প্রবাসীদের জন্য আগামী মাসে চালু হতে যাওয়া ‘প্রবাসী কার্ড’ শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; বরং সমন্বিত ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, আন্তর্জাতিক মানের ইএমভি চিপসংবলিত এ কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারি সেবা পাওয়া সহজ হবে, বাড়বে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগও। এ লক্ষ্যে কার্ডটির সেবা ও বাস্তবায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করতে কাজ করছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক কার্ডটির কারিগরি ও বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে কাজ করছে।
প্রতিবছর কয়েক লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার শুরু থেকে দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত নানা ধরনের ভোগান্তি, দালালের প্রতারণা, ব্যাংকিং জটিলতা এবং সরকারি সেবা পেতে হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বিমানবন্দর, আর্থিক লেনদেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবায় এসব সমস্যা বেশি দেখা যায়।
এই কার্ড চালু হলে বিমানবন্দরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা না করে প্রবাসীরা ব্যবহার করতে পারবেন আলাদা ইমিগ্রেশন বুথ। দেশে-বিদেশের বিমানবন্দরে মিলবে বিনামূল্যে লাউঞ্জ সুবিধা ও ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবা। সরকারি হাসপাতালে থাকবে বিশেষ সেবা, বিমানের টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে মিলবে ছাড়।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ করার উদ্যোগ : বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী এখনো বিভিন্ন কারণে হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে অর্থ পাঠান। ব্যাংকে যেতে সময় লাগে, অনেক এলাকায় শাখা নেই, আবার ছুটির দিনেও লেনদেন করা যায় না। ফলে অনেকেই সহজ বিকল্প বেছে নেন।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকই ডুয়েল কারেন্সি হিসাব পরিচালনার সুবিধা দিচ্ছে। সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই প্রবাসীদের জন্য নতুন সেবা কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আরো বেশি পরিমাণে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, প্রথম পর্যায়ে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে জর্দানে যাওয়া প্রায় ৫০ হাজার নারীকর্মীকে এই কার্ড দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদেরও এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। তবে কোন শ্রেণির প্রবাসীরা কিভাবে এই কার্ড পাবেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
প্রথম পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে এই কার্ড ইস্যু করা হবে। কার্ড পেতে হলে জনতা ব্যাংকে হিসাব, বৈধ পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং বিএমইটির স্মার্ট কার্ড থাকতে হবে।
প্রবাসীদের প্রত্যাশা কার্যকর সেবা : সৌদি আরবপ্রবাসী সাকিফ বলেন, ‘আমরা লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী সৌদি আরবে কাজ করছি। দেশে আসা-যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে নানা অসুবিধার মুখে পড়তে হয়। কষ্টার্জিত অর্থ সহজে দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানির শিকার হতে হয়। আমরা এসব ভোগান্তির অবসান চাই। সরকার এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে বলে আশা করি।’ আরো কয়েকজন প্রবাসী বলেন, এর আগে বিএমইটির স্মার্ট কার্ড চালু হলেও সেটির ব্যবহার সীমিত ছিল। বাস্তবে খুব বেশি সুবিধা না পাওয়ায় নতুন কার্ড নিয়েও তাঁদের প্রত্যাশার পাশাপাশি কিছুটা সতর্কতাও রয়েছে। তাঁদের মতে, ঘোষিত সুবিধা বাস্তবে নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন কার্ডও আগের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হবে। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিনির্ভর এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা অন্তত ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন।
সফলতার শর্ত কার্যকর বাস্তবায়ন : অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, নতুন কোনো উদ্যোগ চালুর ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। প্রবাসী কার্ড পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে বলে শুরু থেকেই ব্যবহারকারীদের মতামত নেওয়া, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগে, বিদেশে অবস্থানকালে এবং দেশে ফেরার পর—পুরো অভিবাসন চক্রজুড়েই যেন এই কার্ড ব্যবহার করতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। আসিফ মুনীরের ভাষায়, অতীতে বিএমইটির স্মার্ট কার্ড মূলত বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। অধিকাংশ কর্মীর কাছে সেটির আলাদা কোনো কার্যকারিতা ছিল না। তাই নতুন প্রবাসী কার্ডের সঙ্গে আগের কার্ডের পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। তিনি আরো বলেন, প্রবাসী কার্ডধারীরা যদি অন্য নাগরিকদের মতো একই ধরনের সেবা পান, তাহলে এই কার্ড ব্যবহারে আগ্রহ তৈরি হবে না। হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর, ঋণ, তথ্যসেবা কিংবা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক বা ফাস্ট-ট্র্যাক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই কার্ডটির বাস্তব মূল্য তৈরি হবে।
নিয়মিত তদারকির ওপর নির্ভর করবে সফলতা : অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু কার্ড ইস্যু করলেই উদ্যোগ সফল হবে না। ঘোষিত সুবিধাগুলো বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেবার মান বজায় থাকছে কি না এবং প্রবাসীরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারছেন কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তাঁদের মতে, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রবাসী কার্ড শুধু প্রবাসীদের হয়রানি কমাবে না; বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো, সরকারি সেবা সহজ করা এবং প্রবাসীদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।