হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নির্ধারিত নৌপথ বিচ্যুত হওয়ার পর এক তেলবাহী ট্যাংকারের কাছে সামুদ্রিক মাইনের বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলসীমায় তেহরান অনুমোদিত রুট থেকে সরে যাওয়ার পর জাহাজটি মাইনের কবলে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। তবে এই ঘটনার বিষয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পষ্টতই ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না করেই যাত্রা করা তেলবাহী ট্যাংকারটিতে বিস্ফোরণ ঘটে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে ইরান বারবার সতর্ক করে জানিয়েছিল, জাহাজগুলো যদি ইরানের ঘোষিত রুট থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তার পরিণতি তাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। আর আইআরজিসি জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় বজায় রাখতে হবে এবং ইরানের নির্ধারিত রুট ব্যবহার করতে হবে।
এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখছে। অবরোধের অংশ হিসেবে তারা অবরোধ লঙ্ঘনের চেষ্টাকারী ১২টি বাণিজ্যিক জাহাজকে অন্য পথে পাঠিয়েছে, নিয়ম না মানা দুটি জাহাজকে অচল করে দিয়েছে এবং দুটি জাহাজে আরোহণ করেছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হোদাইদাহ বন্দর ও কামারান দ্বীপে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলের জিজান ও ইয়ানবুতে অবস্থিত সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানি বাহিনীও একাধিক হামলা চালিয়েছে।
কাতার ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ফোনালাপ : রবিবার কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আঞ্চলিক ঘটনাবলি নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন। গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। আবার হুতিরা সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল থানি তাঁর সৌদি প্রতিপক্ষ প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের কাছ থেকে একটি ফোন কল পেয়েছেন। মন্ত্রীরা সংলাপ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের কাঠামো সব পক্ষের বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা বন্ধ করবে ইরান : ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর হামলা স্থগিত করার পর তেহরান বলেছে, তারা উপসাগরীয় দেশগুলো এবং এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের ওপর হামলা বন্ধ করবে। এএফপিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, ‘আমাদের কৌশল মূলত প্রতিশোধমূলক ছিল, আমরা আমাদের প্রতিশোধমূলক অভিযানও স্থগিত করেছি।’
রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তেহরানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর কোনো হামলা হয়নি, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও দৈনিক হামলার পর টানা দুই রাত ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করেনি।
১৩ দিন পর ইরানে হামলা কেন স্থগিত : টানা ১৩ দিন ধরে ইরানে হামলা চালানোর পর তা হঠাৎ স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কূটনৈতিক তৎপরতার গতি বৃদ্ধি, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মজুদে টান পড়া এবং সংঘাত ব্যাপক রূপ নেওয়ার আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের কাছে হামলার নতুন একটি পরিকল্পনা পেশ করা হলেও তিনি সামরিক বাহিনীকে নতুন করে কোনো হামলা না চালানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, হামলা আরো বিস্তৃত করা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টার মিসাইল এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। এতে করে মার্কিন সেনা, মিত্রদেশ এবং সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনী আরো বড় আক্রমণ চালাতে সক্ষম হলেও সেটি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাধীন ইন্টারসেপ্টার মিসাইলের মজুদে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালালে যুদ্ধের পরিধি বাড়বে : যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর আবারও হামলা শুরু করে, তবে এবার যুদ্ধের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানি সেনাবাহিনী। রবিবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আর্কেমিনিয়া বলেন, মার্কিনিরা যদি আবারও ইহুদিবাদীদের (ইসরায়েলের) ফাঁদে পা দেয় কিংবা তাদের নির্দেশ অনুসারে চলে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে ভৌগোলিকভাবে এই যুদ্ধের পরিসর বাড়বে। সূত্র : আল জাজিরা, অ্যক্সিওস, তাসনিম

