বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার জন্য টাকার খনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় চলমান আসরে ফিফার বাণিজ্যিক আগ্রাসন যেন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আয়ের জন্য প্রতিটি খাতকে যেভাবে নিঙড়ে নেওয়া হচ্ছে, তা ফুটবলপ্রেমীদের যেমন চমকে দিয়েছে, তেমনি সমালোচনার ঝড়ও তুলেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তই বিজ্ঞাপন প্রচারে ব্যয় করছে ফিফা, এমনকি অব্যবহৃত থাকছে না রেফারির বগলও!
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর বরাত দিয়ে জানা গেছে, অতিরিক্ত আয়ের জন্য ফিফা এবার সম্পূর্ণ নতুন ও অদ্ভুত এক পন্থা বেছে নিয়েছে—চতুর্থ রেফারির বগলের অংশে বিজ্ঞাপন বিক্রি করছে তারা। ফুটবল ইতিহাসে নজিরবিহীন এই ‘বগল বিজ্ঞাপন’ মূলত চলতি বিশ্বকাপ থেকে ফিফার প্রত্যাশিত ৮.৯ বিলিয়ন ডলার আয়ের শত শত উৎসের একটি মাত্র।
২০২৩-২০২৬ চক্রে ফুটবলের সর্বোচ্চ এই সংস্থাটির লক্ষ্য রেকর্ড ১৩ বিলিয়ন ডলার আয় করা, যার সিংহভাগই আসবে এই বিশ্বকাপ থেকে। এই বিপুল অংকের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে ফিফা এমন এক কৌশল নিয়েছে, যেখানে আয়ের সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও কোনো জায়গা হাতছাড়া করা হচ্ছে না; এমনকি তা যদি হয় রেফারির বগল!
সম্প্রতি ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচে এক অভিনব দৃশ্য দেখা যায়। মাঠের পাশে বদলি খেলোয়াড় নামানোর বোর্ড প্রদর্শনের সময় চতুর্থ রেফারির বগলের নিচে ঘাম ও দুর্গন্ধ প্রতিরোধক (অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট) ব্র্যান্ড ‘শিওর’-এর লোগো জ্বলজ্বল করছিল। ব্রিটিশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভারের মালিকানাধীন এই ব্র্যান্ডটি মনে করছে, ঘামরোধী পণ্যের প্রচারের জন্য রেফারিদের বগলের চেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকর বিজ্ঞাপনস্থল আর হতেই পারে না! জানা গেছে, বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচে ‘শিওর’-এর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ‘রেক্সোনা’র নাম প্রদর্শিত হবে। এটি কেবল রেফারির বগলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, অতিরিক্ত সময় ও খেলোয়াড় বদলের সংকেত দেওয়া বোর্ডেও শোভা পাচ্ছে।
অবশ্য ফিফা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আপাতত সহকারী রেফারি এবং মূল রেফারিদের বগলে কোনো বিজ্ঞাপন রাখা হয়নি, কেবল চতুর্থ রেফারিদের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য।
বিজ্ঞাপন বাণিজ্যের এখানেই শেষ নয়। এবারের বিশ্বকাপে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য একের পর এক নজিরবিহীন ক্ষেত্র সামনে এনেছে ফিফা। এমনকি ম্যাচের প্রতি কোয়ার্টারে যখন নির্ধারিত পানিবিরতি (হাইড্রেশন ব্রেক) দেওয়া হচ্ছে, তখনো বসে নেই সম্প্রচারকারীরা; সেই সময়টুকুতেও টেলিভিশন স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন।
বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি মাঠের টিকিট ও স্যুভেনির বিক্রি থেকেও দেদারসে টাকা আসছে। গত বুধবার ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ৪-২ গোলে জয়ের রোমাঞ্চকর ম্যাচটিতে স্টেডিয়ামের বাইরে বিভিন্ন অফিশিয়াল স্টোরের সামনে দর্শকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ফলে এবার ম্যাচ-ডের আয়ও আগের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলার পথে।
তিনটি দেশের যৌথ আয়োজনে চলমান এই প্রতিযোগিতায় এবার সর্বমোট রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আসর থেকে সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ এবং টিকিট বিক্রির মতো খাত থেকেই আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ফিফা।




