাড়ির রাস্তা আর তোমার পুষ্পসত্তাকে? গরিব মৃত ফুল? কখন বিস্মৃত হলে তুমি ছিলে ফুল? কবে নিজের চামড়া দেখে ভেবেছিলে, তুমি ছিলে নোংরা নপুংসক নোংরা বুড়ো লোকোমোটিভ?

না, তুমি কখনো লোকোমোটিভ ছিলে না, ছিলে সূর্যমুখী!

আর তুমি লোকোমোটিভ, লোকোমোটিভ, আমাকে ভুলবে না!

তখন আমি কঙ্কালরূপী পুষ্ট সূর্যমুখী আঁকড়ে ধরে আমার পাশে রাজদণ্ডের মতো গুঁজে দিলাম, আমি আমার উপদেশে নিবেদন করি জ্যাক ও আমার আত্মাকে আর যে-ই শুনতে চায়।

আমরা আমাদের শরীরে জমে থাকা আবর্জনা নই, আমরা ভীত, বিবর্ণ, ধুলাঢাকা, রূপহীন লোকোমোটিভ নই; আমাদের অন্তরে আমরা সোনালি সূর্যমুখী, নিজেদের অন্তর্নিহিত আশীর্বাদে ধন্য; আমাদের সোনালি লোমশ, নগ্ন শরীর বেড়ে উঠছে পাগল কালো নিয়মী সূর্যমুখীদের সূর্যাস্তের ভিতর, আর আমাদেরই চোখ আমাদের রূপান্তরের সাক্ষী লোকোমোটিভের ছায়া। নদীতীরের সূর্যাস্তে, সন্ধ্যায় ফিসকো পাহাড়ের কৌটোসন্ধ্যার অন্তর্দৃষ্টির মধ্যে বসেছি।

ফুটবলের জন্য প্রার্থনা

ইমদাদুল হক মিলন

ফুটবলের জন্য প্রার্থনা

খেলাধুলার প্রতি বিশেষ কোনো আকর্ষণ আমার কখনো ছিল না। ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামে। ১২-১৩ বছর বয়স পর্যন্ত একাকী নানির কাছে থাকতাম। মা-বাবা, অন্যান্য ভাই-বোন ঢাকায়। গ্রামের সেই জীবনে ঋতু বলতে প্রধানত দুটিই বুঝতাম আমরা। বর্ষাকাল আর খরালিকাল। বিক্রমপুরের ভাষায় খরালি মানে শুকনো। খরালিকালের দু-তিনটি মাস শীতকাল। খেলাধুলা, আমোদ-উৎসবের প্রায় সবই হতো খরালিকালের প্রায় সাত-আট মাস জুড়ে। বাকি সময়টা বর্ষাকাল। জল কাদা বৃষ্টির দিন। অমন দিনে শ্রীনগরের রথের মেলা, গোয়ালিমান্দ্রার ঝুলন ছাড়া তেমন আর কোনো উৎসব ছিল না।

আমার কখনো ঝুলন দেখা হয়নি। শ্রীনগরের রথের মেলায় একবার গিয়েছিলাম, ধু ধু মনে আছে। সাত-আট বছরের বেশি বয়স হবে না। আমার খালাতো ভাই জহু নজু মামা ননি হামিদ তখন সদ্য যুবক। যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল তারাই। মণীন্দ্র ঠাকুরের ছইঅলা নৌকাখানা ম্যানেজ করেছিল। মেদিনীমণ্ডল থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত নৌকা বেয়ে গেল মজিদ। যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সেবারের সেই রথের মেলায় জীবনে প্রথম সার্কাস দেখা হলো। আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। আমাদের খাওয়ার জন্য এক হাঁড়ি রসগোল্লা কেনা হয়েছে। এখন ১০ টাকায় যে সাইজের একখানা রসগোল্লা পাওয়া যায়, তখন এক টাকায় ও রকম ২০ খানা পাওয়া যেত। ঘটনাটি ৬০-৬২ বছর আগের।

যা হোক, নৌকায় বসে রসগোল্লা খাওয়া হচ্ছে। প্রথমেই কাঁঠালপাতার ঠোঙায় দু-তিনটি আলাদা করে দেওয়া হয়েছে আমাকে। আর সবাই হাঁড়ি থেকেই তুলে তুলে খাচ্ছে। একটা পর্যায়ে মজিদের বোধ হয় মনে হলো দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে রসগোল্লা। তার ভাগে যা পড়ার কথা তা বোধ হয় পড়বে না। সে করল কি, ওই সাইজের রসগোল্লা একসঙ্গে দুটি করে মুখে দিতে লাগল। কিন্তু মানুষের মুখ বলে কথা। তা আর কত বড় হবে। দুটি রসগোল্লা মুখে দেওয়ার পর না চিবাতে পারে মজিদ, না গিলতে পারে। রসগোল্লার রস মুখ থেকে বেরিয়ে থুতনি ও গলা ভেজাতে লাগল তার।

কতকাল আগে দেখা দৃশ্য! এখনো পরিষ্কার মনে আছে।

বর্ষাকালে তেমন কোনো খেলাধুলা গ্রামে হতো না। বিক্রমপুরের সেই সময়কার বর্ষা ছিল ভয়াবহ। মাঠঘাট ডুবিয়ে জল উঠে যেত মানুষের বসতভিটায়। কখনো কখনো ঘরেও ঢুকে যেত। বাড়িগুলো হয়ে উঠত একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। তবু কোনো কোনো ছাড়াবাড়িতে কিংবা বিশাল কোনো একটি বাড়ির কোনো অংশে ধরাছি (কাবাডি) খেলা হতো। লৌহজংয়ের মাঠ কিংবা কালীরখিলের মাঠে বর্ষা মাত্র হচ্ছে, এমন সময়ে ফুটবলও খেলা হতো। ভরা বর্ষায় ওই অত উঁচু মাঠও ডুবে যেত। তখন আর খেলার উপায় নেই।

কিন্তু খরালিকালজুুড়েই ফুটবল খেলাটা হতো। গ্রামের মাঠে, স্কুলের মাঠে। আমি পড়তাম কাজির পাগলা হাই স্কুলে। সেই স্কুলের বিশাল মাঠে প্রতি বিকেলেই ফুটবল খেলা হতো। স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্ররা খেলত। ফাঁক পেলে খেলত আমার বয়সী ছাত্ররা। কিন্তু আমি কখনো চান্স পেতাম না। কারণ আমি একটু মোটাসোটা ছিলাম, একটু আরামপ্রিয়, অলস প্রকৃতির। বলের সঙ্গে দৌড় দিতে পারতাম না।

তবে নিজেদের পাড়ার মাঠে দয়া করে আমাকে কখনো কখনো খেলায় নেওয়া হতো। আমি আমার সাধ্যমতো সবার সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করতাম, কিন্তু বেশির ভাগ দিনই বল পায়ে ছোঁয়ার সৌভাগ্যই আমার হতো না। আমার পায়ের কাছে এসে পৌঁছার আগেই অন্যরা ছোঁ মেরে সেই বল নিয়ে যেত। আমার তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া উপায় থাকত না।

একবার তো মাঠে প্রায় দমবন্ধ হয়ে মরেই যাচ্ছিলাম। বড় ছোট সবাই মিলে খেলছি আমরা। কে যেন একটা শট করেছে। আমি গেছি বলটা আটকাতে। পায়ে না লেগে বলটা এসে লাগল আমার বুক ও পেটের মাঝখানে। টের পেলাম, আমি আর শ্বাস ফেলতে পারছি না। শুনে নানি আমার ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিলেন। তারপর সবাই খেলত, আমি মাঠের কোণে বসে খেলা দেখতাম। দর্শক।

তবে খেলা দেখতেও আমার বিশেষ ভালো লাগত না।

ঢাকার গেণ্ডারিয়া হাই স্কুলে এসে ভর্তি হলাম ক্লাস সিক্সে। ১৯৬৬ সাল। এই স্কুলের নিজস্ব কোনো মাঠ নেই। মিলব্যারাক মাঠ কিংবা ধূপখোলা মাঠে গিয়ে ফুটবল, ক্রিকেটএসব খেলত ছাত্ররা। আমাদের ক্লাসের সুভাষ মণ্ডল খুব ভালো ফুটবল খেলত। আর ভালো খেলত আমার বন্ধু ইউসুফ। পরবর্তীকালে মোহামেডানে খেলেছে ইউসুুফ। মোহামেডানের হয়ে প্রথম যেদিন স্টেডিয়ামে নামল, সেদিনই হ্যাটট্রিক। রাতারাতি হিরো হয়ে গেল ইউসুফ। কয়েক বছর মাঠ মাতিয়ে রাখল। তারপর খেলাধুলা ছেড়ে আমেরিকায় চলে গেল।

মনে আছে, ইউসুফদের সঙ্গে একবার কী যেন কী কারণে আমিও খেলতে নেমেছিলাম ধূপখোলা মাঠে। পাক্কা এক ঘণ্টা খেলার পর টের পেলাম, বলটা একবারও পা দিয়ে ছুঁতে পারিনি। ইউসুফ বিরক্ত হয়ে বলেছিল, তোর মতো খেলোয়াড় জীবনেও দেখিনি আমি।

তার পর থেকে ফুটবলের ওপর মনটা আমার একেবারেই উঠে গেল। আবুল হাসানের কবিতার মতো। আমি বুঝে গেছি, আমার হবে না। আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম সাহিত্য নিয়ে। বন্ধুরা যখন ধূপখোলা মাঠে ফুটবল খেলতে যায়, আমি যাই সীমান্ত গ্রন্থাগারে বই পড়তে। ফুটবল খেলা তো দূরের কথা, দেখারও আগ্রহ হয় না।

এই আগ্রহটা ফিরিয়ে দিলেন প্রথমত রবীন্দ্রনাথ, দ্বিতীয়ত ম্যারাডোনা।

প্রথমবার ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে এলেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ম্যারাডোনা। মিডিয়াগুলো এমন কাভারেজ দিল তাঁকে, ম্যারাডোনা ছাড়া যেন আর কোনো প্লেয়ারই নেই পৃথিবীতে। আমি তখন মাত্র ইউরোপজীবন শেষ করে ফিরেছি। ১৯৮৩-৮৪ সাল। মিডিয়ার কল্যাণে ম্যারাডোনাকে নিয়ে একটু উৎসাহিত হলাম। পত্রপত্রিকায় ছবিটবি দেখে ম্যারাডোনাকে কেন যেন খুব আপন মনে হতে লাগল। চেহারা-সুরত আমাদের মতোই। বেঁটে, মোটা ধাঁচের। এ রকম এক যুবক পৃথিবীশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়! দেখি তো কেমন খেলে?

ঠিক তখনই একটা বই এলো হাতে। ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ। ভূমিকা, অনুবাদ, অনুষঙ্গ কবি শঙ্খ ঘোষ। পড়ে ঘোর লেগে গেল। আর্জেন্টিনার মেয়ে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ভালোবাসতেন আমার ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথকে। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনেস এইরেসে গিয়ে ওকাম্পোর সান্নিধ্যে ছয় মাস ছিলেন কবি। ফ্রান্সে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ছোট্ট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বই লিখেছিলেন স্প্যানিস ভাষায়। বাংলা অনুবাদে সেই বইয়ের নাম সান ইসিদ্রোর শিখরে রবীন্দ্রনাথ। ওকাম্পোর বাংলা নাম করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ বিজয়া। তিনি তাঁর বিজয়াকে একবার লিখেছিলেন, পূরবীর কবিতাগুলো যারা পড়বে, তারা জানতেও পাবে না তোমার প্রতি কত তাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় ঘুরেফিরে যে বিদেশিনীর কথা বারবার এসেছে, তিনি ওকাম্পো। তোমায় বিদেশিনী সাজিয়ে কে দিল কিংবা আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী ওকাম্পোকে নিয়ে লেখা।

ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ বইতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওকাম্পোর দুখানা ছবি আছে। গাছতলার বেঞ্চে পাশাপাশি বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ আর ওকাম্পো। ওকাম্পোর একটি হাত রবীন্দ্রনাথের দিকে। আর একটি ছবি, চেয়ারে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর চেয়ারের পাশে ঘাসে বসে আছেন ওকাম্পো। এই ছবিতে ওকাম্পোর মুখ কালি দিয়ে লেপটানো। কবিকে ছবি পাঠানোর সময় নিজের মুখ কলমের কালিতে হিজিবিজি করে দিয়েছেন তিনি। আচরণটি ছেলেমানুষি।

প্রেমিক-প্রেমিকারা তো কখনো কখনো ছেলেমানুষই।

ওকাম্পো বিষয়ে জেনে আর্জেন্টিনা দেশটাকে আমি ভালোবেসে ফেললাম। রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেন যে দেশের মেয়ে, সেই দেশকে ভালো না বেসে পারেন কোন বাঙালি! সম্ভবত এই কারণে ম্যারাডোনাকেও আমার ভালো লেগে গেল। ওয়ার্ল্ড কাপে কোন জাদু দেখান ম্যারাডোনা দেখার জন্যই আমি আবার ফুটবলের প্রেমে পড়লাম।

সে বছর আর্জেন্টিনা ওয়ার্ল্ড কাপ নিয়ে গেল।

চার বছর পরের ওয়ার্ল্ড কাপে আবার খেলতে এলেন ম্যারাডোনা। টিমের অবস্থা ভালো নয়, তবু ফাইনালে গেল আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারল না। তার চার বছর পর আবার ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে এলেন ম্যারাডোনা, তত দিনে তাঁর জীবনের ওপর দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। ড্রাগ সেবনের দায়ে নিষিদ্ধ হলেন তিনি।

ম্যারাডোনার দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড কাপের সময় থেকেই তাঁর ওপর বিরক্ত হয়ে উঠছিলাম আমি। মাঠে নেমে এমন নখরা শুরু করেছিলেন, পায়ে বল এলে সেই বল কেউ ছিনিয়ে নিতে এলেই, ম্যারাডোনার পায়ে কেউ টাচ করেছে কি করেনি, অমনি মাঠে শুয়ে পড়লেন। বিরক্তিকর। অতি আদরে মাথায় উঠে যাওয়ার মতো। তবু, সবকিছুর পরও, ম্যারাডোনা ম্যারাডোনাই। ওকাম্পো ও ম্যারাডোনার কারণে আমি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। এ বছর আর্জেন্টিনার টিম কেমন আমি জানি না। খেলাধুলার খবর সেভাবে রাখা হয় না। কত দূর যাবে আর্জেন্টিনা জানি না। তবু আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে তাদের খেলা দেখব। ওয়ার্ল্ড কাপ চলার সময় বন্ধ রাখব প্রায় সব কাজ।

আমাদের এই ছা-পোষা জীবনে আনন্দ-উৎসব খুব কম। ওয়ার্ল্ড কাপের কল্যাণে কিছুুদিন যদি আনন্দে থাকা যায়, যদি ভুলে থাকা যায় জীবনের জটিলতার কথা, যদি আমার দেশ থেকে এই কিছুদিনের জন্যও উঠে যায় যাবতীয় অকল্যাণ, যদি এই কিছুদিনের জন্যও দেশকে ভালোবেসে দেশের প্রতি নিবেদিত হয় মানুষ, আর আমার দেশও যেন একদিন ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপে খেলে বিশ্ব মাতাতে পারে, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা। ওয়ার্ল্ড কাপ যেন এইটুকু অন্তত দেয় আমাদের।

 

কোলাহল

লায়লা ফারজানা

কোলাহল

এভাবে ছিলাম আমরা

বাতাস আর নিশ্বাস জীবন আর মৃত্যুতে একক

কথা দিচ্ছিযা ভাবতে পারো শুধু সেটুকু ফেরত দিতে পারি

 

তাহলে কিভাবে ফিরে আসব এখানে,

কিভাবে বসব একে অপরের পাশে এই রাতে?

কত কষ্টের, কখন এর শেষ?

 

তারা কোথায় যে শিখিয়েছে?

কোথায় সে নক্ষত্র বলেছে অনিবার্য আমরা

 

বাইরে অন্ধকারে পাতারা তো জ্বলবেই,

বৃষ্টিতে পবিত্র শীতল আশীর্বাদের

অপেক্ষায় থাকবে মানুষ

 

শান্ত বাতাসে বিবর্ণ হবে ভঙ্গুর বিশ্বাস

নির্বাণ

শেলী সেনগুপ্তা

নির্বাণ

গাছদের কান্না শুনে

বৃষ্টি চেয়েছি

 

শিশুর জন্য দুধ চেয়েছি

ঈশ্বরের বরাদ্দ থেকে

 

পাখির জন্য গান

 

আমার জন্য চেয়েছি

কেবল

এক চোখ ভালোবাসা...