অ্যালেন গিন্সবার্গ। জন্ম তিন জুন, ১৯২৬, আমেরিকার নিউজার্সিতে। মৃত্যু পাঁচ এপ্রিল, ১৯৯৭; নিউ ম্যানহাটানের ইস্ট ভিলেজে, লিভার ক্যানসারে। আইকোনিক বিট জেনারেশনের’ কবি। হিন্দু, বুদ্ধ ও জায়নবাদী দর্শনে ভাবিত ছিলেন। সূর্যমুখী সূত্র’ কবিতাটি গিন্সবার্গের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হাওল’ (প্রকাশিত ১৯৫৬)-এ অন্তর্ভূক্ত। আমেরিকায় কাব্যগ্রন্থটি নিষিদ্ধ ছিল। আদালত নিষেধ তুলে নেয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১-এ কবি এসেছিলেন যশোর রোডে। লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি।
আমি হেঁটেছিলাম ফেলে দেওয়া টিনের কৌটায় ভরা কলার ঘাটে, দক্ষিণ প্যাসিফিক-লোকোমোটিভের বিশাল ছায়াতলে বসে কেঁদেছিলাম বক্স হাউস পাহাড়ের ওপরে ডুবে যাওয়া সূর্য দেখে। জ্যাক ক্যারুয়াক এসে এক মরচে ধরা লোহার খুঁটির ওপর আমার পাশে বসল। আমরা সহযাত্রী, চিন্তাপ্রবাহ একই আত্মার। বিবর্ণ, নীল এবং বিষণ্ন চোখ যন্ত্রের মতো গাছের ইস্পাত-শিকড়ে আবদ্ধ।
নদীর তৈলাক্ত জলে লাল আকাশের প্রতিচ্ছবি, সূর্য ডুবেছিল শেষ ফ্রিসকো পাহাড়ের চূড়ায়। সে স্রোতে কোনো মাছ নেই, পাহাড়ে কোনো তপস্বী নেই, শুধু আমরা দুজন, ভেজা চোখে, নদীর পারে মাতাল ক্লান্ত বৃদ্ধ ভবঘুরের মতো।
ওই সূর্যমুখীকে দেখো, সে বলল। আকাশের বিপরীতে ধূসর মৃত ছায়া মানুষের মতো বড়, বসে আছে শুকনো প্রাচীন করাতের গুঁড়ার স্তূপের ওপর—মোহাচ্ছন্ন আমি ছুটে গেলাম—আমার প্রথম সূর্যমুখী, ব্লেকের স্মৃতি, আমার সব দর্শন—হার্লেম আর পূর্ব নদীগুলোর নরক, সেতুদের ঝনঝন জোসে গ্রিজি স্যানডুইসেচ, মৃত শিশুর অশ্ববাহিত বাহন, বিস্মৃত আর না ফিরে আসা কালো টায়ারের বৃত্ত, নদীতীরের কবিতা, জন্মনিরোধক আর গঞ্জিকা, ইস্পাতের ছুরি, কোনো কিছুই নিষ্কলঙ্ক নয়, শুধু নোংরা কাদার মতো আবর্জনা; আর রেজারের মতো ধারালো শিল্পের অতীত ভ্রমণ—
আর সেই ধূসর সূর্যমুখী সূর্যাস্তের সময় সামনে দাঁড়িয়ে ধুলো আর ধোঁয়ায় কলুষিত, চোখে পুরনো লোকোমোটিভের কালো ধোঁয়া—তোমার মলিন কাঁটার মুকুট নুয়ে পড়ছে পরাজিত ক্ষতবিক্ষত রাজমুকুটের মতো; আলোকিত বাতাসে অচিরেই দাঁত পড়ে যাওয়া মুখ থেকে পড়ে গেছে বীজ।
বিলুপ্ত সূর্যরশ্মি মাকড়সার শুকনো জালে, শুকনো পাতা বেরিয়ে আছে প্রসারিত হাতের মতো, কাঠের গুঁড়োর ভিতর থেকে উঠে আসা ইশারা, কালো ডালপালার গা থেকে খসে পড়া প্লাস্টারের টুকরো, তোমার কানের কাছে আটকে ছিল একটা মৃত পোকা!
তোমরা ছিলে জীর্ণ অপবিত্র; আমার আত্মা সূর্যমুখী, আমি ভালোবেসেছিলাম।
এ আবর্জনা মানুষের নয়, ছিল মৃত্যু আর মানব-লোকোমোটিভের। ধুলোর সেইসব পোশাক, রেলপথের কালো হয়ে যাওয়া আবরণ, গালের ধোঁয়াশা, চোখের পাতায় জমে থাকা অন্ধকার দুর্দশা, কালিমাখা হাত কিংবা পুরুষাঙ্গ, অথবা কৃত্রিম আবর্জনার চেয়েও নিকৃষ্ট কোনো স্ফীতি শিল্পের, আধুনিকতার, সবই তোমার উন্মত্ত সোনালি মুকুট জুড়ে সেইসব সভ্যতার দাগ।
আর ঝাপসা মৃত্যুচিন্তা ধুলাঢাকা প্রেমহীন চোখ, অবসান আর শুকিয়ে যাওয়া স্মৃতি, নিচে ধুলো আর কাঠের গুঁড়োর স্তূপে রবারে বাঁধা নোটে, যন্ত্রের উপরিভাগে কাঁদতে কাঁদতে কাশতে থাকা গাড়ির যন্ত্রাংশে, মরচে ধরা জিহ্বা বের করা নিঃসঙ্গ ফাঁক টিনের কৌটোগুলোয়, আমি নাম দিতে পারতাম—কোনো দাঁড়ানো সিগারের ধোঁয়া আকীর্ণ ছাই, জীর্ণ চেয়ারের ক্ষয়ে যাওয়া পশ্চাদ্দেশ, মোটরগাড়ির শ্বেতশুভ্র স্তন, আর ডায়নামোর স্ফিঙ্কটার—সবকিছু জড়িয়ে আছে তোমার মমি হয়ে যাওয়া শিকড়ে—আর তুমি সূর্যাস্তের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার অবয়বে তুমি মহিমান্বিত!
সূর্যমুখীর নিখুঁত সৌন্দর্য! চমৎকার, তুলনারহিত ভালোবাসায় সুর্যমুখীর অস্তিত্ব! পূর্ণিমার দিকে মধুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে জেগে ওঠা প্রাণ, আর আবেগে মাসিক সূর্যাস্তের সোনালি ছায়ায় মৃদুমন্দ বাতাস!
তোমার চারপাশে কত পতঙ্গের গুঞ্জন যখন তুমি দুষেছিলে রেলগাড়ির রাস্তা আর তোমার পুষ্পসত্তাকে? গরিব মৃত ফুল? কখন বিস্মৃত হলে তুমি ছিলে ফুল? কবে নিজের চামড়া দেখে ভেবেছিলে, তুমি ছিলে নোংরা নপুংসক নোংরা বুড়ো লোকোমোটিভ?
না, তুমি কখনো লোকোমোটিভ ছিলে না, ছিলে সূর্যমুখী!
আর তুমি লোকোমোটিভ, লোকোমোটিভ, আমাকে ভুলবে না!
তখন আমি কঙ্কালরূপী পুষ্ট সূর্যমুখী আঁকড়ে ধরে আমার পাশে রাজদণ্ডের মতো গুঁজে দিলাম, আমি আমার উপদেশে নিবেদন করি জ্যাক ও আমার আত্মাকে আর যে-ই শুনতে চায়।
আমরা আমাদের শরীরে জমে থাকা আবর্জনা নই, আমরা ভীত, বিবর্ণ, ধুলাঢাকা, রূপহীন লোকোমোটিভ নই; আমাদের অন্তরে আমরা সোনালি সূর্যমুখী, নিজেদের অন্তর্নিহিত আশীর্বাদে ধন্য; আমাদের সোনালি লোমশ, নগ্ন শরীর বেড়ে উঠছে পাগল কালো নিয়মী সূর্যমুখীদের সূর্যাস্তের ভিতর, আর আমাদেরই চোখ আমাদের রূপান্তরের সাক্ষী লোকোমোটিভের ছায়া। নদীতীরের সূর্যাস্তে, সন্ধ্যায় ফিসকো পাহাড়ের কৌটোসন্ধ্যার অন্তর্দৃষ্টির মধ্যে বসেছি।




