প্রচলিত ধারণা, হৃদরোগ শুধু বুড়োদের হয়। ছোটদেরও হৃদরোগ হতে পারে, এটি অনেকের অজানা। তাই শিশুদের হৃদরোগ দেখা দিলে এর উপসর্গ কেমন হয়, সেটি অনেকেই জানেন না। বুড়োদের হৃদরোগের উপসর্গ ছোটদের চেয়ে একেবারেই আলাদা। বুক ব্যথার মতো উপসর্গ সাধারণত শিশুদের বেলায় দেখা যায় না। হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুরা ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে, সব সময় থাকে ক্লান্ত ও দুর্বল। এসব উপসর্গ দেখে অভিভাবকরা ধরে নেন, শিশুটি জন্মগতভাবেই দুর্বল বা রোগা। উপসর্গগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করায় চিকিৎসকের শরণাপন্নও হন না অনেকে। ফলে ধীরে ধীরে হৃদরোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে, স্থায়ী ক্ষতির শিকার হয় শিশু। তাই সবার উচিত শিশুদের হৃদরোগের বিষয়ে জানা, এর উপসর্গ নিয়ে সচেতন থাকা।
ধরন
শিশুদের হৃদরোগ দুই ধরনের। একটি জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Disease), অন্যটি অর্জিত হৃদরোগ (Acquired Heart Disease)| হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হৃৎপিণ্ডে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মায়। অন্য শিশুদের ক্ষেত্রে হৃদরোগের কারণ হতে পারে বিভিন্ন ধরনের রোগ বা সংক্রমণের প্রভাবে।
হৃৎপিণ্ড বা রক্তনালির গঠনগত ত্রুটি থেকে হয় জন্মগত হৃদরোগ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠগুলোর মাঝখানের পর্দায় ছিদ্র, হৃদযন্ত্রের ভালেভর ত্রুটি, বড় রক্তনালি অস্বাভাবিক সরু হওয়া কিংবা রক্তনালির অস্বাভাবিক সংযোগ। অন্যদিকে অর্জিত হৃদরোগের মধ্যে রয়েছে হৃৎপিণ্ডের আবরণী, দেয়াল বা ভালেভ সংক্রমণজনিত প্রদাহ এবং বাতজ্বরজনিত হৃদরোগ। শিশুদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এ থেকেও হতে পারে হৃদরোগ।
কেন হয়
বেশ কিছু কারণে বাড়তে পারে জন্মগত হৃদরোগের ঝুঁকি। এর মধ্যে পারিবারিক ইতিহাস অন্যতম। এর পাশাপাশি যদি গর্ভবতী মায়ের রুবেলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, উচ্চমাত্রার জ্বর, ডায়াবেটিস বা মৃগীরোগ হয়, সে ক্ষেত্রে সন্তানের হৃৎপিণ্ডে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ধূমপান, মা-বাবার অধিক বয়সে সন্তান নেওয়া এবং মায়ের অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণেও শিশুর হৃদরোগ হতে পারে। পরিবারে জন্মগত হৃদরোগের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অর্জিত হৃদরোগের ক্ষেত্রে জীবাণু সংক্রমণ, বাতজ্বর, কিডনির রোগ, ভিটামিন ‘বি’র অভাব এবং মারাত্মক রক্তশূন্যতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করে। দেহের অতিরিক্ত ওজন ও কিডনি রোগ থেকেও শিশুদের হৃদরোগ হতে পারে।
লক্ষণ ও নির্ণয়
হৃদরোগ মানেই বুকে ব্যথা হবে—এমন নয়। শিশুদের হৃদরোগের উপসর্গ বড়দের চেয়ে আলাদা। রোগের ধরন অনুযায়ী শিশুর হৃদরোগের লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্ট বা শরীর নীলচে হয়ে যাওয়া, বুকের দুধ খেতে কষ্ট হওয়া, ঘন ঘন সর্দিকাশি বা নিউমোনিয়া, অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়া কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
রোগ নির্ণয়ের জন্য বুকের এক্স-রে, ইসিজি ও ইকোকার্ডিওগ্রাম করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে গর্ভাবস্থার ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহের মধ্যে ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রামের মাধ্যমে কিছু জন্মগত হৃদরোগ আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, হৃদরোগ যত আগে ধরা পড়বে, ততই চিকিৎসায় সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়বে।
প্রতিরোধ
জন্মগত হৃদরোগ প্রতিরোধে সঠিক বয়সে সন্তান নেওয়া জরুরি। পাশপাশি মায়েদের অবশ্যই রুবেলা ও অন্যান্য রোগের টিকা নিতে হবে, ক্রনিক রোগ রাখতে হবে নিয়ন্ত্রণে। মানসিক চাপ কমানো ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ সেবন করা জরুরি।
জন্মের পর শিশুকে যতটা সম্ভব রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। কোনো রোগকেই হেলাফেলা করা যাবে না, ছোট-বড় সব রোগের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বুকের দুধ পান করানো জরুরি, বয়স ছয় মাস পেরোলে এর পাশাপাশি দিতে হবে সুষম খাবার।
চিকিৎসা
সব সময় জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃৎপিণ্ডের ছোট ছিদ্র বন্ধ হয়ে যায়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমে রোগের উপসর্গ ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ক্যাথ ল্যাব পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা যায় অনেকের, তবে জটিল সমস্যার জন্য সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।
এ ধরনের আধুনিক চিকিৎসা এখন দেশেই সম্ভব। হৃদরোগের উপসর্গ দেখা দিলে তাই আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা করা হলে অনেক শিশুর হৃদরোগ পুরোপুরি সেরে যায়। দেরিতে শনাক্ত হলে স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ায় অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়, এতে শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে।
লেখক : এমবিবিএস, এফসিপিএস (পেডিয়াট্রিকস)
এমডি (পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি)
সহকারী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট
শিশুরোগ বিভাগ
ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হসপিটাল