বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে বালক পড়েছে ভুল বই পড়েনি ব্যাকরণ, পড়েনি মূল বই - রফিক আজাদ ভুল জলে নেমে পড়া ভুল বালকের জন্য কি এক মর্মছেঁড়া হাহাকার নেমে আসে বুকজুড়ে। ব্যাকরণ পড়াই হলো না, মূল বইও। তবু ভুল বই ধরে ধরেই চলে গেল এতটা কাল! চলে গেল প্রিয় কবি রফিক আজাদের আরেক জন্মদিন- ১৪ ফেব্রুয়ারি। বসন্তছোঁয়া জন্মের জন্যই বুঝি তাঁর কবিতা এত বসন্ত-মাখা! ভালোবাসা তাঁর কাছে এমনই এক সঞ্জীবনী, যা পেলে তিনি শুধরে নিতে চান 'জীবনের ভুলগুলি'। কিন্তু জীবনের 'ভুল বই'গুলোই তো তাঁকে রফিক আজাদ করেছে। 'ভুল বই' থেকে পাঠ নিয়ে নিয়ে তিনি বলেছেন, 'ভালোবাসা মানে শেষ হয়ে যাওয়া কথার পরেও মুখোমুখি বসে থাকা।' প্রেম নিয়ে এ রকম উপলব্ধি তুলনারহিত। এই উপলব্ধি এতটাই চেতনপ্রবাহী, এতটাই প্রভাবসঞ্চারী যে কবিতার লাইন থেকে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে আজ প্রায় প্রবাদের মর্যাদা পেয়েছে। কবি কতটা বিস্তারী হলে এ রকম হতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ নিজেই। তিনিই প্রথম 'অপেক্ষা' ও 'প্রতীক্ষা' শব্দ দুটিকে আভিধানিক অর্থ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন। দেখিয়েছেন শব্দ দুটি কিভাবে আভিধানিকতা থেকে পৃথক হয়ে ভিন্নতর দ্যোতনা নিয়ে হাজির হয়। রফিক আজাদের হাত দিয়েই রচিত হলো অপেক্ষা আর প্রতীক্ষার ভিন্নার্থিকতা। কবি রফিক আজাদের জন্ম টাঙ্গাইলে। প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ 'অসম্ভবের পায়ে'। তারপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে 'সীমাবদ্ধ জলে', 'সীমিত সবুজে', 'চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া', 'প্রেমের কবিতা সমগ্র', 'বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে', 'বিরিশিরি পর্ব', 'শ্রেষ্ঠ কবিতা', 'কবিতা সমগ্র', 'হৃদয়ের কী বা দোষ', 'কোনো খেদ নেই' ইত্যাদি। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৮১, লেখক শিবির পুরস্কার ১৯৭৭, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮১, কবিতালাপ পুরস্কার ১৯৭৯, কবি আহসাব হাবীব পুরস্কার ১৯৯১, কবি হাসান হাফিজুর রহমান পুরস্কার ১৯৯৬, একুশে পদক ২০১৩। তিনি শুধু ভালোবাসার কথাই বলেন না। সম্মুখযোদ্ধা এই কবি ঠিকই উপলব্ধি করেন 'দেয়ালে দেয়ালে অনিবার্য অন্ধকার'। সেই অন্ধকারের স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে দেখেন বীভৎস সত্যের আচ্ছাদন। মানুষের মৌলিক উপলব্ধির গভীর জগতে তিনি চলে যান। পাঠ করেন নির্মল সত্য। এই সত্য তাঁকে বলতে বাধ্য করে 'ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো'। এ রকম আগ্রাসী মনোভাবের মাধ্যমেই তিনি ইঙ্গিত করেন মানুষের প্রকৃত মৌলিক স্বাধীনতার কথা। ভৌগোলিক স্বাধীনতাই একমাত্র মুক্তির মাধ্যম নয়। অর্থনৈতিক মুক্তি এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাঁর আরেক কালজয়ী কবিতা 'চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া'। ১৫ আগস্টের মর্মন্তুদ ঘটনা তাঁকে খুব তাড়িয়ে ফিরছিল। তিনি স্বস্তি পাচ্ছিলেন না একটুও। তখন রাজধানী থেকে বের হয়ে তিনি চলে যান চুনিয়া গ্রামে। তারপর লেখেন কবিতাটি। কত দিন আগে লেখা, কিন্তু আজও কী সমসাময়িক। অভিবাদন প্রিয় কবিকে।