• ই-পেপার

প্রাথমিক যুগের বিখ্যাত তাফসির শিক্ষা কেন্দ্র

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৮১

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

 আর তিনি মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী, যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে তাদের শাস্তি দেবেন। অমঙ্গল চক্র তাদের জন্য, আল্লাহ তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন এবং তাদের অভিশাপ করেছেন। তিনি তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন, তা কত নিকৃষ্ট আবাস! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীগুলো আল্লাহরই এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৬-৭)

আয়াতগুলোতে মুশরিক ও মুনাফিকদের পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১.    হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মুনাফিকরা খুশি হয়েছিল। তারা এটাকে মুসলমানের পরাজয় ও দুর্দিনের সূচনা মনে করেছিল।

২.    মুনাফিকদের সবচেয়ে বড় মন্দ ধারণা ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা আর কখনো মদিনায় ফিরতে পারবে না। মুশরিকদের হাতে মুসলিম বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে।

৩.    দুনিয়ায় মুশরিক ও মুনাফিকদের শাস্তি হলো বন্দিত্ব ও মৃত্যুদণ্ড এবং পরকালে তাদের শাস্তি হলো জাহান্নাম।

৪.    কারো মতে, আয়াতে বর্ণিত অমঙ্গল চক্র দ্বারা উদ্দেশ্য ধারাবাহিক পরাজয় ও মন্দ পরিণতি।

৫.    আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর বাহিনী দ্বারা আসমানে ফেরেশতা ও জমিনে মুমিনরা উদ্দেশ্য। (তাফসিরে কুরতুবি : ১৯/৩০২)

দুর্যোগকাল

গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো নিষেধ

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো নিষেধ

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য যেকোনো দুর্যোগের সময় ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি মানুষের সবচেয়ে বড় করণীয় হলো সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা, পারস্পরিক সহযোগিতা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে মানসিকভাবে স্থির থেকে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এমন সংকটের সময়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরনো ছবি, ভিন্ন দেশের ভিডিও বা মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বন্যা নিয়েও এমন কিছু বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বন্যার নয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণা করা অনৈতিকই কাজ। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে দেশে ও প্রবাসে থাকা মানুষের বিভিন্ন ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ আবার অতি দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে যাওয়াও স্বাভাবিক বিষয়। পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মুমিনের বিশেষ কিছু করণীয় রয়েছে, নিম্নে সে রকম করণীয় তুলে ধরা হলো

যাচাই ছাড়া কোনো খবর প্রচার না করা : দুর্যোগকালে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বহু ধরনের হৃদয়স্পর্শী ছবি ছড়িয়ে পড়ে; এগুলোর তথ্যসূত্রের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে বিশ্বাস করা বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে ঈমানদাররা, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো জাতিকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।

(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

এই আয়াতের নির্দেশনা শুধু সংবাদমাধ্যমের জন্য নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট শেয়ারকারী প্রত্যেক মুসলমানের জন্যও প্রযোজ্য। যাচাই-বাছাই ছাড়া যেকোনো সংবাদ প্রচার ও শেয়ার ব্যক্তিকে মানুষের সামনে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করতে পারে। রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়। (মুসলিম, হাদিস : ৭)

তাই কোনো আতঙ্কের সংবাদ এলেই তা শেয়ার করার জন্য হুমড়ি না খেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তা যাচাইয়ের চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ থাকলে, তার থেকে প্রকৃত তথ্য জানার চেষ্টা করা যেতে পারে। যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে তথ্যটি পাঠানো যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয়র ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, যখন তাদের নিকট নিরাপত্তার কিংবা ভয়ের কোনো সংবাদ আসে তখন তারা তা রটিয়ে দেয়। যদি তারা তা রাসুলের কিংবা তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্য থেকে তথ্যানুসন্ধানীরা প্রকৃত তথ্য জেনে নিত। যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর দয়া ও করুণা না থাকত, তবে তোমাদের অল্পসংখ্যক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ করত।

(সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৩)

আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করা : ইচ্ছাকৃতভাবে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ও বিভ্রান্তি ছড়ানো ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ কাজ। এগুলো মূলত মুনাফিকদের স্বভাব ছিল। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, যদি মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা ও শহরে মিথ্যা সংবাদ প্রচারকারীরা বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে ক্ষমতাবান করে দেব।

(সুরা : আহজাব, আয়াত : ৬০)

কারো কারো মনে হতে পারে, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ত্রাণ সংগ্রহ বা সচেতনতা তৈরির জন্য অতিরঞ্জিত বা ভুয়া ছবি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, ইসলামে এ ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ মিথ্যা কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং বিভ্রান্তি বাড়ায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা মিথ্যাচার বর্জন করো। কেননা মিথ্যা পাপাচারের দিকে ধাবিত করে এবং পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়।

(আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৮৯)

অতএব, সংকটের সময়ে একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো গুজব ও আতঙ্ক না ছড়িয়ে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করা। তথ্য শেয়ার করার আগে নিশ্চিতভাবে যাচাই করা। মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো সুযোগ থাকলে তা দেওয়া, অন্যথায় চুপ থাকা। সাধ্যমতো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা, সামর্থ্য না থাকলে কমপক্ষে তাদের জন্য দোয়া করা।

যুদ্ধের ভয়াবহতা

‘আমরা সুদানের হারানো প্রজন্ম’

আবরার আবদুল্লাহ
‘আমরা সুদানের হারানো প্রজন্ম’

আল ফাশের শহর অবরোধ করার পর পিতা নিহত ফলে সুদান ছেড়ে পালিয়ে যান ইসলাম ইবরাহিম। তখন তাঁর মনে হয়েছিল তিনি যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেয়েছেন। ২০ বছর বয়সী (নারী) ইসলাম ফার্মাসির শিক্ষার্থী। তিনি তাঁর মা ও ছয় বোনকে নিয়ে প্রতিবেশী দেশ মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে (সিএআরে) পালিয়ে আসেন। ফলে তাঁর লেখাপড়াও অসম্পন্ন থেকে যায়। তিনি এখন করসি শরণার্থীশিবিরে বসবাস করেন এবং সুদান থেকে সদ্য পালিয়ে আসা নারী ও কন্যাশিশুদের সাহায্য করেন। একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তিনি তাদের সাহায্য করেন। তিনি বলেন, বাড়ি থেকে পালিয়ে এলেও তিনি মানসিক যন্ত্রণা ও চাপ মুক্ত হতে পারছেন না।

ইসলাম ইবরাহিমের চাচারা শরণার্থীশিবিরে এসে তাদের সুদানে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন। যেন তাঁর মা মরহুম বাবার সম্পত্তির বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করতে পারেন। কিন্তু ইসলাম দেশে ফিরতে চান শুধু তাঁর লেখাপড়া সম্পন্ন করতে; বাবার উত্তরাধিকার লাভের জন্য নয়। ইসলামের ঘটনার ভেতর সুদানের পুরো একটি প্রজন্মের আকুতি প্রতিধ্বনিত হয়, যারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত এবং তা উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরা গত কিছু দিনে করসি শরণার্থীশিবিরের ৩০ জনের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে। তারা সংঘাতের কারণে নিজেদের থমকে যাওয়া জীবনের কথা বলেছে। সংঘাতের কারণে তাদের পরিবার উদ্বাস্তু হয়েছে, স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে এবং জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার ভেতর ফেলে দিয়েছে। তাদের অনেকের শঙ্কা তারা হয়তো কখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারবে না। তাদের বেশির ভাগের বয়স বিশের কোটায় এবং তারা দারফুরের সীমান্তবর্তী আমদাফোকের বাসিন্দা। প্রথম তাদের অনেকেই ভেবেছিল তারা হয়তো কিছুদিনের ভেতর বাড়ি ফিরতে পারবে, কিন্তু দিন দিন তাদের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তাদের এই অভিজ্ঞতা যুদ্ধের কারণে সুদানের শিক্ষা খাতে তৈরি হওয়া বৈষম্যও তুলে ধরে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ন্ত্রিত দারফুর ও অন্যান্য অঞ্চলের লাখ লাখ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারছে না। তিন বছরের বেশি সময় তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত কোনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বিপরীতে সেনাবাহিনী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরদারের অধীনে থাকা এলাকায় শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ে ফিরছে এবং তারা পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর সহায়তায় কয়েক ডজন সুদানি শরণার্থী বাঙ্গুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। দীর্ঘদিন শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর তাদের জন্য আবার পড়াশোনায় ফিরে আসার আশা তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরা তাদের জন্য মোটেও সহজ নয়। আরবি মাধ্যমে স্কুলজীবন শেষ করা এসব শিক্ষার্থীকে এখন ফরাসি ভাষায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন সম্পূর্ণ নতুন একটি ভাষা শিখতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার চাপও সামলাতে হচ্ছে। তাদের অনেকেই বলছেন, ভাষা শেখার জন্য অতিরিক্ত সময়, আর্থিক সংকট এবং বাস্তুচ্যুত জীবনের মানসিক চাপসব মিলিয়ে মনে হচ্ছে জীবনের এমন কিছু মূল্যবান বছর হারিয়ে যাচ্ছে, যা আর কখনোই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

তাঁদেরই একজন বাদেরেলদ্দিয়ান ইসা জানান, তাঁর পরিবার সুদান ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, কারণ তাঁর বাবা আমদাফোকের একজন ইমাম ছিলেন। মসজিদের খুতবায় র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) সমালোচনা করায় তাঁরা ওই বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হন। বাদেরেলদ্দিয়ান বলেন, তাঁর বাবার ধর্মীয় অবস্থান পুরো পরিবারকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল।

করসি শরণার্থীশিবিরজুড়ে এই হারানোর অনুভূতি বিভিন্নভাবে সবার জীবনকে স্পর্শ করেছে। যে শিক্ষার্থীরা একসময় ফার্মাসিস্ট, বিচারক, প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তাঁরা এখন নির্বাসিত জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছেন। নতুন ভাষা শিখছেন, অপরিচিত শিক্ষাব্যবস্থায় আবার পড়াশোনা শুরু করার চেষ্টা করছেন এবং একই সঙ্গে সুদানে আটকে থাকা স্বজনদের নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। এই তরুণ সুদানিদের কাছে শিক্ষা এখন শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একই সঙ্গে আশ্রয় এবং প্রতিরোধের প্রতীক। যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনের ভাঙা টুকরাগুলো আবার নতুন করে জোড়া লাগানোর এক নাজুক কিন্তু দৃঢ় প্রচেষ্টা। চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে তাঁদের একজন আহমেদ বলেন, আমরাই সুদানের হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম। এই যুদ্ধে আমরা সবকিছু হারিয়েছি।           আলজাজিরা অবলম্বনে

তাফসির চর্চায় সাহাবিদের নীতি ও পদ্ধতি

আতাউর রহমান খসরু
তাফসির চর্চায় সাহাবিদের নীতি ও পদ্ধতি

মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর কোরআন নাজিল করেন এবং তাঁকে কোরআনের মর্ম প্রচার ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব দেন। ফলে নবীজি (সা.)-এর যুগেই শুরু হয়েছিল তাফসিরশাস্ত্রের চর্চা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, তোমার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা করে। (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৪)

উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয়, মানুষকে কোরআনের ব্যাখ্যা শেখানো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নববী দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-ও তাঁর শিক্ষা ও সান্নিধ্যে কোরআনের শ্রেষ্ঠতম ধারক, বাহক ও ব্যাখ্যাকারে পরিণত হন। প্রকৃত পক্ষে তাঁরাই কোরআন সবচেয়ে উত্তমরূপে অনুধাবন করেছিলেন এবং তার ওপর যথাযথভাবে আমল করেছিলেন।

 

তাফসির চর্চায় সাহাবিদের পদ্ধতি

পবিত্র কোরআন ও তাফসির শাস্ত্রের পঠন-পাঠনে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর পদ্ধতি ছিল নিম্নরূপ :

১. শেখা ও আমল করা : সাহাবিদের তাফসির চর্চার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁরা যখন কোনো আয়াত পাঠ করতেন, তখন তার মর্ম ও ব্যাখ্যা জানতেন এবং তাঁর ওপর আমল করতেন। অর্থাৎ উপলব্ধ অর্থ ও বিধান আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমাদের ভেতর যখন কেউ কোরআনের ১০টি আয়াত শিখত, তখন সে তাঁর অর্থ জানা এবং তার ওপর আমল করার আগে সামনে অগ্রসর হতো না।

(শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৮০১)

২. পড়ে পড়ে ব্যাখ্যা করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা কোরআন পড়ে পড়ে তার ব্যাখ্যা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, যখন তাঁর কাছে তাঁর ভাইয়েরা একত্র হতেন। তাঁরা কোরআন খুলে তা পাঠ করতেন এবং তিনি তার ব্যাখ্যা করতেন।

(ফাদায়িলুল কোরআন, পৃষ্ঠা-১০২)

৩. প্রশ্ন করে শিক্ষা দেওয়া : সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ভেতর যাঁরা তাফসির শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন, তাঁরা অন্যদের প্রশ্ন করতেন। যদি তারা সঠিক উত্তর দিত, তবে তিনি তাদের সমর্থন করতেন এবং জ্ঞানের প্রশংসা করতেন। আর ভুল করলে তিনি তাদের সংশোধন করে দিতেন। যেমন আবু বকর (রা.) জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা আল্লাহর বাণী নিশ্চয়ই যারা বলে, আল্লাহ আমাদের প্রভু, অতঃপর তাতে অবিচল থাকে-এর ব্যাপারে কী বলো? তারা বলে, এর ব্যাখ্যা হলো আল্লাহ আমাদের প্রভু, অতঃপর তারা পাপ থেকে বেঁচে থাকে। আবু বকর (রা.) বললেন, তোমরা আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছ। এর ব্যাখ্যা হলো, তারা বলে, আল্লাহ আমাদের প্রভু। অতঃপর তারা অবিচল থাকে। ফলে তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না।

(তাফসির ইবনে কাসির : ৬/১৭৩)

৪. পারস্পরিক আলোচনা : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যখন একত্র হতেন পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে কোরআন ও তার ব্যাখ্যা শিখতেন। ঠিক যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরগুলোর কোনো একটি ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সঙ্গে মিলে (কোরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে, তখন তাদের ওপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতারা তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা যখন একত্রে বসে ফিকহ নিয়ে আলোচনা করতেন, তখন তাঁরা একজন কোরআনের সুরা পাঠ করার আদেশ করতেন। (তাবাকাতে ইবনে সাআদ : ২/২৮৫)

৫. প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা সংশোধন করে : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যা সংশোধন করেও মানুষকে কোরআনের ব্যাখ্যা শেখাতেন। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ভাষণ দেন। তিনি বলেন, হে মানুষ তোমরা এই (সুরা মায়িদার ১০৫ নম্বর)  আয়াত পাঠক করো এবং এর ভুল অর্থ গ্রহণ করে থাকো। আয়াতটি হলো : হে মুমিনরা! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই ওপর। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই মানুষ যখন নিজেদের ভেতর মন্দ কাজ হতে দেখে অথচ সে তা প্রতিহত করে না। আশঙ্কা আছে, আল্লাহ তাদের সবাইকে এই পাপের শাস্তি দেবেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩৩৮)

৬. জনসমাগমের আলোচনার মাধ্যমে : সাহাবিদের অনেকে জনসমাগমের স্থানে উপস্থিত হয়ে কোরআনের তাফসির করতেন। আবু ওয়ায়েল (রহ.) বলেন, আমি ও আমার এক সঙ্গী হজ করি। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-ও হজে ছিলেন। তিনি সুরা নুর পাঠ করে তা ব্যাখ্যা করেন। আমার সঙ্গী বলেন, সুবহানাল্লাহ! এই ব্যক্তির মাথা থেকে কি বের হচ্ছে? যদি তুর্কিরা এটা শুনত তবে তারা ইসলাম গ্রহণ করত। (ফাদায়িলুস সাহাবা, ইমাম আহমদ, হাদিস : ১৯৩৪)

৭. প্রশ্নের উত্তরে ব্যাখ্যা : সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর কাছে সাধারণ মানুষ কোরআনের আয়াত বা অর্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার উত্তর দিতেন। যেমন আতা ইবনে রাবাহ (রহ.) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মজলিসের চেয়ে উত্তম কোনো মজলিস দেখিনি। তাঁর কাছে কোরআনের শিক্ষার্থীরা এসে প্রশ্ন করত, ইলমের অধিকারীরা এসে প্রশ্ন করত, কবিতার শিক্ষার্থীরা এসে প্রশ্ন করত। (ফাদায়িলুস সাহাবা, ইমাম আহমদ, হাদিস : ১৯২৯)

 

সাহাবিদের তাফসিরের বৈশিষ্ট্য

ড. মুহসিন আবদুল হামিদ সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর তাফসিরের পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। তা হলো

১. বিরোধশূন্য : সাহাবিদের তাফসিরে বৈপরীত্য ও মৌলিক বিষয়ে বিরোধ পাওয়া যায় না, তবে আনুষঙ্গিক বিষয়ে তাদের অনেক মতভিন্নতা পাওয়া যায়।

২. স্বল্প বাক্য, বিস্তৃত মর্ম : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কোরআনের ব্যাখ্যায় দীর্ঘ আলোচনা পরিহার করতেন। এ বিষয়ে তাঁদের শব্দ-বাক্য হতো সীমিত এবং মর্ম হতো অত্যন্ত বিস্তৃত।

৩. নসনির্ভর : সাহাবিরা নস তথা কোরআন ও সুন্নাহ নির্ভর তাফসির করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের সঙ্গে তাঁদের যুগের বৈশিষ্ট্যগত মিল থাকায় তাঁদের ইজতিহাদের খুব বেশি প্রয়োজন হতো না। কোনো বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহের বক্তব্য পাওয়া না গেলে তাঁরা ইজতিহাদ করতেন।

৪. অপূর্ণাঙ্গ তাফসির : সাহাবায়ে কেরাম (রা.) প্রয়োজন ও মানুষের প্রশ্নের আলোকেই বেশি তাফসির করতেন। তাই তাঁদের যুগে পূর্ণাঙ্গ ও ধারাবাহিক তাফসির পাওয়া যায় না।

৫. ত্রুটিমুক্ত : সাহাবিরা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে কোরআন শিখেছেন, তাঁরা ছিলেন নবীজি (সা.)-এর হাতে গড়া সোনার মানুষ। তাই তাঁদের তাফসির ছিল ভুলত্রুটি, বিকৃতি ও বিদআতমুক্ত। (তাতাওউরুল তাফসিরিল কোরআনিল কারিম কিরাআতান জাদিদাতান, পৃষ্ঠা-৩৮)

 

সাহাবিদের তাফসিরের বিধান

সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কর্তৃক বর্ণিত তাফসিরের ব্যাপারে ফকিহ আলেমদের বক্তব্য নিম্নরূপ :

১. ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিমসহ বেশির ভাগ আলেমের মত হলো, সাহাবিদের বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত ও তাদের থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত তাফসিরের বিধান হলো তা মুসনাদ ও মারফু হাদিসের অনুরূপ। অর্থাৎ তা গ্রহণযোগ্য ও আমলকে আবশ্যক করে।

২. যে তাফসির সাহাবিরা মুসনাদ পদ্ধতি তথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সূত্রে অথবা তাঁর থেকে মারফু পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন সর্বসম্মতিক্রমে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব এবং তা প্রত্যাখ্যান করা নাজায়েজ।

৩. তাদের থেকে যে তাফসির মাওকুফ পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়েছে, তাতে যদি কিয়াসের (বুদ্ধিবৃত্তির) অবকাশ না থাকে তবে তা মারফু হাদিসের বিধানভুক্ত, অর্থাৎ তার ওপর আমল আবশ্যক। আর যদি তাতে কিয়াসের অবকাশ থাকে তবে তা মাওকুফ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে, এমন তাফসিরের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে।

৪. সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যে তাফসিরের ব্যাপারে একমত হয়েছেন তা অকাট্য এবং তার ওপর আমল করা আবশ্যক।

৫. কোনো আয়াতের ব্যাপারে সাহাবিদের থেকে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলে, মুজতাহিদ আলেমরা যেকোনো একটির ওপর আমল করতে পারবে। কিন্তু তারা নতুন কোনো মত উদ্ভাবন করতে পারবেন না। (আল মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন : ২/২৮৩; মাবাহিসুন ফি উলুমিল কোরআন, পৃষ্ঠা-৩৪৫; আল বোরহান ফি উলুমিল কোরআন : ২/১৮৩)

 

শ্রেষ্ঠত্বের কারণ

সাহাবায়ে কেরাম পবিত্র কোরআনের যে তাফসির করেছেন, তা পৃথিবীর যেকোনো তাফসিরের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। কেননা

১. তাঁরা ওহি নাজিল হতে দেখেছেন এবং ওহি নাজিলের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।

২. তাঁরা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে কোরআনের অর্থ ও মর্ম শিখেছেন।

৩. তাকওয়া, দ্বিনদারি ও বিশ্বস্ততার বিচারে তাঁরাই সবচেয়ে অগ্রগামী ছিলেন।

৪. কোরআনের একাধিক আয়াতে তাঁদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং তাঁদেরকে আল্লাহ ক্ষমা ও সন্তুষ্টি দানের ঘোষণা দিয়েছেন।

৫. রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের খাইরিয়্যাত (উত্তম হওয়ার) সাক্ষ্য দিয়েছেন। (প্রবন্ধ : আত-তাফসির ফি আসরিস সাহাবাতি)

আল্লাহ সবাইকে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।