দেশে কীটনাশকের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কীটনাশকের প্রভাবে দূষণ বাড়ছে। উপকারী কীটপতঙ্গ, অণুজীব, মাছসহ জলজ প্রাণী কমছে। দীর্ঘ মেয়াদে তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে। আবার ফলমূল ও শাক-সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং কীটনাশকের প্রভাব কাটার আগেই বাজারজাত করায় তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে। দেশে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবের যোগসূত্র থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর ব্যবহার রোধে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।
ফলমূল বা শাক-সবজিতে কীটনাশক ব্যবহারের পর তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। একেক ধরনের কীটনাশকের ক্ষেত্রে এই সময় একেক রকম। সে জন্য ফল বা সবজি তোলার বা বাজারজাত করার আগে আগে কীটনাশক ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু আমাদের কৃষকদের সেই জ্ঞান সীমিত। এমনও দেখা যায়, সকালে কীটনাশক ছিটানোর পর বিকেলে সবজি বাজারজাত করা হয়। আবার গণমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে যে বেগুন বাজারজাত করার আগে ড্রামে রাখা কীটনাশক মেশানো পানিতে চুবিয়ে নেওয়া হয়, যাতে পোকামাকড়ের কারণে বেগুন নষ্ট না হয়। কীটনাশকের এ ধরনের অপব্যবহার রোধ করা অত্যন্ত জরুরি।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। জানা যায়, ১৯৭২ সালে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল মাত্র চার হাজার মেট্রিক টন। পাঁচ দশকের ব্যবধানে সেই পরিমাণ প্রায় ১০ গুণ বেড়ে ৪০ হাজার টন ছাড়িয়েছে। ধান, শাক-সবজি, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে বর্তমানে ব্যাপকভাবে কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, গত পাঁচ বছরেই দেশে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৮১.৫ শতাংশ।
মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, অনেক কৃষক সুপারিশ করা মাত্রা ও সময়সীমা না মেনে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছেন। এতে ফসলে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে উপকারী পোকামাকড় ও মাটির অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব রাসায়নিক জলাশয়ে গিয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্যও হুমকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে আসা সবজি সংগ্রহের সময় ২০ থেকে ৩০ শতাংশে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তালতলা ও যাত্রাবাড়ী বাজার থেকে সংগ্রহ করা বেগুন ও ফুলকপির নমুনায় উচ্চ মাত্রায় ক্ষতিকর অর্গানোফসফরাস কীটনাশকের উপস্থিতি রয়েছে। ২১টি নমুনার ২০টিতেই কীটনাশকের মাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্ধারিত সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমা অতিক্রম করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে কীটনাশকের ব্যবস্থাপনা সংস্কারে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। কঠোর করা হচ্ছে নতুন বালাইনাশকের নিবন্ধন, অনুমোদন ও আমদানি নীতিমালা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের কাঁচামাল আমদানিতে কড়াকড়ি, ল্যাব পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিষয়ে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। মাঠ পর্যায়ে কীটনাশকের ব্যবহার কার্যকরভাবে মনিটর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিলারদের জবাবদিহি বৃদ্ধি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

