• ই-পেপার

[ দিনগুলি মোর ]

আমাদের আব্বা

[ প্রাণ-প্রকৃতি ]

কী খেয়ে বাঁচবে কড়ি কাইট্টা?

সরওয়ার পাঠান

কী খেয়ে বাঁচবে কড়ি কাইট্টা?
দেশি কড়ি কাইট্টা ছবি : শুভব্রত সরকার

কৈশোরে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল আমাদের গ্রাম। শত শত পাখি, বহু জাতের স্তন্যপায়ী, অসংখ্য সরীসৃপ আর কিছু উভয়চর প্রাণীর সরব উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল প্রকৃতি। শৈশব থেকেই আমার দৃষ্টি ছিল ওদের ওপর। কৈশোরে না বুঝে ওদের অনেকের পেছনে ছুটেছি গুলতি হাতে।

একদিন গুলতি হাতে বাড়ির অদূরে শীতলক্ষ্যা নদীপারের এক বাঁশঝাড়ের ভেতর হাঁটছিলাম। হঠাৎ সামনে সাদা কিছু একটা দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কাছে গিয়ে জিনিসটি হাতে তুলে নিতেই দেখলাম একটি ডিম, আকারে দেশি মুরগির ডিমের চেয়ে কিছুটা ছোট, লম্বাটে ধরনের। সাদা ডিমটি হাতে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। এখানে ডিম এলো কোথা থেকে? তখনই চোখে পড়ল যে নরম ঝুরঝুরে মাটির ওপর থেকে ডিমটি নিয়েছিলাম, সেখানে আবছাভাবে সাদাটে আরো কিছু দেখা যাচ্ছে। হাত দিয়ে মাটি সরাতেই প্রায় ১০টির মতো ফকফকা সাদা ডিম বেরিয়ে এলো। আমার সঙ্গে ছিল গ্রামের এক দুর্দান্ত শিকারি কিশোর দুলাল। গ্রামীণ বনের বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সেই বয়সেই বেশ ভালো জ্ঞান তার। সে ডিমগুলো দেখে বলে উঠল, ‘এইগুলি কাইট্টার (কচ্ছপ) ডিম।’ চমকে উঠলাম। কারণ কচ্ছপ যে মাটির নিচে ডিম পাড়ে, এটি জানা ছিল না। দুলাল তখন সবজান্তার মতো মাথা দুলিয়ে বলল, ‘জানোস, কাইট্টায় কিন্তু চোখের দৃষ্টি দিয়া ডিম ফোটায়, মাটির নিচে ডিম পাইড়া একটু দূরে বইসা একদৃষ্টিতে জায়গাটার দিকে চাইয়া থাকে, আর তার চোখের তাপে একসময় ডিম ফুইট্টা বাচ্চা বাইর হইয়া আসে।’ কথাগুলো বলে সে আশপাশে কচ্ছপ খুঁজতে লাগল। হেসে বললাম, দূর ব্যাটা চোখের তাপে আবার ডিম ফুটে নাকি, এটি অসম্ভব ব্যাপার।

কী খেয়ে বাঁচবে কড়ি কাইট্টা?

কচ্ছপের ডিম দেখে আমার রবিদাসপাড়ার লিলির মায়ের কথা মনে পড়ল। রবিদাসরা শজারু, শূকর থেকে শুরু করে ইঁদুর পর্যন্ত ভক্ষণ করে থাকে। গুইসাপ কিংবা কচ্ছপের ডিম কোনোটাতে তাদের অরুচি নেই। সেই পাড়ার এক দীর্ঘদেহী নারী ছিলেন লিলির মা, আমরা তাঁকে খুব ভয় পেতাম। তিনি ছিলেন সূর্যপূজারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। চোখ দুটি ছিল রক্তজবার মতো লাল। মাঝেমধ্যে শিকার করা প্রাণী নিয়ে যেতাম তাঁর কাছে। আসলে ভাব জমানোর চেষ্টা। তিনিও আমাকে বেশ আদর করতেন। ফাঁদে আটকে পড়া ইঁদুর আর কাঠবিড়ালি নিয়মিত তাঁর কাছে সরবরাহ করতাম। তাই কচ্ছপের ডিমগুলো দেখে সবার আগে তাঁর কথা মনে পড়ল। এগুলো দেখে তিনি নিঃসন্দেহে খুব খুশি হবেন। এগুলো তাঁর কাছে নিয়েও গিয়েছিলাম। তবে সেই কম বয়সী অপরিপক্ব মাথায় একবারও সেই চিন্তা আসেনি যে কাজটি মোটেও ঠিক হচ্ছে না।

সেদিন যার ডিম খুঁজে পেয়েছিলাম, সেটি দেশি কড়ি কাইট্টা। গ্রামের এমন কোনো ডোবা, নালা, বিল কিংবা পুকুর ছিল না, যেখানে তার অস্তিত্ব নেই। ডুবিয়ে রাখা নৌকার গলুইয়ে কিংবা জলাশয়ের পারে বহুবার তাদের রোদ পোহাতে দেখেছি। মানুষের সাড়া পেলে ধুম করে পানিতে নেমে যেত। সবচেয়ে ভালো লাগত, যখন এদের বাচ্চারা গলা উঁচু করে জলের ওপর ভেসে থাকা মরা ডালের ডগায় বসে থাকত। যেই ওদের ধরার জন্য কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম, ওরা টুপ করে পানিতে পড়ে হারিয়ে যেত। এভাবে ডালের ডগায় বসে থাকা কড়ি কাইট্টার বাচ্চার দিকে ঢিল ছোড়া গ্রামের শিশুদের এক মজার খেলা ছিল।

চৈত্র মাসের শেষে স্ত্রী কড়ি কাইট্টা জলাশয়ের পাশের বাঁশঝাড় কিংবা ঝোপ-জঙ্গলের নিচের নরম মাটি খুঁড়ে ডিম পাড়ত। এরপর ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে ডিমগুলোকে ঢেকে সে চলে যেত। সূর্যের আলোর উষ্ণতায় একসময় ডিমগুলো থেকে বাচ্চা ফুটে বেরিয়ে আসত। এরপর ওরা দল বেঁধে রওনা হতো জলাশয়ের উদ্দেশে। সদ্য ফোটা বাচ্চারা নির্ভুল নিশানায় ঠিকই পৌঁছে যেত জলাশয়ের কাছে, এ যেন প্রকৃতির এক অতি রহস্যময় ইঙ্গিত।

শুকনা মৌসুমে যখন বেশির ভাগ জলাশয় শুকিয়ে যেত, কড়ি কাইট্টা লুকিয়ে থাকত মাটির নিচে। তখন জমি চাষ করার সময় কৃষকের লাঙলের ডগায় উঠে আসত এদের দেহ। এ ছাড়া ঝোপঝাড়ের নিচে শুকনা পাতা ঝাড়ু দেওয়ার সময় কড়ি কাইট্টা খুঁজে পাওয়া যেত। মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে কচ্ছপের মাংস অতি প্রিয়। অনেকের কাছে আবার এটি ‘জল খাসি’ নামে পরিচিত। কড়ি কাইট্টার ওজন সর্বসাকল্যে দুই-আড়াই কেজি। ওজন কিংবা সংখ্যা—দুইভাবেই তখন খোলাবাজারে কড়ি কাইট্টা বেচাকেনা চলত।

শীতকালে বেশির ভাগ জলাশয় শুকিয়ে যেত। কচ্ছপ শিকারিদের ছইওয়ালা নৌকা এসে ভিড়ত নদীর ঘাটে। ওরা আসত গাজীপুরের নাগরী অঞ্চল থেকে। নাগরীর খ্রিস্টানপাড়ায় কচ্ছপের বেশ চাহিদা ছিল তখন। নৌকায় করে আসা কচ্ছপ শিকারিদের প্রত্যেকেই ছিল অভিজ্ঞ ‘ট্র্যাকার’। বলতে গেলে সারা দিন ওদের পেছনে লেগে থাকতাম। সকালে নৌকা থেকে নেমে শিকারিরা সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ত। ওদের হাতে থাকত বাঁশের হাতলযুক্ত লোহার ত্রিফলা। খাল-বিল আর পুকুরপারে কচ্ছপ থাকতে পারে এমন সব স্থানে ওরা ত্রিফলা দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করে যেত। যখন হঠাৎ লোহার ফলার সঙ্গে শক্ত কিছুর আঘাত লেগে কট করে শব্দ হয়ে উঠত, তখনই ওরা থমকে দাঁড়িয়ে জায়গাটি পরীক্ষা করে দেখত। এভাবেই মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসত কড়ি কাইট্টার পিঠের কঠিন খোল। এরপর ওরা সঙ্গে থাকা বস্তায় ভরতো। বিকেলে শিকারিরা বস্তা ভর্তি কচ্ছপ নিয়ে নদীর ঘাটে চলে আসত। এভাবে যত দিন না নৌকা পরিপূর্ণ হয়, ওরা গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়াত কচ্ছপের সন্ধানে।

দেশি কড়ি কাইট্টাকে ইংরেজিতে বলা হয় Indian Roofed Turtle। এই নামকরণের পেছনের কারণ হচ্ছে, ওদের উঁচু পিঠ, যা দেখতে অনেকটা ঘরের চালের মতো ঢালু। বৈজ্ঞানিক নাম Pangshura Tecta. একসময় বাংলাদেশের সব জলাশয়ে কড়ি কাইট্টার দেখা মিলত। এখন বলতে গেলে এদের আর দেখাই যায় না। কেন এমনটি হলো? প্রথমেই বলতে হয় পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা। দেশের বেশির ভাগ প্রাকৃতিক জলাশয়, বিশেষ করে পুকুর ও বিলগুলো পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক মৎস্য খামারে। চাষের শুরুতে প্রতিটি জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ করে সব দেশি মাছ এবং জলজ প্রাণী মেরে ফেলা হয়। এই প্রবল অপরাধে অন্যান্য জলজ প্রাণীর মতো মৃত্যু হয়েছে হাজার হাজার কড়ি কাইট্টার। এ ছাড়া দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে নদীদূষণ। অন্যান্য জলজ প্রাণীর মতো কড়ি কাইট্টার জীবন আজ তাই বিপন্ন। বহু নদীর পানি পরিণত হয়েছে বিষের তরলে। সেখানে কোনো জলজ উদ্ভিদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। নেই শৈবাল, নেই কুচো চিংড়ি। কড়ি কাইট্টা কী খেয়ে বাচবে? যুগের পর যুগ ধরে মানুষ তাদের প্রয়োজনে একের পর এক জলাশয় ভরাট করে তৈরি করেছে বসতবাড়ি কিংবা ফসলের জমি। এতে সংকুচিত হয়ে এসেছে কড়ি কাইট্টার আশ্রয়স্থল। অবাধ শিকার এদের সংখ্যা কমে যাওয়ার আরো একটি বড় কারণ। কচ্ছপ শিকারিরা খুবই পারদর্শী। দীর্ঘ সময় ধরে ওরা খুঁজে খুঁজে নৌকা বোঝাই করে এদের নিয়ে গেছে। ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন প্রণীত হওয়ার পর কচ্ছপ শিকার কমেছে। বন বিভাগের পাশাপাশি বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে কচ্ছপসহ বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায়। তাই বিশ্বাস করি, দেশি কড়ি কাইট্টা আবার স্বাভাবিক সংখ্যায় ফিরবে বাংলার বুকে।

 

 

 

বেচি মুরগি, কিনি বই

বাঁধি পাখির নীড়

সবুজ গাছের ডালে ঝুলছে রঙিন মাটির হাঁড়ি। এগুলো আসলে পাখির জন্য নিরাপদ নীড়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পাখিদের বাঁচাতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন ‘শান্তি নিবিড় পাঠাগার’-এর উদ্যোক্তা নাহিদ উজ্জামান। মুরগির খামারে কাজ করে গড়া তাঁর পাঠাগারে বই আছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। সেই গল্প শুনিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

বাঁধি পাখির নীড়
পাখির জন্য এভাবেই গাছে গাছে হাঁড়ি বেঁধে দেন নাহিদ। ছবি : সংগৃহীত

মুরগির খামারটি মূলত বাবার। তবে মুরগি পালন, পরিচর্যা, খাবার দেওয়া এবং খামার পরিষ্কার রাখাসহ সামগ্রিকভাবে দেখভাল করি আমি। মুরগি বিক্রির লভ্যাংশ ব্যয় করি বই, গাছের চারা এবং মাটির কলস কেনার কাজে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ইসরাইল মোড় এলাকার সন্তান আমি।

বই এবং প্রকৃতি নিয়ে কাজের চিন্তা প্রায় এক যুগ আগের। ২০১৪ সালে। সেবার সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে বিছানায় ছিলাম দীর্ঘদিন। সাত দিন পর জ্ঞান ফিরেছিল। এই দুর্ঘটনায় আমার প্রাণহানিও ঘটতে পারত। সেরে ওঠার পর তাই ভাবলাম, বাকি জীবন সমাজের উপকারে লাগে এমন কাজে ব্যয় করব। আমাদের এলাকার বেশির ভাগ মানুষ কৃষক। অনেকের নিজেদের জায়গাজমি নেই। এসব পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানদের ঠিকমতো বই, গাইড বই, খাতা, কলম কিনতে পারেন না। বেশি জটিলতায় পড়তে হয় এসএসসির ফরম পূরণের সময়। এসব কারণে অনেকে ঝরে পড়ে। তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। শুরুতে এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের গাইড বই ও শিক্ষা উপকরণ কিনে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। অনেককে ফরম পূরণেও সহযোগিতা করেছি, যাতে কেউ ঝরে না পড়ে।

বেচি মুরগি, কিনি বই বাঁধি পাখির নীড়

খামারে মুরগির পরিচর্যা করছেন নাহিদ।      ছবি : সংগৃহীত

কাজটি ছোট পরিসরে একান্তই ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালিয়েছি। ২০২০ সালের দিকে ভাবলাম, বাড়ি বাড়ি না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বই রাখব। সেখানে পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। যারা বাসায় বই নিতে চায়, নিয়ে পড়তে পারবে। এই ভাবনার ফসল ‘শান্তি নিবিড় পাঠাগার’। মাত্র ১৮টি বই নিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন পাঠাগারে বই আছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি রয়েছে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, জীবনী, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্মীয় ও সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ। প্রতিদিন অনেক শিক্ষার্থী এখানে এসে একাডেমিক ও নন-একাডেমিক বিভিন্ন বই পড়ে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয় এবং প্রয়োজনীয় বই বাসায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে বইয়ের অভাবে কোনো শিক্ষার্থী যেন পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে, সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই পাঠাগার। জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তুলছে। সময়ের পরিক্রমায় পাঠাগারটি তাদের জন্য জ্ঞানচর্চা, ব্যক্তিত্ব বিকাশ এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

বেচি মুরগি, কিনি বই বাঁধি পাখির নীড়

শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতির প্রতিও আমাদের দায়িত্ব আছে। তাই গাছ লাগাই, পরিচর্যা করি। আমরা মূলত ফল ও ফুলের গাছ লাগাই বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠে। পাঠাগার শুরুর পর থেকে পাঠকদের হাতে বইয়ের সঙ্গে উপহার হিসেবে গাছের চারা বিতরণ করছি। পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়েও বৃক্ষ রোপণ করেছি। এভাবে এ পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার বৃক্ষ রোপণ করেছি।

পাখিদের আবাসস্থল সংকট বিবেচনায় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মাটির কলস ঝুলিয়ে দিচ্ছি গাছের ডালে ডালে। তীব্র গরম কিংবা বর্ষার দিনে পাখিরা যেন একটু নিরাপদে থাকতে পারে, সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ। পহেলা বৈশাখ, ঈদ কিংবা বিজয় দিবসের মতো বিশেষ দিনগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে মাটির হাঁড়ি দেওয়া হয়। সেগুলোতে ‘শুভ নববর্ষ’, ‘ঈদ মোবারক’সহ নানা শুভেচ্ছা বার্তা লেখা থাকে। রাস্তার পাশে, মাঠের ধারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বর ও খোলা প্রান্তরের গাছগুলোতে দেখা যায় এসব কলস। এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক গাছের ডালে মাটির কলস দিতে পেরেছি আমরা। দূর থেকে সাধারণ মাটির কলস মনে হলেও পাখিদের কাছে এগুলোই নিরাপদ বাসা। সেখানে তারা বাসা বাঁধছে, ডিম দিচ্ছে এবং নিরাপদে বাচ্চা বড় করছে। আমাদের লাগানো অনেক গাছই আজ পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।

এ ছাড়া রাস্তার ধারে পথচারীদের জন্য বেশ কয়েকটি বিশ্রামের স্থানও করে দিয়েছি। সেগুলো রঙিন। কয়েক জায়গায় বসিয়েছি দুটি টিউবওয়েল।

এসব কাজের স্বীকৃতিও মিলেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘চাঁপাই ব্লাড ডোনেশন’ সম্মাননা দিয়েছে। সনদ দিয়েছে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। পেয়েছি ‘এনজিএফবি এক্সিলেন্স সাকসেস অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’। তবে কোনো স্বীকৃতি বা পুরস্কারের আশায় নয়, বরং মানুষ বা প্রকৃতির উপকারে আমার আনন্দ। যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন বই, গাছ, পাখি ও মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই। বিশ্বাস করি, একটি বই একজন মানুষকে আলোকিত করতে পারে, একটি গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, আর একটি মানবিক উদ্যোগ অনেক মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে।

কানসাট সোলেমান ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী আমি। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজগুলো চালিয়ে যাই। এ কাজে পরিবার আমাকে সমর্থন জোগায়। আমার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে প্রায় ১৫জন তরুণ। ভবিষ্যতে পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিস্তৃত করা, পাখিদের জন্য আরো বেশি আশ্রয় তৈরি করা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে বড় পরিসরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা আছে।

 

 

 

প্রাপক আমার বাবা

তা কি আর ভার্চুয়ালি পাওয়া যায়?

তা কি আর ভার্চুয়ালি পাওয়া যায়?

আজ দেশান্তরি হয়ে হাজার মাইল দূরে বসে যখন পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকাই, তখন অস্তিত্বের কেন্দ্রে এক বিশাল মহীরুহকে অনুভব করি—তিনি আমার বাবা। ৯ মাসের দীর্ঘ বিরতি, শুধু ভিডিও কলে সীমাবদ্ধ আমাদের দেখাদেখি। প্রযুক্তির এই কৃত্রিম আলোতে বাবার মুখটি স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু তাঁর হাতের সেই উষ্ণতা, যা একসময় সব ভয় দূর করে দিত, তাকে কি আর ভার্চুয়ালজগতে পাওয়া যায়? আমার বাবা বহুল আলোচিত ‘উগ্র মেজাজ’ বা কঠোর শাসনের এক মূর্ত প্রতীক। শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত তাঁর সেই শাসনের ছায়ায় বেড়ে ওঠা আমার কাছে কখনো কখনো পাহাড়সম মনে হতো। পরিণত বয়সে এসে বুঝি সেই কড়া মেজাজের আড়ালে ছিল এক বিশাল সমুদ্রসম মমতা, পৃথিবীর সব প্রতিকূলতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাকে যিনি অকুতোভয় করে তোলেন। যখন ব্যর্থতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাই, তিনি এক ধ্রুবতারার মতো জ্বলে ওঠেন আমার সমর্থনে। আজ বড় হয়েছি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পৃথিবী দেখার সাহস অর্জন করেছি। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, আমার এই বেড়ে ওঠাকে তিনি শুধু দেখেননি, লালন করেছেন তাঁর সব স্বপ্ন দিয়ে। তাঁর একমাত্র তৃষ্ণা—তাঁর সন্তান একজন ‘প্রতিষ্ঠিত নারী’ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বাবা জানেন না, আমার এই পথচলার প্রতিটি ধাপে যে আত্মবিশ্বাস কাজ করে, সেই জ্বালানি তাঁরই দেওয়া। ভিডিও কলের ওপাশ থেকে যখন তিনি বলেন, ‘সামনে এগিয়ে যাও, কোনো কিছুতেই থেমো না’, তখন মনে হয় হাজার মাইল দূরত্বেও তিনি ঠিক আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। বাবার শাসন আর অনুপ্রেরণা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে আমার সত্তা। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—প্রতিষ্ঠা মানে শুধু ক্যারিয়ার নয়, বরং মেরুদণ্ড সোজা রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচার নামই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা। তাঁর সেই কঠোরতা আজ আমার কাছে এক অনুশাসিত জীবনের পথনির্দেশক। প্রতিদিনের কথোপকথনে তিনি যে স্বপ্ন বুনে দেন, তা আমাকে ক্লান্ত হতে দেয় না। বাবা মানেই সেই আকাশ, যার সীমানা নেই। হাজার মাইল দূরে থেকেও তার ছায়ায় নিরাপত্তা অনুভব করি। সেই ছায়ায়ই আমার বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন দেখা। বাবা, তুমি দূরে আছ ঠিকই, কিন্তু আমার প্রতিটি সাফল্যের প্রতিটি কণায় মিশে আছ তুমি।        

মুমতাহহিনা খাতুন

তেহরান, ইরান

প্রাপক আমার বাবা

আব্বা এবং সিঁড়ির গল্প

আব্বা এবং সিঁড়ির গল্প
চিত্রকর্ম : সাইকেল, বাবা আর আমি। শিল্পী : সমর মজুমদার

আশির দশকের শুরুর লগ্ন। সেদিন বানিয়া বাজারে হাটবার। বাবার হাত ধরে হাঁটছি। পথের ধারেই কড়িয়াইলের শামছুল ইসলাম খানের বিশাল বাড়ি। পুরো এলাকায় এত বড়, এত জাঁকজমকপূর্ণ বিল্ডিং আর একটিও ছিল না। আসা-যাওয়ার পথে খেয়াল করলাম, সেই বিশাল বাড়ির ছাদের ওপর কয়েকজন নারী দাঁড়িয়ে ধান ওড়াচ্ছেন। ধান থেকে চিটা আলাদা করার সেই চিরচেনা দৃশ্য। আমার ভেতরের কৌতূহলী শিশুমন আর শান্ত থাকল না। বাবার হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা আব্বা, ওরা অত ওপরে উঠল কিভাবে?’ বাবা স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন, ‘কেন, সিঁড়ি ডিঙিয়ে।’

সিঁড়ি? সেটি আবার কেমন জিনিস? কৌতূহল যেন এবার আকাশ ছুঁলো। বায়না ধরলাম, ‘আব্বা, আমি ওই সিঁড়ি দেখতে চাই। এখনই দেখব।’ বাবা কিছুটা তাড়া দিয়ে বললেন, ‘এখন তো সময় কম রে, বাবা। বাজারে যেতে হবে। অন্য একদিন দেখাব।’ কিন্তু অবুঝ মন কি আর সময়ের হিসাব বোঝে? বাবার মুখের ‘না’ শুনে আমার অভিমানী মন চট করে বিগড়ে গেল। এক পা-ও নড়ব না বলে জেদ ধরলাম। গত্যন্তর না পেয়ে তিনি নরম হলেন। নিজে বাড়ির বাইরে রাস্তার ধারে অপেক্ষা করে আমাকে ভেতরে পাঠালেন সেই কাঙ্ক্ষিত ‘সিঁড়ি’ দেখতে। মহা আনন্দে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। কিন্তু এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোথাও রাজকীয় বা জাদুকরী সিঁড়ি দেখলাম না। দেখলাম, বাঁশের তৈরি একটি মই! সেই মই বেয়েই লোকজন ওঠানামা করছে। হতাশ হয়ে বাবার কাছে ছুটে এলাম। ক্ষোভের সুরে বললাম, ‘আব্বা, আপনি তো মিছে কথা বললেন! ভেতরে কোনো সিঁড়িটিড়ি নেই। ওটা তো একটি মই!’ বাবা হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘পাগল ছেলে, মইয়ের অপর নামই তো সিঁড়ি!’ আজ হয়তো কত আধুনিক, কত সুন্দর সিঁড়ি দেখি, কিন্তু শৈশবের সেই ‘বাঁশের মই’ আর বাবার মায়াবী হাসিটার চেয়ে আর কিছুই সুন্দর মনে হয় না।