• ই-পেপার

কিচেন পোর্টার থেকে

টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিকার

  • মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিলেতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মুশতাক আহমদ। ইংল্যান্ডে রেস্টুরেন্টের অন্দরে ‘কিচেন পোর্টার’ হিসেবে কর্মজীবন শুরু। পিত্জা ডেলিভারি, সিকিউরিটি গার্ডের চাকরিও করেছিলেন। এখন তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পিকার। লিখেছেন ইয়াহইয়া ফজল

আজতেকার অনন্য হ্যাটট্রিক

আল সানি

আজতেকার অনন্য হ্যাটট্রিক

১৯৮৬ সালের জুনের এক তপ্ত দুপুর। মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন এক লাখ ১৪ হাজার দর্শকের চিৎকার। মাঝমাঠ থেকে বলটি পেয়েই এক অবিশ্বাস্য দৌড় শুরু করলেন কোঁকড়া চুলের এক জাদুকর। একের পর এক ইংলিশ ডিফেন্ডারদের ছিটকে দিয়ে বলটি যখন জালে জড়াল, ধারাভাষ্যকার চিৎকার করে উঠলেন ‘ডিয়েগো ওওও ম্যারাডোনা!’ ফুটবল ইতিহাসের সেই ‘শতাব্দীর সেরা গোল’-এর সাক্ষী এই মাঠ। তারও ১৬ বছর আগে, ১৯৭০ সালে এই মাঠেরই ঘাসে শেষবারের মতো বিশ্বজয়ের নাচ নেচেছিলেন কালো মানিক পেলে। ফুটবল ইতিহাসের বড় দুই ঈশ্বরের বিশ্বজয়ের ট্রফি ছোঁয়ার স্মৃতি যেখানে জড়িয়ে, সেই মাঠে আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের পর্দা উঠেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই মাঠেই রেফারি বাজিয়েছেন উদ্বোধনী বাঁশি।

আজতেকার অনন্য হ্যাটট্রিক

ইতিহাসের কোনো স্টেডিয়াম আজ পর্যন্ত যা করতে পারেনি, আজতেকা এবার সেটিই করে দেখাচ্ছে। ১৯৭০ আর ১৯৮৬ সালের পর ২০২৬ সালে এসে পৃথিবীর প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের অনন্য এক ‘হ্যাটট্রিক’ করল এই ঐতিহাসিক মাঠ। আজতেকা স্টেডিয়ামের প্রতিটি ধূলিকণায় যেন ১৯৭০ সালের সেই কিংবদন্তি ব্রাজিল দলের স্মৃতি মিশে আছে। মেক্সিকোর সেই বিশ্বকাপে পেলে এসেছিলেন একরাশ চাপ আর চোটের শঙ্কা মাথায় নিয়ে। কিন্তু আজতেকার চেনা সবুজ ঘাসে পা রাখতেই যেন খোলস বদলে গেল কালো মানিকের। টুর্নামেন্টজুড়ে তো বটেই, বিশেষ করে ইতালির বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটিতে আজতেকা দেখেছিল পেলের ফুটবলীয় শিল্পের চূড়ান্ত রূপ। ম্যাচের মাত্র ১৮ মিনিটে পেলের সেই শূন্যে ভেসে নেওয়া জাদুকরী হেডের গোলটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ছবি। শুধু গোল করাই নয়, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানো আর মাঠে তাঁর একেকটি ড্রিবলিং গ্যালারির হাজার হাজার মানুষকে সম্মোহিত করে রেখেছিল। ম্যাচ শেষে ব্রাজিল যখন ৪-১ ব্যবধানে ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো জুলে রিমে ট্রফি নিজেদের করে নিল, তখন আজতেকা স্টেডিয়াম রূপ নিয়েছিল এক মহাসমুদ্রে। উন্মত্ত মেক্সিকান সমর্থকরা মাঠে নেমে পেলেকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল, তাঁর মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান ‘সোমব্রেরো’ টুপি। পেলে কাঁদছিলেন আর তাঁর সেই অশ্রুসিক্ত আনন্দের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল আজতেকার আকাশ। ওটিই ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে ফুটবলসম্রাটের শেষ রাজকীয় নাচ, যা এই মাঠকে রাতারাতি অমর করে দেয়।

পেলের বিদায়ের ঠিক ১৬ বছর পর এই আজতেকা স্টেডিয়ামেই ফুটবলবিশ্ব দেখেছিল আরেক ঈশ্বরের অবতার। ১৯৮৬ সালের সেই বিশ্বকাপটি ছিল একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জেতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেই বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ঈশ্বরের হাতের গোল নিয়ে আজও ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তর্ক চলে। তবে সেই তর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই তার ঠিক চার মিনিট পরেই ম্যারাডোনা যা করেছিলেন, তা শুধু এই আজতেকা মাঠেই সম্ভব ছিল। নিজের অর্ধে বল পেয়ে জাদুকরের মতো ঘুরলেন তিনি। এরপর একে একে পিটার বেয়ার্ডসলে, পিটার রিড, টেরি ফেনউইক ও টেরি বুচারের মতো ইংলিশ ডিফেন্ডারদের ছিটকে ফেলে বোকা বানালেন গোলরক্ষক পিটার শিল্পটনকেও। ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেস তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলছিলেন, ‘তুমি কোন গ্রহ থেকে এসেছ?’ ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে ম্যারাডোনা যখন ট্রফিটি দুই হাতে উঁচিয়ে ধরেছিলেন, তখন এই মাঠটিই হয়ে উঠেছিল আলবিসেলেস্তেদের রূপকথার মঞ্চ।

ফুটবলারদের জন্য আজতেকা স্টেডিয়ামে খেলা কিন্তু মোটেও সহজ নয়। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ২০০ ফুট উঁচুতে। একটু সহজ করে বললে প্রায় পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি। এত উঁচুতে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমতলের চেয়ে অনেক কম থাকে। এর ফলে ফুটবলারদের স্ট্যামিনা বা দম খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। একটু দৌড়ালেই বুক ভরে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, বাতাসের ঘনত্ব কম থাকার কারণে এখানে বলের গতিও সাধারণ মাঠের চেয়ে অনেক দ্রুত হয়। মাঠের এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ জয় করাটা এবার নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য হবে এক অগ্নিপরীক্ষা।

 

 

[ দিনগুলি মোর ]

শেষ আলিঙ্গন

শেষ আলিঙ্গন
অলংকরণ : তানভীর মালেক

মা ছিলেন ডাক্তারের মেয়ে। গায়ের রং ফরসা, গোলাকার মুখ। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি কিংবা শ্যামাসংগীতে মায়ের তুলনা ছিল না। প্রতিবছর মনসাপূজার এক মাস আগে থেকে ‘মনসামঙ্গল’ পাঠ শুরু করতেন। গ্রামের নারীরা এসে মায়ের সঙ্গে সুর মেলাতেন। মায়ের হাতের রান্না যে একবার খেয়েছে, সে বারবার আমাদের বাড়ি এসেছে। বাবা সেটলমেন্টের চাকরি করতেন। কী এক অজ্ঞাত কারণে বাবাসহ তাঁদের অফিসের সবার চাকরি চলে যায়। বাবা তখন ম্যাট্রিক পাস। বাড়িতে এসে দাদুর পরামর্শে একটি মুদি দোকান দেন। বিষয়টি ভালো চোখে দেখলেন না মা। তিনি বাবাকে বললেন, ‘আমি ডাক্তারের মেয়ে। আমার স্বামী একজন মুদি দোকানদার—এটি সবাইকে কিভাবে বলব? তোমাকে সরকারি চাকরি করতে হবে।’

বাবা রাজি হননি। বাড়ির কাছেই উপজেলা সদরে ছিল তাঁর দোকান। মা বললেন, ‘এক কাজ করো। তুমি প্রাইমারি স্কুলের চাকরির পরীক্ষা দাও। এর আগে পিটিআই শেষ করো।’ বাবা বললেন, ‘পিটিআই পড়তে তো টাকা লাগবে। টাকা কোথায়? তা ছাড়া আমাকে খুলনায় গিয়ে পড়তে হবে। এদিকে সংসার কিভাবে চলবে?’ মা হেসে বললেন, ‘টাকা আমি দেব। আমার সোনার অলংকার বিক্রি করে তুমি টাকা নিয়ে এসো।’ বাবা প্রথমে রাজি হননি। মা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন। পরে রাগ করে মা তাঁর বাবার বাড়ি বরিশালে চলে গেলেন। দিন দশেক পর  মাকে আনতে মামার বাড়ি গেলেন দাদু। মা বললেন, ‘আপনার ছেলে যদি পিটিআই পড়তে যায়, তাহলেই আপনাদের বাড়ি যাব।’

মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন দাদু। আমাদের জায়গাজমি বলতে শুধু বসতবাড়ি আর বিঘা দুই জমি। দাদুকে জমি বিক্রি করতে না দিয়ে মা বললেন, ‘আমার সোনার দরকার নেই। শিক্ষিত স্বামীই আমার সোনা। আমি তাকে সরকারি চাকরিতে দেখতে চাই।’

অবশেষে মায়ের সোনা বিক্রির টাকায় বাবার পড়াশোনা চলতে লাগল। পিটিআই পাস করে বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পেলেন।

মা গর্ব করে বলতেন, ‘আমার স্বামী চাকরি করে। সে ছাত্রদের শিক্ষা দেয়।’ শিক্ষকতা পেশার প্রতি মায়ের অগাধ ভক্তি ছিল। তাই আমিও শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছি। মা আমাকে একদিন বললেন, ‘দীপ, তোমার বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তোমাকে সর্বনিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা কলেজের প্রফেসর হতে হবে। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হলে তো কথাই নেই।’ পড়ার সময় মা আমার পাশে বসে থাকতেন। বিদ্যুৎ ছিল না। মা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন।

একবার আমার ছোট বোনের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। দিদি ব্যস্ত সাজতে। মা ও বড় বোন রান্নাঘরে ব্যস্ত। ‘লক্ষ্মীর পাঁচালী’ পড়ার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। মা যে ছন্দে শিখিয়েছেন, সেই ছন্দে পড়া শুরু করলাম। সম্বন্ধ করতে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা পাশের রুম থেকে আমার পাঁচালী পড়া শুনলেন। যাওয়ার সময় মাকে বললেন, যে মায়ের ছেলে এত সুন্দর করে ‘লক্ষ্মীর পাঁচালী’ পড়তে পারে, সেই সংসারের মেয়ে আমরা নেব। আমাদের এই সুখ বেশিদিন সইল না। আমার ছোট বোন মারা যাওয়ার খবর শুনে মা পাগলের মতো হয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে মনে হতো, মা আমাকে চেনেন না। আমি তখন ঢাকায় থাকি। যে মায়ের টানে বাড়ি ফিরে যাই, সেই মা আমাকে চেনেন না। স্নান করার সময় মা আর লুঙ্গি ও গামছা নিয়ে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে থাকেন না। ভীষণ ভেঙে পড়ি। কয়েক বছর পর একটি কলেজে চাকরি হয় আমার। আমি খুলনা, বরিশাল, ঢাকা—কোথাও ডাক্তার দেখাতে বাদ রাখিনি। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে বাড়ি গিয়েছিলাম। পাশের বাড়ির পুকুরে স্নান করতে নামি। স্নান শেষে ওপরে উঠতে যাব, দেখি মা লুঙ্গি ও গামছা নিয়ে ঘাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। সেটিই ছিল শেষ আলিঙ্গন। এর সপ্তাহখানেক পর আমাদের ছেড়ে চলে যান মা।

দিলীপ দাস

সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ

ভাঙ্গা মহিলা কলেজ, ফরিদপুর

 

বাংলার শকুন সব গেল কই?

সরওয়ার পাঠান

বাংলার শকুন সব গেল কই?
ছবি : সাঈদ বিন জামাল

শীতলক্ষ্যার পার্শ্ববর্তী খাড়ির ঢালের পাশেই ছিল আমাদের বাড়ি।  ঠিক পশ্চিমে রবিদাস পাড়া। তারা স্থানীয় বাজারে জুতা সেলাই করত। গবাদি পশুর চামড়ার সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামের কোথাও গরু-ছাগল মারা গেলে তারা সেই মৃতদেহ পাড়ায় নিয়ে আসত। তারপর চামড়া ছিলে হাড্ডি-মাংস সমেত দেহটি খাড়ির ঢালে ফেলে রাখত। এই চামড়াবিহীন মৃতদেহের মাংস খাওয়ার লোভে বিশাল আকারের শকুনগুলো ঝাঁক বেঁধে হাজির হতো আশপাশের গাছে। কিছু সময় পর মড়ার কাছে উড়ে গিয়ে খাওয়া শুরু করত। পেট ভরলে বিশ্রামের জন্য চলে আসত গাছে। এভাবে মাংস নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত চলত ওদের আসা-যাওয়া।

বাংলার শকুন সব গেল কই?

হারিয়ে যাওয়া রাজ শকুন

শৈশব-কৈশোরের বহু সময় কেটেছে শকুনের সঙ্গে। খুব কাছে গেলেও ওরা উড়ে যেত না। নেড়ি কুকুরের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ওদের ঝগড়া লাগত। দেখা যেত মৃতদেহটি একদিক দিয়ে কুকুরের পাল টানছে, অন্যদিকে শকুনের ঝাঁক। গ্রামের কেউ শকুনদের বিরক্ত করত না। এমনকি গ্রামের কোনো শিকারি কোনো দিন শকুনের দিকে বন্দুক তাক করেনি। সবাই জানত ওরা না থাকলে মৃত পশুর পচা মাংসের গন্ধে বাতাস দূষিত হয়ে উঠবে। অ্যানথ্রাক্স কিংবা রেবিসের মতো প্রাণঘাতী জীবাণু সহজেই হজম করে ফেলত ওদের শক্তিশালী পাকস্থলী। মানুষ আর গবাদি পশু রক্ষা পেত ভয়ানক ব্যাধির সংক্রমণ থেকে।

কালচে-বাদামি শকুনের (হোয়াইট ব্যাকট ভালচার/বেঙ্গল ভালচার) ঝাঁকে ২০ থেকে ৩০টি পাখি থাকত। প্রায় সময়ই শকুনের গরু খাওয়া দেখতাম। বাংলা শকুনের সঙ্গে থাকত রাজকীয় চেহারার রাজশকুন (কিং ভালচার), অনেকে আজও বিশ্বাস করে রাজশকুন ছুঁয়ে না দেওয়া পর্যন্ত অন্য শকুনরা মৃতদেহ স্পর্শ করে না। ঠিক যেন রাজাকে এক ধরনের সম্মান দেখানো।

১৯৯৫ সাল পর্যন্ত শকুনদের স্বাভাবিক সংখ্যায় আসতে দেখেছি। তবে তখন ওদের সঙ্গে রাজশকুন ছিল না। শুধু রবিদাস পাড়ার নিচে নয়, যেখানেই গবাদি পশু মারা যেত, সেখানেই এসে হাজির হতো শকুনের ঝাঁক। লোকে অবাক হয়ে বলাবলি করত, মাছি হচ্ছে শকুনদের বার্তাবাহক, ওরাই তাদের কাছে মড়ার খবর নিয়ে যায়। ঘটনা কিন্তু তা নয়, শকুনের ঝাঁক খুব ভোর থেকে আকাশের একটি বিরাট এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে উড়তে থাকে। এরা অত্যন্ত তীক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন। মড়ার খোঁজে যেমন নিচের দিকে লক্ষ রাখে, তেমনি খেয়াল রাখে পরস্পরের প্রতি। দূরের একটি শকুন যখন মড়া দেখতে পেয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে, অন্য পাখিরা তাৎক্ষণিক তাকে অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। রাজশকুন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিছু বাংলা শকুন টিকে আছে সিলেট, সুন্দরবনসহ কয়েকটি এলাকায়।

বাংলার বুকে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ শকুন কোথায় গেল? প্রকৃতি থেকে শকুন হারিয়ে যাওয়া কিংবা ওদের সংখ্যা হ্রাসের বিষয়ে বিশেষ ওষুধের প্রতিক্রিয়াকে দায়ী করা হয়। সত্তরের দশক থেকে গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যথানাশক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক ও ক্যাটোপ্রোফেনের ব্যবহার শুরু হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ওষুধ প্রয়োগ করা মৃত গবাদি পশুর মাংস খেলে শকুনের কিডনি বিকল হয়। এরপর যন্ত্রণাদায়ক অসুখে আক্রান্ত হয়ে কয়েক দিনের মধ্যে পাখিটির মৃত্যু ঘটত। পরে অবশ্য এসবের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। তবে ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় শকুনের মৃত্যুর বিষয়টি এত ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে যে অনেকের বদ্ধমূল ধারণা, শুধু ওষুধের কারণেই রাজশকুনের বিলুপ্তি ঘটেছে, বাংলা শকুন হয়েছে বিপন্ন। তবে দেশের বুক থেকে শকুন হারিয়ে যাওয়া কিংবা শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনের মূল কারণ কিন্তু শুধু ওষুধের প্রতিক্রিয়া নয়। একটি বন্যপ্রাণী প্রকৃতিতে টিকে থাকার পেছনে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—স্বাভাবিক খাদ্য, নিরাপদ আবাসস্থল ও সঠিক প্রজনন। ৩০ থেকে ৪০ বছর আগেও শকুনের খাদ্যের অভাব ছিল না। বিশেষ করে প্রতিবছর দু-একবার গবাদি পশুর মড়ক দেখা দিত। পরে ভেটেরিনারি চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নে গবাদি পশুর মৃত্যুসংখ্যা কমে আসে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জীবাণু সংক্রমণ রোদে গবাদি পশুর মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে রাখার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে শকুন পড়ে যায় বিরাট সমস্যায়। নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ ছাড়া বিশাল পাখিটির বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়ে। একটি পূর্ণবয়স্ক শকুনের জন্য প্রতিদিন গড়ে এক কেজি মাংসের দরকার। তবে কয়েক দিন না খেয়ে থাকলেও কিছু হয় না। আছে প্রকৃতির দেওয়া এক অনন্য উপহার ‘ক্রপ’ বা গলার নিচের থলি, যেখানে ওরা একবার গোগ্রাসে খেয়ে কয়েক দিনের খাবার জমা রাখতে পারে। কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ খাদ্য না পেয়ে তার পক্ষেও বেঁচে থাকা অসম্ভব। শকুনদের কি নিরাপদ আবাসস্থল ছিল? প্রকৃতি প্রায় বৃক্ষশূন্য, বিশাল প্রাচীন গাছ নেই বললেই চলে। অথচ শকুনের আশ্রয়ের জন্য বট, অশ্বত্থ, শিমুল, কড়ই, চুরুল ইত্যাদি গাছ খুবই প্রয়োজনীয়।

সঠিক প্রজননের ক্ষেত্রেও প্রাচীন বৃক্ষের বিকল্প নেই। শকুন বাসা তৈরি করত বিশাল সব বৃক্ষের মগডালে। সেসব গাছ কাটার ফলে ব্যাহত হয়েছে ওদের প্রজননপ্রক্রিয়া। অন্য অনেক পাখির মতো বিকল্প জায়গা খুঁজে নিতে পারেনি ওরা। এ ছাড়া শকুনের প্রজননপ্রক্রিয়ায় একটি বিশেষ ঘাটতি রয়েছে। এখানে আমাদের দেশি দুটি পাখির কথা উল্লেখ করতে হয়। একটি পাতিসরালি, অন্যটি ডাহুক। ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন প্রণীত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই পাখি দুটির পালিয়ে বাঁচার উপায় ছিল না। শিকারিরা যখন যেখানে পেয়েছে, ফাঁদ পেতে কিংবা গুলি করে হত্যা করেছে।‌ কিন্তু তবু ওদের সংখ্যা বিপজ্জনক মাত্রায় কমেনি। একটি বুনো সরালিকে ১৪টি ডিম পাড়তে দেখেছি, অন্যদিকে ডাহুক ডিম দেয় পাঁচ থেকে আটটি। ডিম কিংবা ছানার সংখ্যা একটি বন্যপ্রাণীর বংশবিস্তারের এবং প্রকৃতিতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এদিক দিয়ে শকুন বড় পিছিয়ে। রাজশকুন প্রতিবছর ডিম দেয় মাত্র একটি, আর বাংলা শকুন কোনো কোনো সময় দুই বছরেও একটি ডিম দিয়ে থাকে। সব ডিম ফুটে যে বাচ্চা বের হয়, তা কিন্তু নয়। আবার সব ছানা যে ওড়ার আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকে, তা-ও নয়। তাই শকুনের প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকতে ভালো সংখ্যায় প্রকৃতিতে বিরাজ করা দরকার। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলছে শকুনদের প্রাকৃতিক খাদ্যসংকট। প্রতিবছর শীতকালে হিমালয় অঞ্চল এবং তিব্বত মালভূমির বিশাল আকারের এক পরিযায়ী শকুন আমাদের দেশে আসে। তখন প্রায়ই পত্রিকার পাতায় খবর হয়, ‘মানুষের হাতে ধরা পড়েছে অসুস্থ হিমালয়ান গৃধিনী শকুন’। আসলে সে অসুস্থ নয়, থাকে ক্ষুধায় কাতর। নিয়মিত লাল মাংস খেতে দিলে কয়েক দিনের মধ্যে ওরা সুস্থ হয়ে ওঠে। আট থেকে ১২ কেজি ওজনের একটি বিশাল পাখি দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যখন কোথাও খাদ্য গ্রহণের সুযোগ না পায়, তখন মাটিতে আছড়ে পড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সংরক্ষিত অঞ্চল ছাড়া উপকারী এই পাখিটিকে আর কোথাও দেখা যাবে না।

 

 

 

লিখুন বাবাকে নিয়ে

লিখুন বাবাকে নিয়ে

বাবার কঠোর শাসনের আড়ালে থাকে কোমল মায়া। হয়তো কখনো তাঁকে বলতে পারেননি নিজের মনে জমে থাকা কথাগুলো। ৪০০ শব্দের মধ্যে সেটা লিখে পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। বাবার সঙ্গে নিজের প্রিয় মুহূর্তের ছবি পাঠাতেও ভুলবেন না।

লেখা পাঠাতে হবে

১৭ জুনের মধ্যে

মেইল করুন

[email protected]

ডাকযোগে

বিভাগীয় সম্পাদক, অবসরে, কালের কণ্ঠ,প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা ঢাকা-১২২৯