টিভিতে খবর দেখার সময় আমাদের বসার ঘরে বেশ কয়েকজন উপস্থিত। খবরের শুরুটা হলো শিশু রামিসা ধর্ষণ ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড নিয়ে। পরের খবরটাও চট্টগ্রামের শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত। সারা দেশ আজ এসব নির্মম ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে। ছাত্র-ছাত্রী এমনকি শিশুরাও মিছিল নিয়ে প্রতিবাদে শামিল হয়েছে। টিভিতে এসব দেখে একজন মন্তব্য করল, স্মার্টফোনে অশ্লীল কনটেন্ট দেখে কিছু মানুষ বিগড়ে যাচ্ছে। আরেকজন তার কথার প্রতিউত্তর দিয়ে বলল, আরে শুধু ওটা নয়। মূল কারণটা হলো মাদক। খবরে শুনলে না, ‘রামিসাকে বাথরুমে আটকানোর আগে লোকটা ইয়াবা খেয়েছিল’!
ওদের ভাষ্য শুনে মনে হলো, তাইতো। শিশু নিপীড়ন ও হত্যার কারণগুলো তো খবরেই বলা হয়েছে। আমার কাছেও ওদের কথার যুক্তি শুনে মনে হলো, অবাধ ইন্টারনেটের অশ্লীল ভিডিও, গেম, রিল এবং অনলাইনে মাদক কেনাবেচা, মাদকের সহজলভ্যতা এসব অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী। আমাদের চিরায়ত সামাজিক মূল্যবোধকে পিষে মেরে দ্রুত পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙন সূচিত করার পেছনে পর্নো ও মাদক দৈত্য হয়ে ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে।
শিশু নিপীড়ন আজ বাংলাদেশের সমাজে সবচেয়ে আতঙ্কজনক অপরাধগুলোর একটি। প্রায় প্রতিদিন স্মার্ট ফোন বা সংবাদপত্র খুললেই কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার খবর চোখে পড়ে। এই ঘটনাগুলো শুধু আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়; এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণহীন মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের সম্মিলিত ফল।
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনাকে এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে ধরা হয় না। এটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কোথাও স্কুলছাত্রী, কোথাও মাদরাসার বালক, কোথাও প্রতিবেশীর ঘরে খেলতে যাওয়া ছোট্ট শিশু—কেউ নিরাপদ নয়। কেন মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে যে একটি শিশুকেও যৌন লালসার শিকার বানাতে দ্বিধা করছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দুটি বিষয় বারবার সামনে আসে, মুঠোফোনে সহজলভ্য পর্নোগ্রাফি এবং নিয়ন্ত্রণহীন মাদক।
একসময় অশ্লীল কনটেন্টে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট মাধ্যম বা গোপন জায়গা প্রয়োজন হতো। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। স্মার্টফোন ও সস্তা ইন্টারনেটের কারণে যেকোনো ধরনের ভিডিও, ছবি বা কনটেন্ট কয়েক সেকেন্ডে হাতের মুঠোয় চলে আসছে। একটি শিশুও আজ মোবাইল ফোনে এমন সব কনটেন্ট দেখতে পারছে, যা তার মানসিক বিকাশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। শুধু শিশু নয়, কিশোর-তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের বড় একটি অংশও নিয়মিত পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
প্রযুক্তির এই অগ্রগতি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি এর অপব্যবহার ভয়াবহ বিপদও তৈরি করেছে। অনলাইন পর্নোগ্রাফি মানুষের যৌন আচরণ ও চিন্তাকে বিকৃত করে। ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তি স্বাভাবিক বিষয় থেকে বিকৃত ও নিষ্ঠুর যৌন আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন যে অতিরিক্ত পর্নোগ্রাফি মানুষের সহানুভূতি কমিয়ে দেয় এবং অন্যকে মানুষ নয়; বরং ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে শেখায়। যখন একজন মানুষ নারীকেও মানুষ হিসেবে নয়, শুধু যৌন বস্তু হিসেবে দেখতে শুরু করে তখন শিশু পর্যন্ত নিরাপদ থাকে না।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশু ধর্ষণের অভিযুক্তরা নিয়মিত পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। তারা বিশেষ করে বিকৃত ও সহিংস যৌন কনটেন্ট দেখে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাস্তব জীবনে সেই বিকৃত কল্পনাকে প্রয়োগ করার চেষ্টা থেকেই তারা শিশুদের টার্গেট করে। কারণ শিশুরা দুর্বল, সহজে ভয় পায় এবং প্রতিবাদ করতে পারে না। এভাবে পর্নোগ্রাফি মানুষের ভেতরের পশুত্বকে উসকে দেয়। তবে শুধু পর্নোগ্রাফি নয়, নিয়ন্ত্রণহীন মাদক এই সমস্যাকে আরো ভয়ংকর করে তুলছে। ইয়াবা, আইস, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সহজলভ্য। অনেক তরুণ রাত জেগে মাদক গ্রহণের পাশাপাশি পর্নো দেখে। এই দুটি বিষ একসঙ্গে মানুষের বিবেক, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দেয়।
আজকের সমাজে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পর্নোগ্রাফি ও মাদককে অনেক তরুণ স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। বন্ধুমহল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কিছু ওয়েব সিরিজ ও অনলাইন কনটেন্ট এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করছে, যেখানে অশ্লীলতা ও নেশাকে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে অনেক কিশোর খুব অল্প বয়সেই এই জগতে ঢুকে পড়ে। প্রথমে কৌতূহল, পরে অভ্যাস, এরপর আসক্তি, এই ধাপগুলো অতিক্রম করে একজন তরুণ ধীরে ধীরে মানসিকভাবে বিকৃত হয়ে যায়।
অনেক পরিবারে বাবা-মা কর্মব্যস্ত। সন্তান ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনে কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের কনটেন্ট গ্রহণ করছে— এসবের ওপর নজরদারি নিই। শিশুর হাতে অবাধে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হলেও তার ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে খুব কম পরিবারই সচেতন। ফলে অল্প বয়সেই শিশুরা পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে চলে আসছে, যা তাদের মানসিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একদিকে পর্নোগ্রাফি যৌন বিকৃতি তৈরি করছে, অন্যদিকে মাদক আত্মনিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেক সময় সমস্যার মূল কারণ নিয়ে আলোচনা না করে শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করি। ধর্ষণের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ হয়, মৃত্যুদণ্ডের দাবি ওঠে, কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে কঠোর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ডিজিটাল মনিটরিং প্রয়োজন। শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে অশ্লীল ও সহিংস কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই হবে না; প্রয়োজনে সচেতনতাও তৈরি করতে হবে। তরুণদের বোঝাতে হবে পর্নোগ্রাফি কোনো বিনোদন নয়; এটি মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির বড় উৎস।
দ্বিতীয়ত, মাদকের বিরুদ্ধে বাস্তবিক জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হবে। শুধু ছোটখাটো বিক্রেতা নয়, বড় মাদকচক্র, সীমান্ত সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ যত দিন মাদক সহজলভ্য থাকবে, তত দিন সমাজে সহিংসতা ও যৌন অপরাধ কমানো কঠিন হবে।
তৃতীয়ত, পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তানকে শুধু দামি ফোন বা ইন্টারনেট দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার মানসিক জগৎ, বন্ধুমহল ও অনলাইন অভ্যাস সম্পর্কে জানতে হবে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা, আত্মসম্মান ও নিরাপত্তাবোধ শেখাতে হবে।
চতুর্থত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, ডিজিটাল নৈতিকতা, মাদকের ক্ষতি এবং যৌন অপরাধের ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে তারা বিপথে না যায়। আমরা সচেতন না হলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম শর্ত হলো, মাদকের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



আনুষ্ঠানিক বৈঠকটির সমাপ্তি ঘটে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করার মাধ্যমে। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

খানকে টাকা দিয়েছেন, বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে