• ই-পেপার

এক মায়ের করুণ মৃত্যু, আইন এবং মানবিকতা

  • ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

রিজার্ভে ডলার নয়, সোনা হোক অগ্রাধিকার...

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

রিজার্ভে ডলার নয়, সোনা হোক অগ্রাধিকার...

ব্রেটন-উডস ব্যবস্থার অবসানের পর বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা সরাসরি সোনানির্ভর কাঠামো থেকে সরে এসে ফিয়াট মুদ্রা (কাগুজে মুদ্রা), ঋণ সম্প্রসারণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ভর এক ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নমনীয়তা বাড়ালেও একই সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে অধিক জটিল ও আস্থানির্ভর করে তুলেছে। কারণ ফিয়াট মুদ্রা ব্যবস্থার মূলভিত্তি কোনো বাস্তব সম্পদ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা এবং বাজার আস্থার সমন্বয়। কিন্তু ইতিহাস শিক্ষা দেয়, যে ব্যবস্থা শুধু আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আস্থা নড়ে গেলেই সংকট দেখা দেয়। অন্যদিকে সোনা, সুমেরীয় সভ্যতা থেকে আজ পর্যন্ত আস্থার একটি পরীক্ষিত মানদণ্ড হিসেবে টিকে আছে।

বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো এই বাস্তবতা পুনর্বিবেচনা করতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চীন  প্রায় দুই হাজার ৩১৩ টন সোনা মজুদ করেছে এবং পিপলস ব্যাংক অব চায়না ধারাবাহিকভাবে সোনা কিনে চলেছে। রাশিয়া মজুদ করেছে প্রায় দুই হাজার ৩০৫ টন। ডলারনির্ভরতা কমাতে সোনাকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফ্রান্স মজুদ করেছে প্রায় দুই হাজার ৪৩৭ টন, যা ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম মজুদ এবং দেশের অভ্যন্তরেই সংরক্ষিত। ভারত মজুদ করেছে প্রায় ৮৮১ টন। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI) নিয়মিত সোনা কিনছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট ৮৬৩ টন সোনা কিনেছে, যা বহু দশকের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিমাণ।

ফিয়াট মুদ্রা ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূলত অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার এবং আস্থার ওপর নির্ভরশীল।

দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ সম্প্রসারণ যখন উৎপাদন সক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়, তখন মুদ্রার স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চ ঋণস্তর, অতিরিক্ত তারল্য ও ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনএই তিনটি উপাদান বর্তমান মুদ্রাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সে কারণেই  গ্লোবাল রিসেট ধারণাটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো তার অফিশিয়াল সোনার মূল্য ধরে রেখেছে প্রতি ট্রয় আউন্স মাত্র ৪২.২২ ডলার, যা ১৯৭০-এর দশকের নীতিগত কাঠামোর অংশ। অথচ সোনার বর্তমান বাজারমূল্য (মে ২০২৬) প্রায় চার হাজার ৪৫০ থেকে চার হাজার ৫৩০ ডলার প্রতি ট্রয় আউন্স। যদি কোনো বড় পুনর্মূল্যায়ন করা হয় (যেমনট্রয় আউন্সে ১০ হাজার ডলার বা তার বেশি), তাহলে খাতা-কলমে ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সৃষ্টি হয়ে যাবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র সোনার এই পুনর্মূল্যায়ন করে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তীব্র অভিঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে যাবে। ডলারনির্ভর দেশগুলো তখন প্রবল অর্থনৈতিক চাপে পড়বে। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেযেসব দেশ আগে থেকে সোনার মজুদ বাড়িয়েছে (চীন, রাশিয়া, ভারত ও ফ্রান্স)। বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন মানদণ্ড তৈরি হবে। পুনর্বিন্যাসিত হবে বিশ্ব অর্থনীতি।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও সুযোগ : বাংলাদেশের মতো ডলারনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই সম্ভাব্য পরিবর্তন ভয়াবহ হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট রিজার্ভ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার (এপ্রিল ২০২৬), যার মধ্যে সোনা মাত্র ১৪.২৮ টন (প্রায় ১ শতাংশের কম০.৬৭ শতাংশ)।

ঝুঁকি : ১. বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের খরচ বৃদ্ধি। ২. জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি। ৩. ডলার দুর্বল হলে রিজার্ভের আন্তর্জাতিক ক্রয়ক্ষমতা কমবে। ৪. ডলার দুর্বল হলে রেমিট্যান্সের প্রকৃত মূল্য হ্রাস পাবে।

সুযোগ : যদি ডলার দুর্বল হয়, তবে পাট, পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম বাড়তে পারেঅভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে এর সুফল পাবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবিলম্বে সোনার মজুদ বাড়ানো উচিত। এটি মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের অস্থিরতা ও বৈশ্বিক সংকটের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হেজ হিসেবে কাজ করবে। বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় সোনা শুধু একটি ধাতু নয়, এটি সীমা, শৃঙ্খলা ও বাস্তবতার প্রতীক। এমন এক সম্পদ, যা ইচ্ছামতো ছাপা যায় না বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে রাতারাতি তৈরি করা যায় না। অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত শুধু সংখ্যার খেলা নয়। এটি আস্থা, সংযম ও দায়বদ্ধতার সম্মিলিত ব্যবস্থা। যে রাষ্ট্র এই তিনটিকে উপেক্ষা করে, তাকে একদিন তার ভুলের মূল্য চোকাতে হয়। ুংুুবাংলাদেশ কি সেই ভুলের খেসারত দেওয়া রাষ্ট্রগুলোর একটি হবে?

লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

নিরঞ্জন রায়

ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে একটি সার্কুলার জারি করেছে, যা মেনে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের শেয়ার মালিকদের জন্য লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে। সার্কুলারের শর্ত অনুযায়ী যেসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দুই হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি, শুধু সেসব ব্যাংকই লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে। একই সার্কুলারে নগদ লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে শর্ত দেওয়া আছে এবং সে অনুযায়ী যেসব ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা আছে, তারাও সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে। অর্থাৎ বাকি ৫০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড হিসেবে প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে সময় ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদান সংক্রান্ত সার্কুলারটি জারি করছে, তখন দেশের ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার, বিশেষ করে স্টক মার্কেট যারপরনাই খারাপ অবস্থায় আছে। তবে এই সার্কুলার জারির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কি দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করা, নাকি স্টক মার্কেটে গতি আনা, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।

লভ্যাংশ ঘোষণা ব্যাংকের একটি নিজস্ব কার্যক্রম, যা আর্টিকলস অব অ্যাসোসিয়েশনের বিধান অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের নিজস্ব এখতিয়ার। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু করার থাকে না। অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলধন-ভিত্তি বাড়ানোর জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন বাণিজ্যিক ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে সার্কুলার ইস্যু করতে হলো? উত্তর একটিই, তা হচ্ছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের করপোরেট দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা। আমাদের দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা তাদের করার কথা নয়। একইভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট অনেক পদক্ষেপ নিতে পারে না, যা তাদের একান্তভাবে করার কথা। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি নিজে থেকে তাদের মূলধন-ভিত্তি বৃদ্ধি করত এবং ব্যাংককে একটি শক্ত অবস্থানের ওপর দাঁড় করাতে পারত, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংককে আজ এ রকম সার্কুলার জারি করতে হতো না।

ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজনবাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার উভয় খাতের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করেই লভ্যাংশ প্রদান সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করেছে। কিন্তু সার্কুলারে বর্ণিত শর্তগুলো কিভাবে কাজ করবে, তা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। কেননা লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকের দুই হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু মূলধন একটি ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরে না। মূলধন হচ্ছে কয়েকটি উপাদানের একটি, যার মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। যেমনমূলধন-সঞ্চয় অনুপাত, মোট সম্পদের পরিমাণ, সম্পদের গুণগত মান, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং ঋণ-আমানত অনুপাত। এসব উপাদান এবং পরিশোধিত মূলধন বিবেচনায় নিয়েই একটি ব্যাংক ভালো, না মন্দসেটি নির্ণয় করা হয়। সার্কুলারে লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত হিসেবে পরিশোধিত মূলধনের যে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাবে যে অনেক ভালো ব্যাংকও লভ্যাংশ প্রদান করতে পারছে না, আবার অনেক খারাপ ব্যাংকও লভ্যাংশ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বিষয়টি একটু জটিল মনে হতে পারে। তাই একটি কাল্পনিক উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

ধরা যাক, আলফা ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা, মোট ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণের পরিমাণ আট হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দুই হাজার কোটি টাকা। পক্ষান্তরে বেটা ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, মোট ঋণের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা। উদাহরণে ব্যবহৃত তথ্য অনুযায়ী আলফা ব্যাংকের অবস্থা বেশ খারাপ। কেননা তাদের মূলধন-আমানতের অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশ, খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশ, ঋণ-আমানতের অনুপাত ৮৪ শতাংশ। পক্ষান্তরে বেটা ব্যাংক যথেষ্ট ভালো অবস্থানে আছে। কেননা তাদের মূলধন-আমানতের অনুপাত ১২ শতাংশ, খেলাপি ঋণ ৪ শতাংশ এবং ঋণ-আমানতের অনুপাত ৮০ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের শর্ত অনুযায়ী আলফা ব্যাংক খারাপ অবস্থায় থেকে লভ্যাংশ প্রদান করতে পারলেও বেটা ব্যাংক যথেষ্ট ভালো অবস্থায় থেকে লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে না। তা ছাড়া ব্যাসেল-তিন অনুযায়ী একটি ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় সেই ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। সে কারণে ঢালাওভাবে দুই হাজার কোটি টাকার মূলধন সংরক্ষণের শর্ত ব্যাসেল-তিন পরিপালনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

একইভাবে ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদানের যে শর্ত, তা-ও কতটা কার্যকর হবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত থাকায় ব্যাংকের তারল্য সংরক্ষণের ওপর চাপ কমবে এবং সেই সঙ্গে দেশে বিনিয়োগকারীদের কিছুটা লাভ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যংকের লভ্যাংশ প্রদানের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা এবং বৃহৎ বিনিয়োগকারী। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা খুব সামান্য সুবিধাই পেয়ে থাকেন। শেয়ার মালিকানা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ব্যাংকের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শেয়ার মালিকানা থাকে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের দখলে। মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হাতে। ফলে ব্যাংক যদি এক হাজার কোটি টাকার নগদ লভ্যাংশ প্রদান করে, তার মধ্যে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চলে যায় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের কাছে এবং মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা যায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে। অথচ এই লভ্যাংশ প্রদানের কারণে ব্যাংকের মূলধন ও রিজার্ভের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা হ্রাস পায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারটি এমন এক সময় জারি করেছে, যখন দেশের ব্যাংকিং খাত নানা রকম সমস্যায় জর্জরিত। অনেক ব্যাংক অস্তিত্বের সংকটে আছে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের চাহিদা মোতাবেক অর্থ ফেরত দিতে পারছে না, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। অনেক ব্যাংক ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদান করা বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি অনুমোদন করা ঋণও বিতরণ করতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা মারাত্মক সমস্যার মধ্যে আছেন। প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি অনেক ব্যাংকের লাগাতার সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর উপযুক্ত বিকল্প চিন্তা না করে জোরপূর্বক কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করার ফলে কাজের কাজ তো কিছুই হয়নি, উল্টো সমস্যা আরো জটিল হয়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে আছে, যেখান থেকে উত্তরণের উদ্যোগ নেওয়া অপরিহার্য। আর এই উদ্যোগের অন্যতম পন্থা হচ্ছে ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধি করা। ঐতিহাসিকভাবে ব্যাংকের মূলধন-ভিত্তি যদি শক্ত থাকে, তাহলে ব্যাংক যেকোনো প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারে। এ কারণে বিশ্বের কোথাও কোনো ব্যাংকের সমস্যা হলে প্রথমেই মূলধন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে আমেরিকার সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির কারণে উন্নত বিশ্বের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা এবং কয়েক বছর আগে ক্রেডিট সুইস ও সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক বন্ধ হওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাতে যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, সেখানেও ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ব্যাসেল-তিনে যে ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো যেন প্রতিকূলতা কাটিয়ে টিকে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করা। লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সার্কুলার ইস্যু করেছে, তা দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন-ভিত্তি আরো দুর্বল করবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সার্কুলারটি পুনর্বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যাতে ব্যাংকের মূলধন, রিজার্ভ ও প্রভিশন বৃদ্ধি পায়।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন মানসম্পন্ন গবেষণা

মেজর (অব.) এ কে এম শাকিল নেওয়াজ

শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন মানসম্পন্ন গবেষণা

সাম্প্রতিক সময়ে একজন রাজনৈতিক নেতা (মন্ত্রী) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের মধ্যে যে বক্তব্য ও পাল্টাবক্তব্য জনসমক্ষে এসেছে, তা আমাদের সবাইকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিষয়টি শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মতপার্থক্যের নয়, বরং এটি আমাদের সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মান, মূল্যবোধ ও পেশাগত সংস্কৃতি নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে, যেখান থেকে ভবিষ্যতের আমলা, গবেষক, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়। ব্যক্তিগত মন্তব্য বা কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোনটির চেয়ে শ্রেষ্ঠএই বিতর্কে সময় ব্যয় না করে আমাদের আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন করা উচিতগবেষণা, উদ্ভাবন এবং জাতীয় উন্নয়নে অবদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থান কোথায়?

খোলামেলা একটি পর্যবেক্ষণ শেয়ার করতে চাই। বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান, গবেষণা অবকাঠামো এবং উদ্ভাবনব্যবস্থা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি, যা দেশের বড় বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই অর্থনীতি, পরিবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা খাতে গবেষণাভিত্তিক সমাধানের তুলনামূলক স্বল্প উপস্থিতিতে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসেগবেষণার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? গবেষণা শুধু একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন, প্রকাশনার সংখ্যা বৃদ্ধি, পদোন্নতি লাভ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং উন্নত করার জন্য হওয়া উচিত নয়। গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন জ্ঞান সৃষ্টি করা, যা বাস্তব সমস্যার সমাধান দেয় এবং জাতীয় উন্নয়নে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অবদান রাখে।

একটি কার্যকর গবেষণা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে, দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারে, জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে পারে এবং শিক্ষার মান উন্নত করতে পারে। আমরা কি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে আমাদের দেশে পরিচালিত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণা জাতীয় পর্যায়ে এসব খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনে দিয়েছে? এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে বের করা নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবার দায়িত্ব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং জাতীয় সক্ষমতা উন্নয়নে কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী করেছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে তারা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু রয়েছে।

সুতরাং মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত নয় কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোনটির চেয়ে ভালো। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলোকিভাবে আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি, যা একই সঙ্গে দেশের বাস্তব প্রয়োজন ও জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রতি সংবেদনশীল থাকবে। প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পকে শুধু একাডেমিক মানদণ্ডে নয়, বরং সমাজ ও দেশের উন্নয়নে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদানের ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

আজ যখন বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন প্রযুক্তি, রোবটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু সহনশীলতা, বায়োটেকনোলজি এবং মহাকাশসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও উদ্ভাবনের অগ্রভাগে অবস্থান নিতে হবে।

গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে ভবিষ্যতের জাতীয় চাহিদা এবং উদীয়মান বৈশ্বিক প্রযুক্তির আলোকে। একই সঙ্গে স্থানীয় সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করাও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থী, দক্ষ শিক্ষক, প্রতিশ্রুতিশীল গবেষক এবং বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনার কোনো অভাব নেই। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী গবেষণা পরিবেশ, যেখানে থাকবে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক অংশীদারি, মেধাভিত্তিক গবেষণা প্রণোদনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় গবেষণা ভিশন।

সব শেষে আমাদের উচিত কোন বিশ্ববিদ্যালয় সেরাএই বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে কিভাবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মূল্যায়ন তার ঐতিহ্য বা খ্যাতির মাধ্যমে নয়, বরং তার গবেষণা, উদ্ভাবন এবং গ্র্যাজুয়েটরা দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, পরিবেশ ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কতটুকু অবদান রাখছে, তার মাধ্যমে হওয়া উচিত। যেদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন গবেষণা সৃষ্টি করবে, যা জাতীয় সমস্যার সমাধান করবে, নতুন শিল্প গড়ে তুলবে, নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে, পরিবেশ রক্ষা করবে, শিক্ষার মান উন্নত করবে এবং মানুষের জীবনকে আরো সমৃদ্ধ করবেসেদিন কোন বিশ্ববিদ্যালয় বড় বা ছোট, সেই বিতর্ক নিজে থেকেই গুরুত্ব হারাবে। কারণ তখন যুক্তি নয়, ফলাফলই সবচেয়ে জোরালো ভাষায় কথা বলবে।

লেখক : অ্যাজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয় ও বিইউপি

জাপান : সমৃদ্ধির আড়ালে কি এক নীরব শূন্যতা

সোহেল আহমেদ

জাপান : সমৃদ্ধির আড়ালে কি এক নীরব শূন্যতা

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জাপান সফরের আগে আমি দেশটি সম্পর্কে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বই পড়েছি, ইউটিউব ডকুমেন্টারি দেখেছি, ওয়েবসাইট ঘেঁটেছি এবং জাপানফেরত বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেছি। ফলে জাপানে পৌঁছানোর আগে আমার মনে একটি বিশেষ চিত্র তৈরি হয়েছিলউন্নত প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষার হার, সুশৃঙ্খল নাগরিক জীবন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এক অনন্য দেশ।

বাস্তবে গিয়ে আমি এসবের প্রায় সবই দেখেছি। পরিচ্ছন্ন রাস্তা, সময়ানুবর্তী ট্রেন, কর্মনিষ্ঠ মানুষ, উন্নত অবকাঠামো এবং সামাজিক শৃঙ্খলা সত্যি প্রশংসনীয়। কিন্তু এর পাশাপাশি এমন একটি অনুভূতি আমাকে তাড়া করেছে, যা হয়তো অনেক পর্যটকের চোখ এড়িয়ে যায়। আমার মনে হয়েছে, জাপানের বহু মানুষের মধ্যে যেন এক ধরনের নীরব ক্লান্তি, চাপা একাকিত্ব এবং অদৃশ্য শূন্যতা কাজ করছে।

টোকিওর ট্রেনে আমি দেখেছি অফিসগামী নারী-পুরুষ। অনেকে ট্রেনে বসেই সাজগোজ করছেন, কেউ মোবাইলে ব্যস্ত, কেউ চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। তাঁদের মুখে হাসি কম, কথাবার্তা কম। একজন বাংলাদেশি হিসেবে, যেখানে মানুষ সহজে কথা বলে, হাসে এবং সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেখানে এই দৃশ্য আমার কাছে কিছুটা যান্ত্রিক মনে হয়েছে।

এক রবিবার টোকিওর একটি উন্মুক্ত বাজারে গিয়ে আমি আরো অবাক হয়েছি। শহরের শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত নাগরিকরা ছোট ছোট স্টল বসিয়ে নিজেদের তৈরি পণ্য বিক্রি করছেনকেউ কাঠের তৈরি চশমা, কেউ হাতে বানানো স্টিকার, কেউ নিজস্ব রেসিপির খাবার, কেউ শিল্পকর্ম। প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিলএটি কি অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন, নাকি জীবনের অর্থ খোঁজার একটি প্রচেষ্টা? তবে বিষয়টি একপক্ষীয় নয়। জাপান বিশ্বের অন্যতম উচ্চ সাক্ষরতার দেশ। তাদের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। হাইকু কবিতা, উপন্যাস, নাটক, শিল্পকলা এবং সংগীত আজও জাপানি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাপান থেকে নোবেলজয়ী সাহিত্যিকও এসেছে। স্কুলে সাহিত্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং বই পড়ার সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান।

তাহলে আমি যে অনুভূতি পেয়েছি, সেটি কী? আমার মনে হয়, সেটি অর্থনৈতিক দারিদ্র্য নয়, বরং আধুনিক নগরজীবনের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রতিযোগিতা, কম জন্মহার, একাকী জীবন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা অনেক মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নতি মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে পারে, কিন্তু সব সময় মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।

আমি বিশ্বাস করি, একজন প্রকৌশলী, স্থপতি, চিকিৎসক বা প্রশাসকযে-ই হোন না কেন, তাঁর সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় থাকা জরুরি। প্রযুক্তি মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু সাহিত্য মানুষকে মানুষ করে। গণিত মস্তিষ্ককে শাণিত করে, কিন্তু কবিতা হৃদয়কে জাগ্রত করে। উন্নত সমাজ গঠনের জন্য উভয়েরই প্রয়োজন।

তাই জাপান সফর শেষে আমার উপলব্ধি হলো, শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, মানুষের অন্তর্জগতের বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি তার মানুষের মনও সমৃদ্ধ হয়। তবে ন্যায়সংগতভাবে বলতে হয়, একজন বিদেশি পর্যটকের কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো জাপানি সমাজকে বিচার করা যায় না। আমি যা দেখেছি, তা আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। অন্য কেউ হয়তো একই জাপানে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। কিন্তু ভ্রমণের সৌন্দর্য এখানেইএটি শুধু নতুন দেশ দেখায় না, আমাদের নিজেদের সমাজ ও মূল্যবোধকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়।

লেখক : আলোকচিত্রী ও গণমাধ্যমকর্মী