• ই-পেপার

কোরআন থেকে শিক্ষা

  • পর্ব-১১৯০

প্রশ্ন-উত্তর

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রশ্ন-উত্তর

হারাম কার্যক্রমে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়

প্রশ্ন : যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম হারাম বা ইসলামসিদ্ধ নয়, তাদের শেয়ার বা হালাল পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে কি?

ফারহান, নবাবগঞ্জ

উত্তর : যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মূল কার্যক্রম হারাম তাদের শেয়ার বা পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা এবং তাদের ওই হারাম কাজে সরাসরি লিপ্ত হওয়া হারাম কাজে সহায়তা করার নামান্তর। তাই তা বৈধ নয়। (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ২, জাদিদ ফিকহি মাকালাত : ১/১৫০, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ১০/৪৪)

আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচার দোয়া

আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচার দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন জাওয়ালি নিমাতিকা ওয়া তাহবিলি আফিয়াতিকা ওয়া ফুজাআতি নিকমাতিকা ওয়া জামিয়ি সাখাতিকা।

অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আপনার নিয়ামতের বিলুপ্তি, আপনার অনুকম্পার পরিবর্তন, আকস্মিক শাস্তি এবং আপনার সমস্ত ক্রোধ থেকে।

উপকার : ইবনে উমার (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর বিভিন্ন দোয়ার মধ্যে এটাও অন্যতম দোয়া। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪৫)

যে কারণে ইসলামে জাদুচর্চা নিষিদ্ধ

মুফতি আতাউর রহমান
যে কারণে ইসলামে জাদুচর্চা নিষিদ্ধ

কোরআন ও হাদিসের ভাষ্য মতে, জাদুবিদ্যার মূল উৎস শয়তান ও মন্দ জিন। তারাই মানবসমাজে জাদুবিদ্যার প্রসার ঘটিয়েছিল। জাদুকরদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আরো এই যে কিছু মানুষ কতক জিনের শরণাপন্ন হতো, ফলে তারা জিনদের অহংকার বাড়িয়ে দিত।

(সুরা : জিন, আয়াত : ৬)

আয়েশা (রা.) বলেন, লোকজন নবী (সা.) -কে জ্যোতিষদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করল (যারা তৎকালীন যুগে জাদুও চর্চা করত)। তিনি বললেন, তারা মূলত কিছুই নয়। তারা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! কখনো কখনো তারা তো এমন কিছু কথাও বলে ফেলে যা সত্য হয়। এতে নবী (সা.) বললেন, এসব কথা সত্য। জিনরা এসব কথা প্রথম শোনে, (মনে রেখে) পরে এদের দোসরদের কানে মুরগির মতো করকর ধ্বনিতে নিক্ষেপ করে দেয়। এরপর এসব জ্যোতিষী সামান্য সত্যের সঙ্গে শত মিথ্যার মিশ্রণ ঘটায়।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৫৬১)

গবেষক আলেমরা একমত যে জাদু শেখা, শেখানো এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রাখা হারাম। আল্লামা ইবনে কুদামা (রহ.) লেখেন, নিশ্চয়ই জাদু শেখা এবং তা শেখানো হারাম। এই বিষয়ে আলেমদের কোনো মতভিন্নতা নেই। (আল মুগনি : ১০/১০৬)

ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ (রহ.)-সহ বেশির ভাগ ইমামের মতে জাদুবিদ্যা চর্চা করা কুফরি। তারা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করেন। মহান আল্লাহ বলেন, সুলাইমান কুফরি করেনি, কিন্তু শয়তানগুলো কুফরি করেছে। তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিয়েছে।

(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)

 

জাদু নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ

কোরআন ও হাদিসে জাদুর ভয়াবহতা নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন

১. জাদু ধ্বংসাত্মক : রাসুলুল্লাহ (সা.) জাদু থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তোমরা ধ্বংসাত্মক বিষয় পরিহার কোরো। তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে শিরক ও জাদু।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৬৪)

২. জাদু কুফরি : মহানবী (সা.) জাদুকরের কাছে যাওয়া ও তার কথা সত্যায়ন করাকে কুফরি বলেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কোনো কোনো (জাদুকর ও) জ্যোতিষীর কাছে গেল এবং তার কথা সত্যায়ন করল, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ বিষয়গুলো অস্বীকার করল।

(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৬৩৯)

৩. জাদু মন্দ কাজে উদ্বুদ্ধ করে : জাদুবিদ্যা অর্জন করলে তা মানুষকে মন্দ কাজে উদ্বুদ্ধ করে। যেমনপবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, তাদের (হারুত-মারুত) উভয়ের কাছ থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তা শিক্ষা করত, অথচ আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া তারা কারো কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারত না। তারা যা শিক্ষা করত তা তাদের ক্ষতি সাধন করত এবং কোনো উপকারে আসত না; আর তারা নিশ্চিতভাবে জানত যে ব্যক্তি তা ক্রয় করে পরকালে তার কোনো অংশ নেই। তা কত নিকৃষ্ট, যার বিনিময়ে তারা স্বীয় আত্মাকে বিক্রি করেছে, যদি তারা জানত! (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)

৪. জাদু দণ্ডনীয় অপরাধ : ইসলামের দৃষ্টিতে জাদু দণ্ডনীয় অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জাদুকরের শাস্তি হলো তরবারির আঘাতে মৃত্যুদণ্ড। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৪৬০)

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, জাদু যদি কুফরির পর্যায়ভুক্ত হয়, তবে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আর কুফরির চেয়ে নিম্নতর হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না।

(সুনানে তিরমিজি)

৫. জাদু আমল নষ্ট করে : জাদুর সঙ্গে সম্পৃক্ত আমল নিষ্ফল করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি গণকের কাছে যাবে তার ৪০ দিনের আমল গ্রহণ করা হয় না।

(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৩০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে জাদু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তখন তিনি আল্লাহর কাছে বারবার দোয়া করতেন। দোয়ার বরকতে আল্লাহ তাঁকে জাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত করেন। হাদিসে এসেছে, একটি কূপ থেকে একটি সুতা বের করা হয়, যাতে ১১টি গিঁট ছিল। জিবরাইল (আ.) সুরা নাস ও ফালাকের ১১টি আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং ১১টি গিঁট খোলেন। ফলে তিনি জাদুমুক্ত হন। (সহিহ বুখারি ও নাসায়ি)

আল্লাহ সবাইকে জাদুচর্চা থেকে দূরে রাখুন এবং জাদুকরের ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

হালাল উপায়ে সম্পদের প্রবৃদ্ধি নিন্দনীয় নয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
হালাল উপায়ে সম্পদের প্রবৃদ্ধি নিন্দনীয় নয়

মানুষ পৃথিবীতে খালি হাতে এসেছে, খালি হাতেই চলে যাবে’—এ কথা এক দৃষ্টিকোণ থেকে সত্য। কিন্তু এই সত্যকে অজুহাত বানিয়ে কর্মবিমুখ হয়ে যাওয়া বা হালাল উপার্জন ছেড়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং পবিত্র কোরআন-হাদিসে মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি হালাল রিজিক অন্বেষণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। কারণ হালাল উপার্জনও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, যা অসংখ্য ফরজ ও নফল ইবাদতের ভিত্তি।

ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সঙ্গে হালাল রিজিকের একটি শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে রাসুলরা, তোমরা পবিত্র ও ভালো বস্তু থেকে খাও এবং সৎকর্ম করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আমি সম্যক জ্ঞাত। (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৫১)

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) প্রিয় সাহাবিদের হালাল রিজিকের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দৃষ্টান্ত হিসেবে এক ব্যক্তির অবস্থা উল্লেখ করে বলেন যে এ ব্যক্তি দূর-দূরান্তের সফর করছে, তার মাথার চুল এলোমেলো, শরীর ধুলাবালিতে মাখা। এ অবস্থায় ওই ব্যক্তি দুই হাত আকাশের দিকে উঠিয়ে কাতর কণ্ঠে বলে ডাকছে, হে রব! হে রব! কিন্তু তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পরনের পোশাক হারাম। আর এ হারামই সে ভক্ষণ করে থাকে। তাই এমন ব্যক্তির দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে? 

(মুসলিম, হাদিস : ২২৩৬)

তাই মহান আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি হালাল রিজিকের অন্বেষণ করাও মুমিনের জন্য আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। (সুরা : জুমা, আয়াত : ১০)

এ আয়াতে নামাজের পর জীবিকা অর্জনের জন্য বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইবাদত ও কর্ম, দুটিই একজন মুমিনের জীবনের অংশ। দুটির মধ্যেই সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান করো। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো। আর জমিনে ফ্যাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদকারীদের ভালোবাসেন না। (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

এ আয়াতেও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এখানে আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বৈধ দুনিয়াবি প্রয়োজনকেও অস্বীকার করা হয়নি। তাই নিজে কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে থাকা বা কেউ কর্মঠ হতে গেলে তাকে ধর্মের দোহাই দিয়ে কর্মবিমুখ ও পরনির্ভরশীল করে রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। হালাল রিজিকের অনুসন্ধানে যেকোনো হালাল পেশা অবলম্বনের গুরুত্ব দিতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। (বুখারি, হাদিস : ২০৭২)

যদি সম্পদ অর্জন নিন্দনীয় হতো, তবে ইসলাম জাকাত, সদকা, কোরবানি, হজ, আত্মীয়-স্বজনের ভরণপোষণ, এতিম-দরিদ্রের সহায়তা, মসজিদ নির্মাণ, ওয়াকফএসব আর্থিক ইবাদতের বিধান দিত না। এই প্রতিটি ইবাদত পালন করার জন্য হালাল সম্পদ থাকা আবশ্যক। তাই ইবাদত-বন্দেগি ঠিক রাখার পাশাপাশি হালাল পন্থায় উপাজির্ত সম্পদকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম বললে ভুল হবে না।

এটা ঠিক যাতে সম্পদের লোভ করা নিষেধ। কিন্তু ইবাদত-বন্দেগি ঠিক রেখে কেউ যদি দ্বিন, পরিবার ও মানবসেবার উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে সম্পদের সমৃদ্ধির দোয়া করে, তবে তা নিন্দনীয় নয়; বরং প্রশংসনীয়।

পবিত্র কোরআনে মুমিনদের দোয়া শেখানো হয়েছে, আর তাদের মধ্যে এমনও আছে, যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন। আর আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন। 

(সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২০১) 

তাফসিরবিদদের মতে, দুনিয়ার কল্যাণ-এর মধ্যে হালাল রিজিক, প্রশস্ত জীবিকা, উপকারী সম্পদ, সুস্থতা ও নিরাপত্তাসবই অন্তর্ভুক্ত।

মহানবী (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে হেদায়াত, নিরাপত্তা ও ঐশ্বর্য প্রার্থনা করছি। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৬৭৯)

তবে ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ যেমন সফলতার মাপকাঠি নয়; আবার দারিদ্র্যও কোনো গৌরবের বিষয় নয়। প্রকৃত সফলতা হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা ও আখিরাতের পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া। যা করতে গেলে কিছু ক্ষেত্রে হালাল সম্পদেরও প্রয়োজন হয়।