• ই-পেপার

এআইইউবিতে আন্ত কলেজ ফুটবল টুর্নামেন্ট

বিজ্ঞান রহস্য

আকাশে উড়ে বেড়ানোর রহস্য কী

হাবিব তারেক
আকাশে উড়ে বেড়ানোর রহস্য কী

কাপড়ের ছাউনির মতো বাহনে চড়ে আকাশে ভেসে চলার দৃশ্য দেখা যায় আজকাল। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে—এটা কী? বিজ্ঞান এখানে কিভাবে কাজ করে? এই কাঠামোটির নাম প্যারাগ্লাইডার। এর মাধ্যমে দীর্ঘ সময় আকাশে ভেসে বেড়ানো যায়। এই ওড়ার পেছনে ভূমিকা রাখে বায়ুগতিবিদ্যা (এরোডায়নামিকস), বায়ুপ্রবাহ ও পদার্থবিজ্ঞান। প্যারাগ্লাইডার মূলত ইঞ্জিনবিহীন এক ধরনের হালকা ওজনের উড়োজাহাজ বা বাহন। এর কাপড়ের ছাউনি বা কাপড়ের ডানায় (ক্যানোপি) অনেকগুলো দড়ি থাকে। দড়িগুলোর এক প্রান্তে থাকে পাইলটের বসার ব্যবস্থা। উড্ডয়নের সময় বাতাস ক্যানোপির সামনের খোলা অংশ দিয়ে ঢুকে ভেতরে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে কাপড়ের ডানাটি ফুলে উঠে একটি নির্দিষ্ট বায়ুগতীয় আকৃতি ধারণ করে, যা বিমানের ডানার মতো কাজ করে। লিফট বা উত্তোলন বল কাজে লাগিয়ে প্যারাগ্লাইডার উড্ডয়ন করে। ভাসমান প্যারাগ্লাইডার সামনে এগোনোর সময় ডানার ওপর ও নিচ দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়। ডানার বিশেষ আকৃতির কারণে ওপরের দিকের বাতাস নিচের দিকের তুলনায় দ্রুত প্রবাহিত হয়। এর ফলে ওপরের অংশে বায়ুচাপ কম এবং নিচে তুলনামূলক বেশি থাকে। এই চাপের পার্থক্য ডানাকে ওপরে তোলার জন্য একটি বল সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়াটিই হলো লিফট বা উত্তোলন বল। পদার্থবিজ্ঞানে লিফটের পরিমাণ বায়ুর ঘনত্ব, গতি, ডানার ক্ষেত্রফল ও ডানার নকশার ওপর নির্ভর করে। একই সঙ্গে প্যারাগ্লাইডারে স্বভাবতই পৃথিবীর মহাকর্ষ বল কাজ করে। যখন লিফট ওজনের একটি বড় অংশকে ভারসাম্য দেয়, তখন পাইলট ধীরে ধীরে নিচে নামতে নামতে সামনের দিকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারেন। তবে শুধু লিফটের কারণেই প্যারাগ্লাইডার দীর্ঘ সময় আকাশে থাকে, ব্যাপারটা এমন নয়। এখানে ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ বা আপড্রাফট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সূর্যের তাপে ভূমির বিভিন্ন অংশ গরম থাকে। ফলে কোথাও কোথাও উষ্ণ হালকা বাতাস (থার্মাল) ওপরের দিকে উঠতে থাকে। পাইলটরা এই থার্মাল বায়ুপ্রবাহের ভেতরে চক্কর দিলে প্যারাগ্লাইডার আরো ওপরে উঠে যায়। এভাবেই তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশে থাকতে পারেন। প্যারাগ্লাইডারের দিক নিয়ন্ত্রণও বেশ বৈজ্ঞানিক। ক্যানোপির দুই পাশে ব্রেক লাইন থাকে। পাইলট যদি ডান পাশের ব্রেক টানেন, তাহলে ডান পাশের ডানার গতি কমে যায়। তখন প্যারাগ্লাইডার ডান দিকে ঘুরে যায়। একইভাবে বাঁ পাশের ব্রেক টানলে বাঁ দিকে মোড় নেয়। উভয় ব্রেক একসঙ্গে টানলে গতি কমে যায়। এ অবস্থায় অবতরণ করা যায়। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ইউরোপীয় পর্বতারোহীরা পাহাড় থেকে দ্রুত নিচে নামার জন্য প্যারাশুট ব্যবহার করতেন। ১৯৮০-র দশকে প্যারাশুটের নকশায় পরিবর্তন এনে ডানা যোগ করা হয়। ইঞ্জিনবিহীন এই বাহনের নাম দেওয়া হয় প্যারাগ্লাইডার।

 

 

দ্য ক্যাম্প

নির্জন পাহাড়ে অদ্ভুত বিদ্যাপীঠ

আল সানি
নির্জন পাহাড়ে অদ্ভুত বিদ্যাপীঠ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘দ্য ক্যাম্প’-এর নেপথ্য নায়ক পিয়েরে সেরেজোল (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবানল তখন পুরো ইউরোপকে গ্রাস করেছে। আকাশজুড়ে নািস যুদ্ধবিমানের গর্জন আর নিচে ধ্বংসস্তূপের আর্তনাদ। চারদিকে যখন মারণাস্ত্র তৈরির হিড়িক, ঠিক সেই সময়ই ইংল্যান্ডের গ্লুচেস্টারশায়ারের এক নির্জন পাহাড়ি এলাকায় জন্ম নিল এক অদ্ভুত বিদ্যাপীঠ। যুদ্ধের ধ্বংসলীলার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি চেয়েছিল নতুন এক পৃথিবী গড়তে। এর পোশাকি নাম ছিল ‘সার্ভিস ইন্টারন্যাশনাল ভলান্টারি ট্রেনিং সেন্টার’, কিন্তু সবার কাছে এটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘দ্য ক্যাম্প’ নামে। ব্যতিক্রমী এই প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে ছিলেন ব্রিটিশ শান্তিকামী সমাজকর্মী এবং কোয়াকার আন্দোলনের সদস্য পিয়েরে সেরেজোল। ১৯৪০ সালের সেই দিনগুলোতে লন্ডন যখন জার্মান বোমায় জ্বলছে, তখন সেরেজোল এবং কিছু স্বপ্নবাজ শিক্ষক মিলে এই পরিকল্পনা করেন। তাঁদের ভাবনা ছিল সোজাসাপ্টা—যুদ্ধ আজ হোক বা কাল, শেষ হবেই; কিন্তু তারপর? শহরগুলোর যখন কঙ্কালসার দশা হবে, মানুষ যখন খেতে না পেয়ে মরবে, তখন শুধু রাজনৈতিক ভাষণ দিয়ে দেশ বাঁচানো যাবে না। প্রয়োজন হবে একদল প্রশিক্ষিত মানুষের, যারা ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে নতুন করে সভ্যতা গড়ার কারিগরি জানবে। এই বিদ্যাপীঠের পাঠ্যক্রম ছিল বর্তমান সময়ের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও রোমাঞ্চকর। সেখানে ক্লাসরুমে বসে গতানুগতিক তত্ত্ব পড়ার বদলে ছাত্রদের শিখতে হতো কিভাবে বোমায় বিধ্বস্ত একটি সেতু দ্রুত মেরামত করা যায়, কিভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় কলেরার মতো মহামারি রুখতে হয়, কিংবা হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য তাঁবু গেড়ে অস্থায়ী শহর তৈরি করতে হয়। এটি ছিল মূলত এক ‘শান্তি-সেনা’ তৈরির কারখানা। সকালবেলা ছাত্ররা ক্লাসে আন্তর্জাতিক আইন বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঠ নিত, আর রাতে যখন লন্ডন বা নিকটবর্তী শহরগুলোতে নািস বাহিনীর বোমা পড়ত, তারা দল বেঁধে সেখানে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাদের জন্য যুদ্ধ ছিল এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি। প্রশিক্ষণার্থীদের শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা বাড়ানোর জন্য কঠোর ডিসিপ্লিনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো, যেন যেকোনো জরুরি অবস্থায় তারা বিচলিত না হয়।

দ্য ক্যাম্পের ছাত্ররা শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষা নিয়েই বসে ছিল না। যুদ্ধের শেষ দিকে এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে তারা গ্রিস, ফ্রান্স ও ইতালির দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ ও পুনর্গঠন কাজে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। তারা বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য ঘর বানানো, কৃষিজমি পুনরুদ্ধার এবং আহত সৈনিকদের সেবায় নিয়োজিত ছিল। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৪৪ সালে যখন মিত্রবাহিনী ইউরোপে এগোতে শুরু করে, তখন এই ক্যাম্পের প্রশিক্ষিত কর্মীরাই ছিল প্রথম কাতারের মানবিক স্বেচ্ছাসেবক।

তাঁরা সেনাবাহিনীর সমান্তরালে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেখানে সরকারি ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, সেখানে এই ক্যাম্পের গ্র্যাজুয়েটরা স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করেই মানুষের প্রাথমিক চাহিদা মিটিয়ে ফেলছে। পিয়েরে সেরেজোলের সেই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা থেকেই মূলত পরবর্তীকালে জন্ম নেয় সার্ভিস সিভিল ইন্টারন্যাশনাল (এসসিআই), যা আজও বিশ্বজুড়ে এক বিশাল স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক হিসেবে সক্রিয়। বর্তমানে এই সংগঠনের শাখা ৯০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বেলজিয়ামে এর সদর দপ্তর থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা জুড়ে। পাশের দেশ  ভারত এবং আমাদের বাংলাদেশেও এদের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সহযোগী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই শান্তিবাদী আদর্শিক প্রভাব লক্ষ করা যায়।

বর্তমান সময়ে সংগঠনটি শুধু যুদ্ধ নয়, জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে কাজ করে। তারা বিভিন্ন দেশে ইন্টারন্যাশনাল ভলান্টারি প্রজেক্ট বা ওয়ার্ক ক্যাম্প পরিচালনা করে, যেখানে বিভিন্ন দেশের তরুণরা একত্রিত হয়ে স্থানীয় কমিউনিটির উন্নয়নে কাজ করে, ঠিক যেমনটি গ্লুচেস্টারশায়ারের সেই পাহাড়ি ক্যাম্পে শুরু হয়েছিল। শান্তি রক্ষা ও আন্তর্জাতিক সংহতি স্থাপনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ এই সংগঠনকে ‘পিস মেসেঞ্জার’ খেতাবে ভূষিত করে।

 

 

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি

যুক্তি ও মুক্তচিন্তার বাতিঘর

তাহমিনা আক্তার মিম
যুক্তি ও মুক্তচিন্তার বাতিঘর

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের ক্যানভাসটা শুধু ক্লাস, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের চার দেয়ালে বন্দি নয়। সহশিক্ষারও দরকার আছে। মেধা, নেতৃত্বগুণ, যোগাযোগ দক্ষতা ও বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি শাণিত করার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো বিতর্ক। এই লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু করে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি’ (জেকেকেএনইউডিএস)। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে সংগঠনটি আজ ক্যাম্পাসে মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভর শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ​২০১২ সালে একঝাঁক স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি। প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তচিন্তা, যুক্তিনির্ভরতা এবং যৌক্তিক চিন্তা-ভাবনার একটি সুস্থ ও কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা। শুরু থেকেই সংগঠনটি ক্যাম্পাসে মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। ২০১৮ সালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাহী কমিটি নির্বাচনের প্রথা চালু হয়। বর্তমানে সংগঠনটিকে আরো সক্রিয় ও গতিশীলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান কমিটির ভিপি মো. হাসিবুর রহমান এবং জিএস মো. আতিকুর রহমান সেতু। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কেন্দ্রীয় বিতর্ক সংগঠন হিসেবে এটি এখন হাজারো শিক্ষার্থীর আস্থা ও আগ্রহের কেন্দ্র। প্রতিবছর গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ নতুন মুখ এই ক্লাবে যুক্ত হন। গত পাঁচ বছরে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এই সংগঠনের আঙিনায় নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। শুধু সদস্য সংগ্রহই নয়, নতুনদের দক্ষ করে তুলতে দেশসেরা বিতর্ক প্রশিক্ষকদের নিয়ে আয়োজন করা হয় সপ্তাহব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা। এই কর্মশালায় যুক্তি উপস্থাপন, বাকপটুতা এবং বিশ্লেষণী চিন্তা-ভাবনা উন্নয়নের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০টি অভ্যন্তরীণ বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ক্লাবটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আন্ত বিভাগ (সিনিয়র), আন্ত বিভাগ (ফ্রেশারস), আন্ত অনুষদ, আন্ত হল ও ডিবেটারস লীগ। এসব আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় এক সুস্থ প্রতিযোগিতা ও পারস্পরিক শেখার মেলবন্ধন। আর এই পুরো প্রক্রিয়া সফল করতে ৩০ জনেরও বেশি শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে উপদেষ্টা ও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা ক্লাবটিকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ​নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির কার্যক্রম শুধু ক্যাম্পাসের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই; ময়মনসিংহ জেলা জুড়ে বিতর্ক সংস্কৃতি বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে সংগঠনটি। তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আয়োজিত হয়েছে আন্ত স্কুল ও আন্ত কলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতা। স্থানীয় পর্যায়ের ১২টি স্কুল ও ১২টি কলেজ অংশ নেয় এসব প্রতিযোগিতায়। সংগঠনটির ইতিহাসের অন্যতম বড় মাইলফলক ছিল ২০২৩ সালের ‘এনভায়রনমেন্ট ডে ডিবেট ২০২৩’। এই মেগা ইভেন্টে ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪টি দল অংশ নেয়। সারা দেশ থেকে প্রায় ৩০০ জন বিতার্কিক, বিচারক ও অতিথির উপস্থিতিতে মুখরিত হয়েছিল নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ, যা ক্লাবের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জাতীয় পর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতার এক অনবদ্য প্রমাণ। আয়োজনের পাশাপাশি বাইরের মাঠেও সমান দাপট বজায় রেখেছেন বিতার্কিকরা। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০টি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তাঁরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় মঞ্চে রানার আপ, সেমিফাইনালিস্টসহ একের পর এক সাফল্য জমা হয়েছে এই ক্লাবের ঝুলিতে। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায়ও নিয়মিত অংশ নিয়ে সফলতার ছাপ রাখছেন বিতার্কিকরা। জাতীয় মঞ্চে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সাম্প্রতিক কিছু গৌরবময় অর্জনের মধ্যে আছে—একটি বেসরকারি টেলিভিশন ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত প্রাক-বাজেট ছায়া সংসদে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব। এ ছাড়া ‘এইউএসটিডিসি ন্যাশনালস-২০২৪’-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ ছয়টি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে রানার আপ, ‘জামালপুর জাতীয় বিতর্ক উৎসব-২০২৫’-এ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরাজিত করে রানার আপ এবং ‘পরিবেশ দিবস বিতর্ক-২০২৩’-এ রানার আপ ট্রফি অর্জন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘অ্যাকশনএইড ডিইউডিএস-২০২৪’-এ সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে সেমিফাইনালিস্ট, ‘বিইউবিটি ইনভাইটেশনাল ন্যাশনালস-২০২৫’-এ সেমিফাইনালিস্ট, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রি-সেমিফাইনালিস্ট এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘জেইউডিএস-৪ (২০২৫)’-এ কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করে তারা। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বর্তমান ভিপি মো. হাসিবুর রহমান বলেন, ‘নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটিকে আমরা শুধু একটি বিতর্ক সংগঠন হিসেবে নয়; বরং যুক্তিবাদী, সচেতন ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন প্রজন্ম তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চাই। ভবিষ্যতে আমরা জাতীয় পর্যায়ে আরো বড় বড় বিতর্ক আয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করছি। আমরা বিশ্বাস করি, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার এই চর্চা একদিন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

তিনি জানান, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বিতর্ক সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে নিয়মিত আউটরিচ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। নতুন বিতার্কিকদের দক্ষতা উন্নয়নে আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণাভিত্তিক বিতর্কচর্চা এবং সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করাই ক্লাবের অন্যতম লক্ষ্য।

 

নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সেরা সময়

এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার পর টানা দুই মাস সময় পাওয়া যায়। এমন দীর্ঘ ছুটি শিক্ষাজীবনে আর পাওয়া যায় না। ​জীবনের লক্ষ্য কী? আগামী তিন বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চাও? ভেবেচিন্তে এই সময়টা নিজেকে তৈরি করতে কাজে লাগাও। স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলো নোট করে এগোতে থাকো। পরামর্শ দিয়েছেন ​শাহ বিলিয়া জুলফিকার

নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সেরা সময়

পরীক্ষা শেষে টানা ছুটি। টানা পড়াশোনা ও মানসিক চাপের পর এখন যেন দম ফেলার ফুসরত! কিন্তু এই অবসর কি শুধু অলস বসে কাটানোর জন্য? একদমই না। বরং এই সময়টিই হতে পারে শিক্ষার্থীর পরবর্তী জীবনের ভিত্তি গড়ার সেরা সময়। কৈশোর থেকে তারুণ্যে পা দেওয়ার সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে দক্ষ, স্মার্ট ও বিবেকবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিজেকে ধাপে ধাপে তৈরি করতে হবে। মনে রাখবে, আজ যে ছোট ছোট দক্ষতা বা যোগ্যতা তুমি অর্জন করবে, ভবিষ্যতে সেগুলো তোমাকে অন্যদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে। আজকের ক্ষুদ্র পদক্ষেপগুলোই আগামী দিনের সাফল্যের ভিত্তি হবে। তাই অলসতা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করো। এর পাশাপাশি পরবর্তী শিক্ষাধাপে (কলেজ) ভর্তির প্রস্তুতির কথাও মাথায় রেখো।

​কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি

এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার মানেই পড়াশোনার ইতি নয়; বরং নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির লড়াই এখন দোরগোড়ায়। অনেক কলেজে ভর্তি পরীক্ষা হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি নেওয়া হয়। পছন্দের কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সিলেবাস ও গাইডবুক সংগ্রহ করে এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে পারো। ভর্তির প্রস্তুতি পর্বকে একটা সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগাতে পারো। কিভাবে? এসএসসি পর্যায়ের কোনো বিষয় বা অধ্যায়ে দুর্বলতা থাকলে এখনই কাটিয়ে উঠতে পারো। বেসিকে ভালো দখল থাকলে ভর্তি প্রস্তুতি পাকাপোক্ত হবে। পরবর্তীকালে এইচএসসিতেও একই বিষয়ে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে।

​ভাষা শিক্ষায় বিশেষ জোর

বর্তমানে ভাষার গুরুত্ব বহুমুখী। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় দখল না থাকলে উচ্চশিক্ষার পথ কঠিন হয়ে যায়। গ্রামার বা ব্যাকরণ মুখস্থ না করে ইংরেজি সিনেমা দেখা, গল্পের বই পড়া বা লিসেনিং প্র্যাকটিসের অভ্যাস গড়ে তোলো। মাদরাসার শিক্ষার্থীরা আরবি ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে পারো। এটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুযোগ পেতে সাহায্য করবে। বাংলা ব্যাকরণেও গুরুত্ব দিতে হবে, অবহেলা করা যাবে না।

দক্ষতা উন্নয়ন

ডিজিটাল দুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে অবশ্যই প্রযুক্তির জ্ঞান দরকার। অবসরে ছোট কোনো কম্পিউটার কোর্স বা গ্রাফিক ডিজাইনের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে পারো। এখন এআইয়ের যুগ। এআইয়ে পারদর্শী হলে তুমি বহুমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। এসব দক্ষতা ভবিষ্যতে পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং কিংবা খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ তৈরি করে দেবে। শুধু পুথিগত বিদ্যাই যথেষ্ট নয়। বিতর্ক (ডিবেট), পাবলিক স্পিকিং, সৃজনশীল লেখালেখি বা ফটোগ্রাফির মতো সৃজনশীল কোনো বিষয়েও নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারো। ছোট ছোট দক্ষতাই ভবিষ্যতে তোমার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, পরিচিত অভিজ্ঞ কারো সহযোগিতা নিতে পারো। এ ছাড়া অনলাইনেও অসংখ্য রিসোর্স ও টিউটরিয়াল পাওয়া যাবে। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকবে।  ​সোশ্যাল মিডিয়ায় অযথা সময় নষ্ট না করে শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখো। সাইবার নিরাপত্তা ও অনলাইন শিষ্টাচার সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে।

​নতুন কিছু শেখার আগ্রহ

বইয়ের পাতার বাইরের বিশাল জগেক জানার জন্য লম্বা ছুটির সময়টা কাজে লাগাও। শিক্ষাজীবনে এটাই ভ্রমণের মোক্ষম সময়। শুধু চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে দেশের ঐতিহাসিক বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানগুলো থেকে ঘুরে আসার চেষ্টা করো। ভ্রমণ মানুষের চিন্তার জগৎ প্রশস্ত করে। নতুন অভিজ্ঞতা ও জীবনের বৈচিত্র্য সম্পর্কেও বাস্তব ধারণা দেয়। ভ্রমণের পাশাপাশি এই সময়ে নতুন কোনো সৃজনশীল কাজে নিজেকে যুক্ত করতে পারো। নতুন কোনো কিছু শেখার প্রবল আগ্রহ থাকতে হবে। অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা তোমার মনকে প্রফুল্ল করবে। মনে প্রশান্তি এনে দেবে। মানসিকভাবে নিজেকে চাপমুক্ত রাখতে পারবে। দীর্ঘ একাডেমিক চাপের পর এই মানসিক প্রশান্তি তোমার আত্মবিশ্বাস ও অভিযোজন ক্ষমতা কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেবে। ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত এবং নতুন কিছু দেখা বা শেখার সুযোগ তোমাকে পরবর্তীকালে আরো পরিশ্রমের শক্তি জোগাবে।

​পাবলিক স্পিকিং অনুশীলন

​অনেকেই মঞ্চে বা অনেক মানুষের সামনে কথা বলতে ভয় পায়। জড়তা কাজ করে। ছুটির সময়টাতে বিতর্ক বা জনসমক্ষে কথা বলার অভ্যাস গড়তে পারো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জড়তা কাটানোর চর্চা শুরু করে দাও। এ ছাড়া পরিচিত কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময়ও এটি চর্চা করতে পারো।

​স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত হওয়া

​সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করা যায়। নিজের এলাকার কোনো পাঠাগার কিংবা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর মতো সামাজিক কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নিতে পারো। এ ধরনের কাজের মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণাবলি ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।

​শারীরিক সক্ষমতা ও শিল্পকলা

​দেহ সুস্থ থাকলে মনও সুস্থ থাকবে। নিয়মিত ব্যায়াম, ইয়োগা বা সাঁতারের মতো কোনো শারীরিক খেলাধুলায় সময় দাও। এগুলো তোমার কর্মক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ​গান, গিটার, সেতার, ছবি আঁকা বা কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখার ইচ্ছা থাকলে এখনই অনুশীলনের উপযুক্ত সময়। তবে খেয়াল রাখবে, কোনো কিছুই যেন নিজের মূল কাজ অর্থাৎ পড়াশোনার জন্য সমস্যার কারণ না হয়।

নৈতিক শিক্ষা ও বই পড়ার অভ্যাস

জীবনে সফলতা ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একজন ভালো মানুষ হওয়া জরুরি। এই সময়টিতে নৈতিক বা ধর্মীয় শিক্ষা বিষয়ক বই পড়তে পারো। এ ধরনের বই অনুপ্রেরণার পাশাপাশি আত্মিক ও মানসিকভাবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে। চারিত্রিক দৃঢ়তা অর্জনেও নৈতিক শিক্ষার দরকার। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বিশাল এক জগৎ রয়েছে। বিশ্বসাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস কিংবা জীবনমুখী বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলো। প্রচুর পড়ার মাধ্যমেই নিজের চিন্তার জগৎ সমৃদ্ধ করা সম্ভব।

বাগান ও ঘরোয়া কাজে

​বাড়ির ছাদে বা আঙিনায় বাগান করার অভ্যাস করো। এই কাজগুলোর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে মানুষ অনেক গুণ অর্জন করতে পারে। ভবিষ্যতে পড়াশোনা কিংবা চাকরির প্রয়োজনে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হতে পারে। তাই এ সময়টিতে মা-বাবার কাছ থেকে সাধারণ রান্নাবান্না ও ঘর গোছানোর কাজগুলো শিখে নিতে পারো।