দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণ-নির্যাতনে নারী ও শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। পুলিশের তথ্য মতে, সামাজিকভাবে ৯ ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশু। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে দেশে এ ধরনের অপরাধমূলক ঘটনায় ৬০৩ শিশু নিহত হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে নিহত ৩৩ জনের বেশি। এই সময়ে দুই হাজার ৫৪৭ শিশু আহত হয়। শিশু নির্যাতনে মাদরাসার একাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া পুলিশের প্রতিবেদনেও প্রায় একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরেও অনেক ঘটনা গ্রাম্য সালিশ বা লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ করে না।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী-শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
অন্যথায় সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে।
পুলিশ সদর দপ্তরের চলতি বছরের পাঁচ মাসের অপরাধবিষয়ক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এসব ঘটনায় বিভিন্ন থানায় প্রায় আট হাজার মামলা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সময়ে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০ হাজার ৮৩০ নারী ও শিশু। নির্যাতনের পর ২৮৮ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। ১২১ নারী ও শিশু আহত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ওই পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৯ ধরনের অপরাধের শিকার হয়েছে ২৮ হাজার ৬৩৩ নারী-শিশু। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৪৬টি। এতে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে ৯৭ হাজার ৭৫০ জনকে।
পুলিশের তথ্য বলছে, নারী-শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় করা বেশির ভাগ মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এর মধ্যে শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে জড়িতদের গ্রেপ্তারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে বলা হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তৎপর রয়েছে। ধর্ষণ-নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দমনে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত ছয় মাসে এক হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে জানানো হয়। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪২। অর্থাৎ নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।
এইচআরএসএসের তথ্য মতে, গত জুন মাসে দেশে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১০৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৭৫ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। ১৯ জন নারী ও কন্যাশিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর দুই কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার। এর মধ্যে রয়েছে ৪৯ শিশু। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত চারজন, আহত চারজন এবং আত্মহত্যা দুই নারীর। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ৫৭ জন, আহত ৪৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছে ৩৬ জন নারী।
এইচআরএসএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে সারা দেশে অন্তত এক হাজার ৮৯০ শিশু নির্যাতনের শিকার। এর মধ্যে ৪৮৩ শিশু নিহত ও এক হাজার ৪০৭ শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। এসব শিশুর মধ্যে ৫৮০ জন ধর্ষণ ও ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার।
এসব ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম এসব শিশু হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের পাঁচ মাসে দেশে হত্যার ঘটনায় এক হাজার ৪৫২টি মামলা হয়েছে। এ সময় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সাত হাজার ৯১০টি মামলা হয়। এর মধ্যে জানুয়ারিতে এক হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ১৮১টি, মার্চে এক হাজার ৪৮৫টি, এপ্রিলে দুই হাজার ১১টি ও জুনে এক হাজার ৯৫২টি মামলা হয়।
আলোচিত সাম্প্রতিক ঘটনা : গত ২৫ জুন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে কওমি মাদরাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৩ জুন ময়মনসিংহের ত্রিশালে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ইমামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গত ২৪ মে রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের চান্দের চর গ্রামের মদিনাপাড়ায় আছিয়া আক্তার নামের ১০ বছরে বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। গত ১৯ মে রাজধানীর রামপুরায় ১০ বছর বয়সী এক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে বলাৎকার ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ ওঠে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, একের পর এক শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে যে শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। এ ছাড়া বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ শিশু নির্যাতনের মতো পাশবিক সহিংসতা বৃদ্ধি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র প্রকাশ করছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, দেশে ধারাবাহিকভাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার কোনো স্থান থাকতে পারে না। সম্প্রতি কক্সবাজারে মা ও মেয়েকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় আসকের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।