কৈশোরে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল আমাদের গ্রাম। শত শত পাখি, বহু জাতের স্তন্যপায়ী, অসংখ্য সরীসৃপ আর কিছু উভয়চর প্রাণীর সরব উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল প্রকৃতি। শৈশব থেকেই আমার দৃষ্টি ছিল ওদের ওপর। কৈশোরে না বুঝে ওদের অনেকের পেছনে ছুটেছি গুলতি হাতে।
একদিন গুলতি হাতে বাড়ির অদূরে শীতলক্ষ্যা নদীপারের এক বাঁশঝাড়ের ভেতর হাঁটছিলাম। হঠাৎ সামনে সাদা কিছু একটা দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কাছে গিয়ে জিনিসটি হাতে তুলে নিতেই দেখলাম একটি ডিম, আকারে দেশি মুরগির ডিমের চেয়ে কিছুটা ছোট, লম্বাটে ধরনের। সাদা ডিমটি হাতে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। এখানে ডিম এলো কোথা থেকে? তখনই চোখে পড়ল যে নরম ঝুরঝুরে মাটির ওপর থেকে ডিমটি নিয়েছিলাম, সেখানে আবছাভাবে সাদাটে আরো কিছু দেখা যাচ্ছে। হাত দিয়ে মাটি সরাতেই প্রায় ১০টির মতো ফকফকা সাদা ডিম বেরিয়ে এলো। আমার সঙ্গে ছিল গ্রামের এক দুর্দান্ত শিকারি কিশোর দুলাল। গ্রামীণ বনের বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সেই বয়সেই বেশ ভালো জ্ঞান তার। সে ডিমগুলো দেখে বলে উঠল, ‘এইগুলি কাইট্টার (কচ্ছপ) ডিম।’ চমকে উঠলাম। কারণ কচ্ছপ যে মাটির নিচে ডিম পাড়ে, এটি জানা ছিল না। দুলাল তখন সবজান্তার মতো মাথা দুলিয়ে বলল, ‘জানোস, কাইট্টায় কিন্তু চোখের দৃষ্টি দিয়া ডিম ফোটায়, মাটির নিচে ডিম পাইড়া একটু দূরে বইসা একদৃষ্টিতে জায়গাটার দিকে চাইয়া থাকে, আর তার চোখের তাপে একসময় ডিম ফুইট্টা বাচ্চা বাইর হইয়া আসে।’ কথাগুলো বলে সে আশপাশে কচ্ছপ খুঁজতে লাগল। হেসে বললাম, দূর ব্যাটা চোখের তাপে আবার ডিম ফুটে নাকি, এটি অসম্ভব ব্যাপার।

কচ্ছপের ডিম দেখে আমার রবিদাসপাড়ার লিলির মায়ের কথা মনে পড়ল। রবিদাসরা শজারু, শূকর থেকে শুরু করে ইঁদুর পর্যন্ত ভক্ষণ করে থাকে। গুইসাপ কিংবা কচ্ছপের ডিম কোনোটাতে তাদের অরুচি নেই। সেই পাড়ার এক দীর্ঘদেহী নারী ছিলেন লিলির মা, আমরা তাঁকে খুব ভয় পেতাম। তিনি ছিলেন সূর্যপূজারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। চোখ দুটি ছিল রক্তজবার মতো লাল। মাঝেমধ্যে শিকার করা প্রাণী নিয়ে যেতাম তাঁর কাছে। আসলে ভাব জমানোর চেষ্টা। তিনিও আমাকে বেশ আদর করতেন। ফাঁদে আটকে পড়া ইঁদুর আর কাঠবিড়ালি নিয়মিত তাঁর কাছে সরবরাহ করতাম। তাই কচ্ছপের ডিমগুলো দেখে সবার আগে তাঁর কথা মনে পড়ল। এগুলো দেখে তিনি নিঃসন্দেহে খুব খুশি হবেন। এগুলো তাঁর কাছে নিয়েও গিয়েছিলাম। তবে সেই কম বয়সী অপরিপক্ব মাথায় একবারও সেই চিন্তা আসেনি যে কাজটি মোটেও ঠিক হচ্ছে না।
সেদিন যার ডিম খুঁজে পেয়েছিলাম, সেটি দেশি কড়ি কাইট্টা। গ্রামের এমন কোনো ডোবা, নালা, বিল কিংবা পুকুর ছিল না, যেখানে তার অস্তিত্ব নেই। ডুবিয়ে রাখা নৌকার গলুইয়ে কিংবা জলাশয়ের পারে বহুবার তাদের রোদ পোহাতে দেখেছি। মানুষের সাড়া পেলে ধুম করে পানিতে নেমে যেত। সবচেয়ে ভালো লাগত, যখন এদের বাচ্চারা গলা উঁচু করে জলের ওপর ভেসে থাকা মরা ডালের ডগায় বসে থাকত। যেই ওদের ধরার জন্য কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম, ওরা টুপ করে পানিতে পড়ে হারিয়ে যেত। এভাবে ডালের ডগায় বসে থাকা কড়ি কাইট্টার বাচ্চার দিকে ঢিল ছোড়া গ্রামের শিশুদের এক মজার খেলা ছিল।
চৈত্র মাসের শেষে স্ত্রী কড়ি কাইট্টা জলাশয়ের পাশের বাঁশঝাড় কিংবা ঝোপ-জঙ্গলের নিচের নরম মাটি খুঁড়ে ডিম পাড়ত। এরপর ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে ডিমগুলোকে ঢেকে সে চলে যেত। সূর্যের আলোর উষ্ণতায় একসময় ডিমগুলো থেকে বাচ্চা ফুটে বেরিয়ে আসত। এরপর ওরা দল বেঁধে রওনা হতো জলাশয়ের উদ্দেশে। সদ্য ফোটা বাচ্চারা নির্ভুল নিশানায় ঠিকই পৌঁছে যেত জলাশয়ের কাছে, এ যেন প্রকৃতির এক অতি রহস্যময় ইঙ্গিত।
শুকনা মৌসুমে যখন বেশির ভাগ জলাশয় শুকিয়ে যেত, কড়ি কাইট্টা লুকিয়ে থাকত মাটির নিচে। তখন জমি চাষ করার সময় কৃষকের লাঙলের ডগায় উঠে আসত এদের দেহ। এ ছাড়া ঝোপঝাড়ের নিচে শুকনা পাতা ঝাড়ু দেওয়ার সময় কড়ি কাইট্টা খুঁজে পাওয়া যেত। মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে কচ্ছপের মাংস অতি প্রিয়। অনেকের কাছে আবার এটি ‘জল খাসি’ নামে পরিচিত। কড়ি কাইট্টার ওজন সর্বসাকল্যে দুই-আড়াই কেজি। ওজন কিংবা সংখ্যা—দুইভাবেই তখন খোলাবাজারে কড়ি কাইট্টা বেচাকেনা চলত।
শীতকালে বেশির ভাগ জলাশয় শুকিয়ে যেত। কচ্ছপ শিকারিদের ছইওয়ালা নৌকা এসে ভিড়ত নদীর ঘাটে। ওরা আসত গাজীপুরের নাগরী অঞ্চল থেকে। নাগরীর খ্রিস্টানপাড়ায় কচ্ছপের বেশ চাহিদা ছিল তখন। নৌকায় করে আসা কচ্ছপ শিকারিদের প্রত্যেকেই ছিল অভিজ্ঞ ‘ট্র্যাকার’। বলতে গেলে সারা দিন ওদের পেছনে লেগে থাকতাম। সকালে নৌকা থেকে নেমে শিকারিরা সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ত। ওদের হাতে থাকত বাঁশের হাতলযুক্ত লোহার ত্রিফলা। খাল-বিল আর পুকুরপারে কচ্ছপ থাকতে পারে এমন সব স্থানে ওরা ত্রিফলা দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করে যেত। যখন হঠাৎ লোহার ফলার সঙ্গে শক্ত কিছুর আঘাত লেগে কট করে শব্দ হয়ে উঠত, তখনই ওরা থমকে দাঁড়িয়ে জায়গাটি পরীক্ষা করে দেখত। এভাবেই মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসত কড়ি কাইট্টার পিঠের কঠিন খোল। এরপর ওরা সঙ্গে থাকা বস্তায় ভরতো। বিকেলে শিকারিরা বস্তা ভর্তি কচ্ছপ নিয়ে নদীর ঘাটে চলে আসত। এভাবে যত দিন না নৌকা পরিপূর্ণ হয়, ওরা গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়াত কচ্ছপের সন্ধানে।
দেশি কড়ি কাইট্টাকে ইংরেজিতে বলা হয় Indian Roofed Turtle। এই নামকরণের পেছনের কারণ হচ্ছে, ওদের উঁচু পিঠ, যা দেখতে অনেকটা ঘরের চালের মতো ঢালু। বৈজ্ঞানিক নাম Pangshura Tecta. একসময় বাংলাদেশের সব জলাশয়ে কড়ি কাইট্টার দেখা মিলত। এখন বলতে গেলে এদের আর দেখাই যায় না। কেন এমনটি হলো? প্রথমেই বলতে হয় পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা। দেশের বেশির ভাগ প্রাকৃতিক জলাশয়, বিশেষ করে পুকুর ও বিলগুলো পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক মৎস্য খামারে। চাষের শুরুতে প্রতিটি জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ করে সব দেশি মাছ এবং জলজ প্রাণী মেরে ফেলা হয়। এই প্রবল অপরাধে অন্যান্য জলজ প্রাণীর মতো মৃত্যু হয়েছে হাজার হাজার কড়ি কাইট্টার। এ ছাড়া দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে নদীদূষণ। অন্যান্য জলজ প্রাণীর মতো কড়ি কাইট্টার জীবন আজ তাই বিপন্ন। বহু নদীর পানি পরিণত হয়েছে বিষের তরলে। সেখানে কোনো জলজ উদ্ভিদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। নেই শৈবাল, নেই কুচো চিংড়ি। কড়ি কাইট্টা কী খেয়ে বাচবে? যুগের পর যুগ ধরে মানুষ তাদের প্রয়োজনে একের পর এক জলাশয় ভরাট করে তৈরি করেছে বসতবাড়ি কিংবা ফসলের জমি। এতে সংকুচিত হয়ে এসেছে কড়ি কাইট্টার আশ্রয়স্থল। অবাধ শিকার এদের সংখ্যা কমে যাওয়ার আরো একটি বড় কারণ। কচ্ছপ শিকারিরা খুবই পারদর্শী। দীর্ঘ সময় ধরে ওরা খুঁজে খুঁজে নৌকা বোঝাই করে এদের নিয়ে গেছে। ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন প্রণীত হওয়ার পর কচ্ছপ শিকার কমেছে। বন বিভাগের পাশাপাশি বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে কচ্ছপসহ বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায়। তাই বিশ্বাস করি, দেশি কড়ি কাইট্টা আবার স্বাভাবিক সংখ্যায় ফিরবে বাংলার বুকে।






