সমসাময়িক বাংলা কবিতায় খুব কম বই-ই আছে, যা একই সঙ্গে কবিতা, দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা ও আত্মসমালোচনা এত গভীরভাবে একসুতায় গেঁথে দিতে পারে। ‘কবিতার ইশতেহার’ সেই বিরল প্রচেষ্টাগুলোর একটি, যেখানে কবি মিজান মাহমুধ শুধু কবিতা লেখেননি, একটি বিকল্প রাষ্ট্রকাঠামোর নৈতিক নকশা হাজির করেছেন।
কবি এই গ্রন্থের প্রথম অংশে ‘কবিতাসংবিধান’-এ মূলত ২১টি ধারার মাধ্যমে এক কল্পিত কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের চিত্র তুলে ধরেছেন। এখানে রাষ্ট্র কোনো ক্ষমতার যন্ত্র নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক নৈতিক সত্তা। ‘রাষ্ট্র মানে কাঁটাতারে আঁকা কোনো মানচিত্র নয়’—এই উচ্চারণ শুধু একটি পঙক্তি নয়, পুরো বইয়ের দার্শনিক ভিত্তি। প্রতিটি ধারা—গণতন্ত্র, বিচার, সাংবাদিকতা, শিক্ষা, শ্রম, নারীর অধিকার—সবকিছু কবি এমনভাবে পুনর্নির্মাণ করেছেন, যেন তা পাঠকের বিবেককে সরাসরি প্রশ্ন করে।
দ্বিতীয় অংশ ‘২৪-এর কবিতা’ আরো বেশি ব্যক্তিগত, আরো বেশি নির্মম। এখানে কবি নিজেকে, নিজের দেশকে এবং পুরো জাতিকে এক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। ‘আমরাই বানাই স্বৈরাচার’ কিংবা ‘নির্মম ইতিহাস’—এই কবিতাগুলো শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এগুলো এক ধরনের সম্মিলিত আত্মস্বীকারোক্তি। কবি এখানে দায় এড়িয়ে যাননি, বরং স্বীকার করেন—রাষ্ট্রের ব্যর্থতা যেমন শাসকের, তেমনি নাগরিকেরও।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘তবুও তোকে ভালোবাসি’ কবিতাটি, যেখানে কবি দেশপ্রেমকে অন্ধ গর্ব নয়, লজ্জা ও ভালোবাসার জটিল এক অনুভূতি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। একইভাবে ‘৩৬ জুলাই’ কবিতাটি এক প্রতীকী দিন হয়ে ওঠে, যেখানে ইতিহাস, বেদনা ও প্রতিবাদ একসঙ্গে মিশে যায় এক বিমূর্ত অথচ তীব্র বাস্তবতায়।
ভাষার দিক থেকে গ্রন্থটি সহজ, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত ভাবনা অত্যন্ত গভীর। কোথাও স্লোগানধর্মী, কোথাও নিঃশব্দ আর্তনাদ—এই ওঠানামাই গ্রন্থটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। কবি অলংকারের চেয়ে সত্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা অনেক সময় অস্বস্তিকর, কিন্তু প্রয়োজনীয়।
তবে গ্রন্থটির একটি সীমাবদ্ধতাও আছে—কিছু জায়গায় বক্তব্যের তীব্রতা কবিতার নান্দনিকতা ছাপিয়ে গেছে। ফলে পাঠক কখনো কখনো অনুভব করতে পারেন, তিনি কবিতা নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষ্য পড়ছেন। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাও গ্রন্থটির শক্তির অংশ; কারণ বোঝা যায় এটি কবির ইচ্ছাকৃত, এটি প্রতিবাদের ভাষা।
সব মিলিয়ে ‘কবিতার ইশতেহার’ কোনো সাধারণ কবিতার বই নয়; এটি এক প্রজন্মের প্রশ্ন, এক কবির দায়বোধ এবং একটি দেশের অসমাপ্ত স্বপ্নের দলিল। যাঁরা শুধু সৌন্দর্যের জন্য কবিতা পড়েন, তাঁদের জন্য এটি হয়তো কঠিন; কিন্তু যাঁরা সত্য খোঁজেন, প্রশ্ন করতে চান এবং নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে চান—তাঁদের জন্য এই গ্রন্থ একটি জরুরি পাঠ।
কবিতার ইশতেহার : মিজান মাহমুধ। প্রকাশক : ইচ্ছে প্রকাশ। মূল্য : ২০০ টাকা।




