‘মানুষ পৃথিবীতে খালি হাতে এসেছে, খালি হাতেই চলে যাবে’—এ কথা এক দৃষ্টিকোণ থেকে সত্য। কিন্তু এই সত্যকে অজুহাত বানিয়ে কর্মবিমুখ হয়ে যাওয়া বা হালাল উপার্জন ছেড়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং পবিত্র কোরআন-হাদিসে মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি হালাল রিজিক অন্বেষণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। কারণ হালাল উপার্জনও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, যা অসংখ্য ফরজ ও নফল ইবাদতের ভিত্তি।
ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সঙ্গে হালাল রিজিকের একটি শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে রাসুলরা, তোমরা পবিত্র ও ভালো বস্তু থেকে খাও এবং সৎকর্ম করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আমি সম্যক জ্ঞাত।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৫১)
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) প্রিয় সাহাবিদের হালাল রিজিকের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দৃষ্টান্ত হিসেবে এক ব্যক্তির অবস্থা উল্লেখ করে বলেন যে এ ব্যক্তি দূর-দূরান্তের সফর করছে, তার মাথার চুল এলোমেলো, শরীর ধুলাবালিতে মাখা। এ অবস্থায় ওই ব্যক্তি দুই হাত আকাশের দিকে উঠিয়ে কাতর কণ্ঠে বলে ডাকছে, হে রব! হে রব! কিন্তু তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পরনের পোশাক হারাম। আর এ হারামই সে ভক্ষণ করে থাকে। তাই এমন ব্যক্তির দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে?
(মুসলিম, হাদিস : ২২৩৬)
তাই মহান আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি হালাল রিজিকের অন্বেষণ করাও মুমিনের জন্য আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ১০)
এ আয়াতে নামাজের পর জীবিকা অর্জনের জন্য বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইবাদত ও কর্ম, দুটিই একজন মুমিনের জীবনের অংশ। দুটির মধ্যেই সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান করো। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো। আর জমিনে ফ্যাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)
এ আয়াতেও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এখানে আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বৈধ দুনিয়াবি প্রয়োজনকেও অস্বীকার করা হয়নি। তাই নিজে কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে থাকা বা কেউ কর্মঠ হতে গেলে তাকে ধর্মের দোহাই দিয়ে কর্মবিমুখ ও পরনির্ভরশীল করে রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। হালাল রিজিকের অনুসন্ধানে যেকোনো হালাল পেশা অবলম্বনের গুরুত্ব দিতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২০৭২)
যদি সম্পদ অর্জন নিন্দনীয় হতো, তবে ইসলাম জাকাত, সদকা, কোরবানি, হজ, আত্মীয়-স্বজনের ভরণপোষণ, এতিম-দরিদ্রের সহায়তা, মসজিদ নির্মাণ, ওয়াকফ—এসব আর্থিক ইবাদতের বিধান দিত না। এই প্রতিটি ইবাদত পালন করার জন্য হালাল সম্পদ থাকা আবশ্যক। তাই ইবাদত-বন্দেগি ঠিক রাখার পাশাপাশি হালাল পন্থায় উপাজির্ত সম্পদকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম বললে ভুল হবে না।
এটা ঠিক যাতে সম্পদের লোভ করা নিষেধ। কিন্তু ইবাদত-বন্দেগি ঠিক রেখে কেউ যদি দ্বিন, পরিবার ও মানবসেবার উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে সম্পদের সমৃদ্ধির দোয়া করে, তবে তা নিন্দনীয় নয়; বরং প্রশংসনীয়।
পবিত্র কোরআনে মুমিনদের দোয়া শেখানো হয়েছে, ‘আর তাদের মধ্যে এমনও আছে, যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন। আর আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।’
(সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২০১)
তাফসিরবিদদের মতে, ‘দুনিয়ার কল্যাণ’-এর মধ্যে হালাল রিজিক, প্রশস্ত জীবিকা, উপকারী সম্পদ, সুস্থতা ও নিরাপত্তা—সবই অন্তর্ভুক্ত।
মহানবী (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে হেদায়াত, নিরাপত্তা ও ঐশ্বর্য প্রার্থনা করছি।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৬৭৯)
তবে ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ যেমন সফলতার মাপকাঠি নয়; আবার দারিদ্র্যও কোনো গৌরবের বিষয় নয়। প্রকৃত সফলতা হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা ও আখিরাতের পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া। যা করতে গেলে কিছু ক্ষেত্রে হালাল সম্পদেরও প্রয়োজন হয়।