লিচুর মৌসুম তো শেষ হতে চলল। জাম পাবেন আরো কিছুদিন। রসালো এই দুই ফলের পাঁচ পদ রেসিপি দিয়েছেন রন্ধনশিল্পী মাকসুদা বেগম স্নিগ্ধা
এসি ছাড়াই ঘর ঠাণ্ডা
সুস্থ থাকতে নিজের ঘর আরামদায়ক করা জরুরি। এয়ারকন্ডিশনার ছাড়াই ঘর ঠাণ্ডা রাখা যায় এমন কয়েকটি উপায় নিয়ে লিখেছেন জান্নাতুল মুশরাত জেবিন
ইনডোর প্ল্যান্ট ঘর ঠাণ্ডা রাখে। ছবি : এটুজেড
পর্দা ও জানালা
সকাল হতেই আমরা ঘরের দরজা-জানালা খুলে ঘরে আলো বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে দিই। গরমে রোদের তাপ থেকে বাঁচতে সকাল ১১টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জানালা বন্ধ রাখুন। রাতে আবার জানালা খুলে দিন। এভাবে ঘর শীতল রাখা সম্ভব। ঘরের যেসব জায়গা দিয়ে অবাধে রোদ ঢোকে, সেখানে পর্দা দিয়ে আবৃত করে দিন, যাতে বাইরের তাপ ভেতরে প্রবেশ করে ঘর উষ্ণ করে না তোলে। তাপ কুপরিবাহী সুতি কাপড়ের পর্দাও গরম থেকে সুরক্ষা দেবে।
সঠিক বাল্ব ও বৈদ্যুতিক পাখা
বেশি পাওয়ারফুল কিংবা লাল, হলুদ আলো বিচ্ছুরণ করা বাল্ব অধিক তাপ উত্পন্ন করে। তাই তীব্র গরম থেকে বাঁচতে অধিক পাওয়ারের পরিবর্তে বিদ্যুত্সাশ্রয়ী এবং সাদা আলো দেয় এমন বাতি ব্যবহার করুন। এতে ঘর ঠাণ্ডা থাকবে।
বরফ ব্যবহার
বৈদ্যুতিক টেবিল ফ্যান ঘরের এমন জায়গায় রাখুন, যাতে এর মাধ্যমে পুরো কক্ষে বাতাস ছড়িয়ে পড়ে। ফ্যানের কাছে কোনো পাত্রে বরফ খণ্ড রাখতে পারেন। এতে ধীরে ধীরে পাত্রের বরফ গলে তার সঙ্গে ফ্যানের বাতাস মিশে ঘরের আবহাওয়া শীতল করে তুলবে।
মাটির পাত্রে পানি
সাধারণত মাটির পাত্রে পানি রাখলে তা অপেক্ষাকৃত অধিক ঠাণ্ডা থাকে। তাই ঘরের ভেতরে বড় মাটির কলস বা ভিন্ন কোনো পাত্রে পানি রেখে দিতে পারেন। এটিও ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাওয়া সম্ভব।
ইনডোর প্ল্যান্ট
গাছপালা থেকে আমরা প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ বাতাস পেয়ে থাকি। যেখানে গাছপালা বেশি থাকে, সেখানে আবহাওয়া এমনিতেই কিছুটা ঠাণ্ডা থাকে। তাই প্রাকৃতিক উপায়ে ঘর ঠাণ্ডা রাখতে চাইলে ঘরের ভেতরে এবং বারান্দায় গাছপালা লাগাতে পারেন। এই গরমে গাছপালা আমাদের অনেকটাই স্বস্তি দিতে পারে।
কৃত্রিম ঝরনা
বসার ঘরে ছোট আকৃতির কৃত্রিম ঝরনার ব্যবস্থা করতে পারেন। এতে বয়ে চলা পানি ঘরে ঠাণ্ডা আবহাওয়া ছড়িয়ে দেবে।
শুধু স্বাদেই নয়, ত্বকচর্চায়ও সেরা ফলের রাজা আম। সঙ্গে কিছু উপাদান মেশালে ফলটি ত্বকের যত্নেও দারুণ কার্যকর। সব ধরনের ত্বকে এবং যেকোনো বয়সে আমের প্যাক ব্যবহার করা যায়। পরামর্শ দিয়েছেন রূপ বিশেষজ্ঞ নাহিদা পারভীন। লিখেছেন মেহরীমা ইতি
এখন আমের মৌসুম। পাকা আম খাওয়ার পাশাপাশি ত্বকচর্চায়ও ব্যবহার করতে পারেন। আমে রয়েছে ডায়েটারি ফাইবার, ভিটামিন এ, বি, ই ও কে। এ ছাড়া প্রচুর কপার, ফোলেট, কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন পাওয়া যায় আমে। এসব পুষ্টি উপাদানের সমন্বয়ে স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টের প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি উপকরণ হিসেবে আম ব্যবহূত হচ্ছে। ত্বকের ম্লানভাব দূর করা, কোলাজেন উত্পাদন, ত্বক টান টান ও উজ্জ্বল দেখানো, বলিরেখা দূর করাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও ঘরোয়া টোটকা হিসেবে আমকে কাজে লাগাতে পারেন।
শুষ্ক ত্বকের সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। অতিরিক্ত শুষ্কতা দূর করতে নিয়মিত আমের প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। এক টেবিল চামচ আমের পাল্প নিন। এর সঙ্গে দুই চা চামচ বেসন ও কয়েক ফোঁটা মধু মিশিয়ে ঘন প্যাক বানিয়ে নিন। এরপর প্যাকটি মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে ভালো করে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ভালো ফল পেতে সপ্তাহে দুই দিন এই প্যাক ব্যবহার করুন।
আপনার ত্বক যদি তৈলাক্ত হয়, তবে এক টেবিল চামচ আমের পাল্পের সঙ্গে এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটি ও কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিন। আম, মুলতানি মাটি ও লেবুর এই প্যাক নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের অতিরিক্ত তৈলাক্তভাব দূর হবে।
স্বাভাবিক ত্বকের যত্নেও আম উপকারী। এক টেবিল চামচ মসুর ডালের গুঁড়া নিন। এর মধ্যে এক টেবিল চামচ আমের পাল্প ও এক টেবিল চামচ গোলাপজল ভালো করে মিশিয়ে ঘন প্যাক বানিয়ে নিন। মুখের ত্বকে প্যাক লাগিয়ে ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। ত্বক পরিষ্কার ও উজ্জ্বল হবে।
আমের সঙ্গে চন্দন গুঁড়ার মিশ্রণ এই গরমে মুখের একটি আদর্শ মাস্ক। দুই টেবিল চামচ পাকা আমের পাল্প, এক টেবিল চামচ চন্দন গুঁড়া ও দুই চামচ গোলাপজল মিশিয়ে ঘন প্যাক বানিয়ে মুখ ও গলায় মেখে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বক আর্দ্র ও কোমল হবে।
শুষ্ক, তৈলাক্ত ও স্বাভাবিক—তিন ধরনের ত্বকেই আমের প্যাক ব্যবহার করা যায়। ছবি : সংগৃহীত
সারা বছর ত্বকের যত্নে আম ব্যবহার করতে পারেন। এ জন্য পাকা আমের রস ডিপ ফ্রিজে রেখে ছোট ছোট কিউব করে সংরক্ষণ করুন। ব্যবহারের আগে কিউব বের করে গলিয়ে নিন। পাকা আমের সঙ্গে কাঁচা দুধ মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া যখনই আম খাবেন সম্ভব হলে খাওয়ার পরপরই খোসাটুকু ত্বকে ঘষুন। ত্বকে হলুদাভ দীপ্তি খেলা করবে।
খেয়াল রাখুন
* ত্বকের যত্নে গাছপাকা আম ব্যবহার করুন। কেনা আম ব্যবহার করতে চাইলে তা যেন কার্বাইডমুক্ত হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
* টাটকা আমের পাল্প দিয়ে প্যাক বানিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবহার করুন। নয়তো ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত হবে।
হালকা কাপড়, সহজ কাট, নরম রং ও ব্যাবহারিক স্টাইলের নতুন ডিজাইনের সামার কালেকশন এনেছে লা রিভ। উত্সবের আভাস, অফিস, ক্যাম্পাস, ভ্রমণ ও দৈনন্দিন জীবনের উপযোগিতাকে প্রাধান্য দিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের সংগ্রহ। লা রিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মন্নুজান নার্গিস বলেন, ‘পোশাক আরামদায়ক এবং দিনের নানা পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই হতে হয়। এবার আমরা সেই বাস্তবতাকেই গুরুত্ব দিয়েছি।’
বনশ্রীতে লা ডেলিশিয়ার দ্বিতীয় আউটলেট
রাজধানীর বনশ্রীতে দ্বিতীয় আউটলেট চালু করেছে বেকারি ও ক্যাফে ব্র্যান্ড লা ডেলিশিয়া। ১৫ জুন রবিবার আউটলেটটির উদ্বোধন করা হয়। নতুন আউটলেটে ব্র্যান্ডটির সিগনেচার পণ্যগুলো পাওয়া যাবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্লাসিক ও কাস্টমাইজড কেক, বিভিন্ন ধরনের ফ্রেশ পেস্ট্রি, হ্যান্ডক্রাফটেড ডোনাট, আর্টিজান কুকিজ, প্রিমিয়াম ডেজার্ট এবং ভিন্নধর্মী স্যাভরি আইটেম। আউটলেট এবং অনলাইনেও অর্ডার করতে পারবেন গ্রাহকরা।
বিশ্বকাপ উদযাপনে ঢাকা রিজেন্সির আয়োজন
বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিশেষ অফার নিয়ে এসেছে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। নির্বাচিত ব্যাংক পার্টনারদের কার্ডধারী অতিথিরা হোটেলটির বিশেষ মেন্যুতে উপভোগ করতে পারবেন সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়। হোটেলের ডাইনিং ভেন্যু বাবল ফ্লেভার লাউঞ্জে পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে খেলা উপভোগের পাশাপাশি অতিথিরা উপভোগ করতে পারবেন সুস্বাদু খাবার ও সাশ্রয়ের সুযোগ।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফুডপান্ডায় ছাড়
ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে খাবার ও গ্রসারি অর্ডারে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে অনলাইন ফুড ও গ্রসারি ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ফুডপান্ডা। নির্দিষ্ট কিছু রেস্টুরেন্ট ও পান্ডামার্ট থেকে অর্ডার করলে গ্রাহকরা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাবেন।
‘মেক গেম নাইট ডেলিশিয়াস’ নামের এই ক্যাম্পেইনের আওতায় অংশগ্রহণকারী রেস্টুরেন্ট ও পান্ডামার্ট থেকে অর্ডারের সময় ‘ডিলনাও’ (উঊঅখঘঅঙ) প্রমো কোড ব্যবহার করলে গ্রাহকরা এই সুবিধা নিতে পারবেন।
বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান শহীদ হন মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায়। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী ছিলেন তিনি—মাত্র ১৮ বছর। অসীম সাহসী এই বীরের শাহাদাতবরণের স্থান ঘুরে এসেছেন সেলিম আউয়াল
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান
আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে হাত দুয়েক দূরে পড়ে ছিল তাঁর লাশ। এখন সেখানে স্টিলের একটি টাওয়ার বানিয়ে মৃত্যুস্থানটি চিহ্নিত করে রাখা। শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সেক্টরের আওতায় লড়াই করেছিলেন।
এভাবে কোনো বীরশ্রেষ্ঠর সংগ্রামস্থল ও শাহাদাতস্থলে যাওয়ার সুযোগ কখনো হয়নি। আমরা নো ম্যানস ল্যান্ডের সীমানায় দাঁড়িয়ে। আমাদের সামনে লাল-সবুজের একটি লাঠি হাতে খুব গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন—মোহাম্মদ মাসুদ আলী। প্যান্ট আর টি-শার্ট পরা মাসুদ আলীকে ভেবেছিলাম সিভিল ড্রেসে বিজিবি সদস্য। কেউ যাতে বর্ডার ক্রস না করে সে জন্যই বোধ হয় তিনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ইশারা করছিলেন, আমরা যেন সবাই তাঁর সামনে এসে দাঁড়াই।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর ও আর্কাইভ। ছবি : লেখকের সৌজন্যে
আমরা সবাই এসে গেছি বলতেই মাসুদ আলী নড়েচড়ে বসলেন। প্রথমেই সামরিক কায়দায় সবার উদ্দেশে সালাম ঠুকলেন। তারপর পরিচয় দিলেন, তিনি হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধের কেয়ারটেকার। নিজের পরিচয় দিয়ে একাত্তরের অক্টোবর মাসের সেই ভয়াল দিনটির কথা বলতে শুরু করেন। মনে হচ্ছিল, মাসুদ আলী যেন সেই দিন সেই যুদ্ধ দেখেছেন অথবা অংশ নিয়েছেন।
মাসুদ আলী বলছিলেন, ভারতের ভেতর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ছোট্ট ধলাই নদী পাড়ি দিয়ে আজকের বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। সেই দলে ছিলেন হামিদুর রহমান। সীমান্তের গা ঘেঁষে সেই সময়ের ইপিআর (বর্তমান বিজিবি) ক্যাম্প, নো ম্যানস ল্যান্ড থেকে দেড় শ গজ দূরে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত ধলাই সীমান্তের সেই ক্যাম্পটি দখল করবেন। শত্রুর কাছাকাছি আসতেই একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ফাঁড়ির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও ফাঁড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিবর্ষণের কারণে সামনে এগোতে পারছিল না। মুক্তিবাহিনী সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তানি বাহিনীর মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলা চালাবে। গ্রেনেড ছোড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় হামিদুর রহমানকে। তিনি পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন। সফলভাবে দুটি গ্রেনেড মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে, কিন্তু এর পরপরই হামিদুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। মুক্তি কামনায় পাগলপারা হামিদুর দমে যান না, আহত অবস্থায়ই তিনি মেশিনগান পোস্টে গিয়ে সেখানকার দুজন পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু করেন। এভাবে আক্রমণের মাধ্যমে হামিদুর রহমান একসময় মেশিনগান পোস্টকে অকার্যকর করে দেন। এই সুযোগে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল উদ্যমে এগিয়ে যান এবং শত্রু পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে হারিয়ে সীমানা ফাঁড়িটি দখল করেন।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর ও আর্কাইভে দাঁড়িয়ে মাসুদ আলী। ছবি : লেখক
এরপর হামিদুর আহত শরীর টেনে ক্রলিং করে পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে চলে আসেন। কিন্তু সীমান্ত পেরোনোর আগেই ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। সহযোদ্ধারা তাঁর লাশ বয়ে আবার ভারতে চলে যান। সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে ভারতে আমবাসা গ্রামের একটি মসজিদের পাশে তাঁকে কবর দেন। হামিদুর রহমানের শাহাদাতবরণের যে জায়গাটি দেখাচ্ছিলেন মাসুদ আলী, এখন সেখানে একটি স্মৃতি টাওয়ার।
মাসুদ আলীর বলার ভঙ্গি চমত্কার। এমনভাবে বলছিলেন, যেন সেই দিনের যুদ্ধের ছবি সবার চোখের সামনে, ছোট্ট ধলাই নদীর জল হামিদুর রহমানের রক্তে লাল হয়ে আছে। চোখ ভিজে আসে তাঁর কথায়। হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধের কাছাকাছি একটি গ্রামে মাসুদ আলীর বাড়ি। তিনি চা-শ্রমিক পরিবারের সদস্য। কেয়ারটেকারের কাজ করছেন প্রায় ১১ বছর ধরে। বাগান কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রতিদিন ১৭০ টাকা বেতন দেয়। তিনি খুব আন্তরিক। বিটিভিসহ অনেকগুলো টিভি চ্যানেল তাঁর সাক্ষাত্কার নিয়েছে। আর ব্লগাররা তো হরহামেশাই নিচ্ছেন তাঁর ইন্টারভিউ। একাত্তরে হামিদুর রহমান বোমা মেরে যে বাংকার উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই বাংকারের ধ্বংসাবশেষ এখনো আছে। সেটি বিজিবি ক্যাম্পের ভেতরে।
নো ম্যানস ল্যান্ডে ভ্রমণদলের সঙ্গে লেখক সেলিম আউয়াল [বাম থেকে পঞ্চম]
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের ধলাই চা-বাগানে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডের গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর ও আর্কাইভ। স্মৃতি আর্কাইভে প্রদর্শিত হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমানের ছেলেবেলার ছবি, পারিবারিক ও জীবনতথ্য।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কবর এখন ঢাকায়। ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ ভারত থেকে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
আমাদের সফরটা ছিল পারিবারিক। সুযোগ এলেই আমরা এভাবে দল বেঁধে ছুটে বেড়াই দেশের আনাচকানাচে। এবার আমাদের দলে দুজন মুরব্বি ছিলেন—আমার আম্মা মিরযা সমর উন নিসা ও শাশুড়ি মজমুনা বেগম চৌধুরী। পরিবারের অন্যতম সদস্য রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর দেশে আসা উপলক্ষে দল বেঁধে আমাদের এবারের ভ্রমণ। আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আমার ভগ্নিপতি প্রেমনগর চা-বাগানের ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন ও আমার বোন শিক্ষক সামিয়া খাতুন। ২০০৩ সালে আনোয়ারের মেহমান হয়ে মুশফিক একবার রাত কাটিয়েছিলেন পাত্রখোলা চা-বাগানে। পরে স্বৈরাচার সরকারের চক্ষুশূল হয়ে মুশফিক দেশত্যাগে বাধ্য হন। বেছে নেন নির্বাসিত জীবন। ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের পর অবসান হয় তাঁর নির্বাসিত জীবন। এরপর রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নিয়ে পাড়ি জমাতে হয় মেক্সিকোতে। বর্তমানে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
৩১ মে সকালে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ দেখে ফিরে যাই পাত্রখোলা বাগানে। সেখান থেকে সিলেটের পথে। ভানুগাছ থেকে মাধবপুর ও পাত্রখোলার প্রধান সড়কটি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে। পথ চলতে চলতে বারবার কানে বাজছিল মাসুদ আলীর বয়ান—হামিদুর রহমান নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে বুকে বোমা বেঁধে ঢুকে যান শত্রুর ডেরায়! নিজের জীবনের চেয়ে দেশের স্বাধীনতা ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়!
কিভাবে যাবেন
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধে যেতে চাইলে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় যেতে হবে। ঢাকা থেকে সরাসরি সড়কপথ ও রেলপথে কমলগঞ্জে আসা যায়। ঢাকার ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ থেকে বাসে শ্রীমঙ্গলে পৌঁছতে পারবেন। এ ছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সিলেটমুখী জয়ন্তিকা, উপবন, পারাবত, কালনী বা সুরমা মেইলেও কমলগঞ্জে যাওয়া যায়। কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ রেলস্টেশন থেকে স্থানীয় পরিবহনে [সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা অথবা খোলা জিপে] বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধে যাওয়া যায়।