• ই-পেপার

সমন্বিত উন্নয়নে শিক্ষা

  • ড. ছিদ্দিকুর রহমান

মূল্যস্ফীতির হার কমলেও মানুষের কষ্ট কমে না

ড. হারুন রশীদ

মূল্যস্ফীতির হার কমলেও মানুষের কষ্ট কমে না

অর্থনীতির ভাষা ও মানুষের ভাষা সব সময় এক নয়। অর্থনীতিবিদরা যখন বলেন মূল্যস্ফীতি কমেছে, তখন সাধারণ মানুষ বাজারের ব্যাগ হাতে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা বলছে অন্য কথা। কাঁচাবাজারে ঢুকলে, ওষুধ কিনতে গেলে কিংবা সন্তানের স্কুলের বেতন পরিশোধ করতে গেলে কোথাও যেন সেই প্রত্যাশিত স্বস্তির দেখা মেলে না। ফলে একটি প্রশ্ন ক্রমেই উচ্চকিত হয়, যদি মূল্যস্ফীতি কমেই থাকে, তাহলে মানুষের কষ্ট কমছে না কেন?

মূল্যস্ফীতি কমেছেএই বাক্যটি প্রায়ই ভুলভাবে গ্রহণ করা হয়। অনেকেই মনে করে, মূল্যস্ফীতি কমা মানে দ্রব্যমূল্য কমে যাওয়া। বাস্তবে তা নয়। মূল্যস্ফীতি হলো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার। অর্থাৎ গত বছর যদি কোনো পণ্যের মূল্য ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায় এবং এ বছর যদি তা ৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা হবে। কিন্তু পণ্যের দাম তো কমেনি, বরং আরো বেড়েছে, যদিও আগের তুলনায় ধীরগতিতে। এই জায়গায়ই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি মৌলিক ব্যবধান তৈরি হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ব্যবধান আরো প্রকট। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সেই চাপের বড় অংশ রয়ে গেছে। কারণ মানুষ বর্তমান দামের সঙ্গে নয়, বরং অতীতের তুলনায় বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়কে বিচার করে।

অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো প্রকৃত আয় বা রিয়াল ইনকাম। কোনো ব্যক্তির বেতন বা আয় বৃদ্ধি পেলেই তাঁর জীবনমান উন্নত হয় না, বরং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় বাড়লে তবেই প্রকৃত উন্নতি ঘটে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বহু চাকরিজীবীর বেতন কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় যে গতিতে বেড়েছে, তার সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আয়ের বৃদ্ধি তাল মেলাতে পারেনি।

বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আছে, ধনী শ্রেণির জন্য মূল্যস্ফীতি খুব বড় সমস্যা নয়, কিন্তু মাঝখানে থাকা বৃহৎ জনগোষ্ঠীটি অনেক সময় নীতিনির্ধারণের আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যায়। তাদের আয় সীমিত, কিন্তু সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত। ফলে মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করে এই শ্রেণি।

আরেকটি বিষয় হলো মানুষের অনুভূত মূল্যস্ফীতি বা পারসিভড ইনফ্লেশন। অর্থনীতির পরিসংখ্যান একটি গড় চিত্র তুলে ধরে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা গড়ে ওঠে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মূল্য দেখে। একজন সাধারণ ভোক্তা প্রতিদিন চাল, ডাল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি কিংবা রান্নার তেলের দাম দেখেন। তিনি টেলিভিশন, ফ্রিজ বা আসবাবের দাম প্রতিদিন দেখেন না। ফলে যেসব পণ্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, সেগুলোর দাম বেশি থাকলে মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক হার কমলেও মানুষ তা অনুভব করতে পারে না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খাদ্য মূল্যস্ফীতির গুরুত্ব এখানেই। উন্নত দেশগুলোতে পরিবারের মোট ব্যয়ের একটি তুলনামূলক ছোট অংশ খাদ্য খাতে ব্যয় হয়। কিন্তু বাংলাদেশে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যপণ্যের পেছনে যায়। তাই খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রায় সরাসরি আঘাত হানে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন। গত কয়েক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। জ্বালানি, ভোজ্যতেল, গম, ডাল, শিল্পের কাঁচামালসহ বহু প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে, আর সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই এসে পড়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক অস্থিরতাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। কভিড-পরবর্তী সরবরাহ সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও এসব সংকটের কিছুটা প্রশমন হয়েছে, কিন্তু সৃষ্ট মূল্যস্তর এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি।

অন্যদিকে আয়বৈষম্যের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামষ্টিক অর্থনীতির অনেক সূচক ইতিবাচক হতে পারে, কিন্তু সেই সুফল যদি সমাজের সব স্তরে সমানভাবে না পৌঁছে, তাহলে মানুষের কষ্ট কমবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়েই দেখা গেছে, সম্পদ ও আয়ের একটি বড় অংশ ক্রমেই সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশও এই প্রবণতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।

যখন অর্থনীতির একটি অংশ দ্রুত সমৃদ্ধ হয় কিন্তু বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আয় স্থবির থাকে, তখন মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরো তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ বাজারের চাহিদা ও মূল্য নির্ধারণে উচ্চ আয়ের মানুষের ব্যয়ক্ষমতা প্রভাব ফেললেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কষ্ট সেখানে প্রতিফলিত হয় না।

মানুষের কষ্ট না কমার আরেকটি কারণ হলো জীবনযাত্রার ব্যয়ের বহুমাত্রিক বৃদ্ধি। বাড়িভাড়া একবার বাড়লে সহজে কমে না। স্কুল-কলেজের বেতন একবার বাড়লে তা সাধারণত স্থায়ী হয়ে যায়। চিকিৎসা ব্যয়ও একইভাবে ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। অর্থাৎ খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও জীবনের অন্যান্য খাতের ব্যয় মানুষকে চাপে রাখে।

এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের আচরণ ও মানসিকতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরিবারগুলো সঞ্চয় কমিয়ে দেয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, প্রয়োজনীয় ব্যয়ও অনেক সময় স্থগিত রাখে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে পরিসংখ্যানগত উন্নতি ঘটলেও সেই আস্থার সংকট দ্রুত দূর হয় না।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংখ্যার অর্থনীতি ও মানুষের অর্থনীতির মধ্যে ব্যবধান কমানো। শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো নয়, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোই হতে হবে নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কৃষি ও শিল্প খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছবে না।

একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, মজুদদারি, কৃত্রিম সংকট এবং অস্বচ্ছ বাণিজ্যিক আচরণ অনেক সময় মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি ক্ষতি করে। ভোক্তারা তখন মনে করেন, অর্থনীতির নিয়ম নয়, বরং বাজারের ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলোই দাম নির্ধারণ করছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকেও আরো কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সহায়তা জোরদার করা জরুরি। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য কোনো সূচকের সাফল্য নয়, মানুষের জীবনের সাফল্য।

রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত মানুষের জীবনে স্বস্তি কতটা ফিরেছে, অনিশ্চয়তা কতটা কমেছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস কতটা বেড়েছে। কারণ অর্থনীতির শেষ গন্তব্য কোনো পরিসংখ্যান নয়, মানুষ। মূল্যস্ফীতি কমার প্রকৃত অর্থও তখনই তৈরি হবে, যখন বাজার থেকে ফিরে একজন মানুষ অনুভব করবেসংবাদপত্রের শিরোনামে নয়, তার নিজের জীবনেই সত্যি কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

অরণ্য, বন ও ফরেস্ট : শব্দের ইতিহাস, বিবর্তন ও বিতর্ক

ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান

অরণ্য, বন ও ফরেস্ট : শব্দের ইতিহাস, বিবর্তন ও বিতর্ক

মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো শুধু ভাষার অংশ নয়, বরং মানুষের চিন্তা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কের বিবর্তনের সাক্ষী। বন বা ফরেস্ট তেমনই একটি শব্দ। আজকের পৃথিবীতে বন বলতে আমরা সাধারণত গাছপালায় আচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে বুঝি। কিন্তু এই শব্দটি কি আদি কাল থেকেই সেই অর্থ বহন করত? ফরেস্ট শব্দটি কি মূলত প্রাকৃতিক অরণ্য বোঝানোর জন্য তৈরি হয়েছিল, নাকি এটি মানুষের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ ব্যবহারের ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছিল?

কৃষিভিত্তিক সভ্যতার শুরুর দিকে পৃথিবীর বেশির ভাগ ভূখণ্ডই ছিল অনাবাদি, অনিয়ন্ত্রিত এবং মানবপ্রশাসনের বাইরে। এগুলোকে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন নামে ডাকা হতোজঙ্গল, অরণ্য ইত্যাদি। এসব ভূমির মূল্য তখনো মানুষের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। কৃষি সম্প্রসারণের যুগে অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোকে অনুৎপাদনশীল বা সভ্যতার বাইরে অবস্থিত এলাকা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করল যে এই ভূখণ্ড শুধু বন্য প্রকৃতির আশ্রয়স্থল নয়, এগুলো কাঠ, জ্বালানি, শিকার, ঔষধি উদ্ভিদ, পানির উৎস এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভাণ্ডার। আর তখনই বন্য ভূমি ধীরে ধীরে ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালিত বন সম্পদ-এ রূপান্তরিত হতে শুরু করে।

ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ইংরেজি ফরেস্ট শব্দটি এসেছে পুরনো ফরাসি ভড়ত্ল্গং থেকে, যার উৎস মধ্যযুগীয় লাতিন forestis silva। সে সময় শব্দটি দিয়ে এমন এক ধরনের ভূমিকে বোঝানো হতো, যা বসতির বাইরের হলেও রাষ্ট্রীয় বা রাজকীয় আইনের অধীনে সংরক্ষিত। অর্থাৎ ফরেস্ট শব্দটি প্রথম থেকেই কোনো নির্দিষ্ট উদ্ভিদতাত্ত্বিক বা পরিবেশগত শ্রেণিকে নির্দেশ করত না, বরং এটি ছিল প্রশাসনিক ধারণা, ভূমি ব্যবস্থাপনার ধারণা। বনের ধারণা কেন বদলে গেল? আঠারো ও উনিশ শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে কাঠের চাহিদা বাড়তে থাকে। জাহাজ নির্মাণ, খনি, রেলপথ, ঘরবাড়ি, কাগজশিল্পসব ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ কাঠ প্রয়োজন হয়। এই সময় বন আর শুধু শিকারক্ষেত্র রইল না, এটি হয়ে উঠল রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সম্পদ। এর ফলে বনবিজ্ঞানের জন্ম হয়। বনকে প্রথমবারের মতো একটি উৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবে দেখা শুরু হয়। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেবনকে সংজ্ঞায়িত করা শুরু হয় তার উৎপত্তি দিয়ে নয়, বরং তার কার্যকারিতা দিয়ে।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী বনের সংজ্ঞা ব্যবহার করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও। সর্বশেষ বনকে সংজ্ঞায়িত করা হয় প্রধানত বৃক্ষ আচ্ছাদন, বৃক্ষের উচ্চতা, ভূমি ব্যবহার এবং বনভিত্তিক কার্যকারিতার ভিত্তিতে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এফএও স্পষ্টভাবে বনকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছে১. যেখানে গাছপালা মূলত প্রাকৃতিকভাবে জন্মেছে। ২. যেখানে বেশির ভাগ গাছ মানুষের রোপণ বা পরিকল্পিত বপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বনবিজ্ঞানে মানুষের লাগানো বন কোনো বিরোধপূর্ণ ধারণা নয়, বরং এটি বহু দশক ধরে স্বীকৃত।

নতুন গবেষণা কী বলছে? সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আরো সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৫ সালের গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে যে অনেক ক্ষেত্রে পুনর্জন্মশীল বন জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক প্রজাতি নির্বাচন করে পুনর্বনায়ন করলে উষ্ণমণ্ডলীয় বন দ্রুত পুনরুদ্ধার হতে পারে এবং এর কার্বন ধারণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আধুনিক বনবিজ্ঞান প্রাকৃতিক বন বনাম কৃত্রিম বন ধরনের দ্বৈত বিভাজন থেকে অনেকটাই সরে এসেছে।

২০২৫ সালে এফএও জোর দিচ্ছে বনকে একটি বৃহত্তর সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার ওপর। সেখানে বনকে শুধু গাছের সমষ্টি নয়, বরং জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু, ভূমি ব্যবহার ও মানবজীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ এতে বন শব্দটি আরো বেশি কার্যকর ও ব্যবস্থাপনাভিত্তিক ধারণায় পরিণত হয়েছে।

বনায়ন শব্দটি কি বৈজ্ঞানিকভাবে বৈধ? আন্তর্জাতিক পরিভাষা অনুযায়ী উত্তর হলো, হ্যাঁ। যদি বন শব্দটি শুধু প্রাকৃতিক অরণ্যের জন্য সংরক্ষিত হতো, তাহলে ‘afforestation’ শব্দটির অস্তিত্বই থাকত না। কারণ afforestation-এর আক্ষরিক অর্থই হলো যেখানে আগে বন ছিল না, সেখানে বন সৃষ্টি করা।

বিতর্কের প্রকৃত সমাধান কোথায়? বাস্তবিক অর্থে কোন ভূমিসত্তা বন কি না প্রশ্নটি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি কি প্রাকৃতিক বন? এটি কি পুনরুদ্ধারকৃত বন? এটি কি সামাজিক বন? বন একটি প্রাকৃতিক সত্তা, আবার মানবিক নির্মাণও। শব্দের ইতিহাস আমাদের একটি চমকপ্রদ সত্য শেখায়। ফরেস্ট শব্দটির জন্ম হয়েছিল মানুষের ভূমি ব্যবস্থাপনার ভাষা হিসেবে। পরে বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং পরিবেশচিন্তার বিকাশের সঙ্গে এর অর্থ বিস্তৃত হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে বন বলতে আমরা যেমন প্রাচীন অরণ্য বুঝি, তেমনি বুঝি পুনর্জন্মশীল বন, পুনর্বনায়নকৃত ভূখণ্ড, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা বৃক্ষ-বাস্তুতন্ত্রও। তাই বৈজ্ঞানিকভাবে অধিকতর সঠিক বক্তব্য হলো, সব বন সমান নয়, কিন্তু সব বনই যে প্রাকৃতিক হতে হবে এমন কোনো আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নেই।

লেখক : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

করুণা নয়, সুবিচারও নয়, অন্য কিছু

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

করুণা নয়, সুবিচারও নয়, অন্য কিছু

সরলভাবে বলতে গেলে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছ থেকে ব্যক্তির প্রত্যাশাটা করুণা নয়, সুবিচারও নয়। প্রত্যাশাটা হচ্ছে অধিকার। শুধু অধিকার থাকাই যে যথেষ্ট তা-ও নয়, প্রয়োজন সুযোগেরও। অধিকার সংবিধান এবং অন্যান্য কাগজপত্রে লেখা থাকতে পারে, লেখা থাকেও, কিন্তু অধিকার পাওয়ার ও ব্যবহারের সুযোগ যদি না থাকে, তাহলে ওসব তো শুকনা কথার কথা মাত্র। আর করুণা? করুণা তো তখনই দেখানোর সুযোগ ঘটে, যখন পাত্র থাকে করুণা গ্রহণের, নইলে নয়। ভিক্ষুক না থাকলে ভিক্ষাবৃত্তির প্রয়োজনটা কী? এবং ভিক্ষাদানের কাজটা দাতার পক্ষে আত্মতৃপ্তির ঘটনা হতে পারে ঠিকই, হয়ও বটে, কিন্তু ভিক্ষুকের জন্য ব্যাপারটা মোটেই লজ্জাজনক নয়। সুবিচারের আবশ্যকতার কথাও সাড়ম্বরে শোনা যায়। সুবিচার অর্থ হতে পারে করুণা, নয়তো আইনের যথাযথ প্রয়োগ, যাকে বলা হয়ে থাকে আইনের শাসন। কিন্তু বৈষম্যমূলক সমাজে আইনের শাসন তো সব সময়ে শক্তিশালীর পক্ষেই যায় এবং কাজ করে দুর্বলের বিপক্ষে। আইন নিজেও বিত্তবানের বিত্ত রক্ষার জন্যই তৈরি হয়েছে, বিত্তহীনের স্বার্থ তার দেখার কথা নয়, সেটা সে দেখেও না। তাই প্রত্যাশা বলতে যা বুঝি, সেটা হলো অধিকার ও সুযোগের সাম্য। দেশ থেকে দরিদ্রকে নির্বংশ করার কথা কেউ কেউ বলেন, কেউ আবার আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে ঘোষণা করেন, দেশে কোনো ভিক্ষুক থাকবে না, অর্থাৎ কিনা ভিক্ষাবৃত্তিই উঠে যাবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থাটার কী হবে, যে ব্যবস্থায় কেউ করুণা করে, অন্যরা করুণার প্রত্যাশা করতে থাকে, কেউ ভিক্ষা দিলেও দিতে পারে এবং অন্যরা ভিক্ষার আশায় হাত পেতে বসে থাকে?

আমাদের প্রত্যাশা সব সময়েই এ রকমের ছিল এবং এখনো তা অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে, সেটা হলো যে ব্যবস্থাটা বদলাবে এবং মানুষে-মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, কিন্তু সেটা তো ঘটছে না।

অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছে, সেগুলোকে সাফল্য বলার কোনো সুযোগ নেই; সরকার তো বদলাচ্ছেই, এমনকি রাষ্ট্রও একাধিকবার ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে গেল। কিন্তু কই ভেতরের ব্যবস্থাটা তো বদলাল না। আর সেটা যদি না বদলায়, তাহলে ওপরের সবকিছুই, তা সেগুলো যে আকারের বা গুরুত্বের হোক না কেন, যতই বদলাব না কেন, তাতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। মূল সমস্যাটা হলো ওইটাই।

করুণা নয়, সুবিচারও নয়, অন্য কিছুঅনেক কিছুই বদলেছে, আরো বদলাবে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের যে সমাজকাঠামো, সেটা তো বদলাচ্ছে না। সেখানে ভিক্ষাদাতার সংখ্যা যতই হোক, ভিক্ষুকের সংখ্যা অনেক। আর এই মানুষজনের কেউই ইচ্ছা করে ভিক্ষুক হয়নি। বাধ্য হয়েই ভিক্ষুক হয়েছে। আর সাধারণ মানুষের কথাই বা আলাদা করে বলি কেন, আমাদের ধনীরাও ভিক্ষুকই, তদবির করে, তোষামোদে ক্লান্ত হয় না; আমাদের সরকারও তো ভিক্ষার হস্ত প্রসারিত করেই রেখেছে দাতা, সাহায্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদির কাছে। বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থাই হচ্ছে নদী, তার স্রোতই নানা খাল, বিল, জলাশয় ও পুকুরে গিয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সামাজিক বৈষম্যের নদী শুকাবে কী, দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠেছে।

এই যে এক নদীর শুকানো, আরেক নদীর স্ফীতি, এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যাপার এবং বলা বাহুল্য, আমরা এই বিপদের মধ্যেই রয়েছি। প্রত্যাশাটা হলো প্রাকৃতিক নদী বেগবান ও গভীর হবে, সামাজিক বৈষম্যের নদী দুর্বল হয়ে পড়বে। সামাজিক জীবনে যে মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে না, তার লক্ষণ কী? অনেক লক্ষণ রয়েছে, প্রমাণও বিস্তর। সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে বেকার সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তো তেমন কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কর্মসংস্থান বাড়ছে না। বেকার ও অর্ধবেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের এই আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবেই বিনিয়োগবিরোধী। এ রাষ্ট্রে লোকেরা চাকরি চায়, সেবক হতে পছন্দ করে, ক্রেতা হতে পারলে ভয়ংকর খুশি হয়।

আমলাতন্ত্রের লোকেরা বিনিয়োগকারীকে দেখলে ভাবে, নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষটাকে যতটা পারা যায় জব্দ করবে, জব্দ করে তোষামোদ তো অবশ্যই, সম্ভব হলে ঘুষ আদায় করবে। বিনিয়োগকারী ব্যাংকে যাবে, দেখবে সেখানেও আমলাতন্ত্র তার জন্য ওত পেতে বসে রয়েছে। ক্লান্ত, বিরক্ত এবং কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে সে তখন রণে ভঙ্গ দেবে।

বিদেশ থেকে লোকে প্রচুর টাকা পাঠায়। তারা আরো পাঠাতে প্রস্তুত রয়েছে, কিন্তু সে টাকা যে পুঁজি হয়ে বিনিয়োগে খাটবে, তেমনটা ঘটে না। ঘটছে না। টাকা বড়জোর দালানকোঠা, দোকানপাট এবং বিভিন্ন ধরনের অনুৎপাদক কাজে হারিয়ে যাচ্ছে, হয়তো অনেকটা নিষ্ক্রিয়ভাবেই পড়ে থাকছে ব্যাংকে। আবার বিদেশে পাচারও হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা অবশ্যই এ রকমের যে প্রবাসীদের পাঠানো টাকা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হোক। এবং সে জন্য রাষ্ট্র যতভাবে পারা যায় বিনিয়োগকে সহজ, সম্ভব ও লাভজনক করে তুলুক। সমস্যাটা অর্থনৈতিক তো অবশ্যই, কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রাজনীতি। প্রত্যাশাটা হলো এই রাজনীতিতে পরিবর্তন আসুক, কিন্তু সেটা আসবে কি? কেনই বা আসতে যাবে, হঠাৎ করে?

বাংলাদেশ যে স্বাধীন হয়েছে, সেটা ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলেই। নইলে এখনো সে পাকিস্তানের অংশই থেকে যেত। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর নানা ক্ষেত্রে আমাদের যে অর্জন, সেও আন্দোলনের কারণেই বটে। গ্যাসক্ষেত্রগুলো বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া, উন্মুক্ত কয়লাখনি স্থাপন করাএসব ব্যাপারে সরকারি মহলে নানা ধরনের জনস্বার্থবিরোধী তৎপরতা চলছিল। সেগুলো বাধাগ্রস্ত যে হয়েছে তার কারণ জন-আন্দোলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন বাণিজ্যচুক্তি এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তির পক্ষে দক্ষিণ পন্থার রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার সংবাদও ফাঁস হয়েছে। দেশের স্বার্থবিরোধী ওই গোপন চুক্তির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষুব্ধতার প্রকাশ ঘটেছে। হয়তো সামনে আরো ব্যাপকভাবে ঘটবে।

কিন্তু আমরা যেমন উদারনৈতিক ও তাৎক্ষণিক আন্দোলনে সন্তুষ্ট থাকব না, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন ইস্যু নিয়ে গড়ে ওঠা বড় আন্দোলনকেও যথেষ্ট মনে করব না, আমরা চাইব সুসংগঠিত, ধারাবাহিক ও ক্রমসম্প্রসারণশীল গণ-আন্দোলন। কেননা ওই পথে এবং শুধু ওই পথেই রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভবপর।

আন্দোলন যে হয়নি, তা তো নয়। অবশ্যই হয়েছে। আন্দোলন জাতীয়তাবাদীরা করেছেন, বামপন্থীরাও করেছেন। জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেয়েছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সীমানাটা মোটেই অস্পষ্ট নয়, তারা দলের স্বাধীনতার ব্যাপারে নেতৃত্ব দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু তার পরের যে কাজ, রাষ্ট্র ও সমাজকে রূপান্তর করার যে দায়িত্ব, সেটা তারা পালন করতে পারে না। এর প্রধান কারণ অবশ্য এই যে রূপান্তর তারা চায় না। তাদের লক্ষ্য ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটানো। অর্থাৎ কিনা ক্ষমতা বিদেশিদের হাতে না থেকে তাদের হাতে চলে আসুকএটাই তাদের লক্ষ্য ছিল। ব্রিটিশ আমলের জাতীয়তাবাদী নেতারা যা চেয়েছেন, পাকিস্তান আমলের জাতীয়তাবাদী নেতারাও তার চেয়ে ভিন্ন কিছু চাননি। জনগণ তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। কেননা জনগণ মুক্তি চেয়েছে, যে মুক্তি ক্ষমতার হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে আসবে, এমনটা কখনোই সম্ভব ছিল না; মুক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল সামাজিক বিপ্লবের। জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বকে অভিযুক্ত করে লাভ নেই। তাদের দিক থেকে তারা ততটুকুই করেছে, যতটুকু তাদের করার কথা ছিল। জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতা পেয়েই সন্তুষ্ট থাকেন না, ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে চান। যে জন্য তাঁদের আচরণ এমনকি ফ্যাসিবাদের আকারও ধারণ করে। তাঁরা একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন এবং ক্ষমতা দখল করা ও দখলে রাখার তৎপরতাটাই পরিণত হয় দেশের মূল রাজনীতিতে। এতে বিস্ময়ের কোনো ব্যাপারই নেই।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পরিবেশ আদালত আইন কেন সংশোধন প্রয়োজন

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

পরিবেশ আদালত আইন কেন সংশোধন প্রয়োজন

পরিবেশসংক্রান্ত বিচার ত্বরান্বিত করার জন্য পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ নামের একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী পরিবেশ আইন বলতে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার কর্তৃক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো আইন বা এই সব আইনের অধীনে প্রণীত বিধিমালা বোঝাবে। পরিবেশ আদালত বলতে এই আইনের অধীনে গঠিত পরিবেশ আদালতকে বোঝাবে।

এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা প্রতিটি জেলায় এক বা একাধিক পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। প্রতিটি পরিবেশ আদালত জেলা সদরে উপস্থিত থাকবে। কোনো জেলায় একাধিক পরিবেশ আদালত থাকলে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এলাকা নির্ধারণ করে দেবে। এই আইনের বর্ণিত সব অপরাধের জন্য মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারবেন। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা এর অংশবিশেষ, যানবাহন বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যসামগ্রী বা বস্তু বাজেয়াপ্ত বা বিলিবন্দোবস্ত করার আদেশ দিতে পারেন। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের তলব অনুসারে উপস্থিত কোনো মামলার সাক্ষীকে তাঁর সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যতিরেকে ফেরত বা ছাড় দেওয়া হবে না। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ গঠনের তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচারকাজ সমাপ্ত করবে। পরিবেশ আইনে অপরাধসংক্রান্ত বিষয় পরিদর্শন করবেন একজন পরিদর্শক। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড বা কোনো কিছু বাজেয়াপ্ত বা বিনষ্ট করার আদেশ প্রদান করতে পারেন।

পরিবেশ আদালত আইন কেন সংশোধন প্রয়োজন সম্প্রতি বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করে। ওয়েবিনারে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বিদ্যমান পরিবেশ আদালত আইন সংশোধন করার ওপর জোর দেন। তাঁদের মতে, পরিবেশ আইন প্রয়োগে একটি পরিবেশ ফোর্স ইউনিট গঠন প্রয়োজন। পরিবেশদূষণকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ব্যবস্থা রাখা, সরকারি প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন এই আইনের সংশোধন। তাঁদের মতে, পরিবেশ আদালতে সরাসরি মামলা করার অধিকার না থাকাটা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।

পরিবেশ আদালত আইনের এসব অবস্থানের কারণেই মামলা হচ্ছে কম। একটি তথ্য মতে, ঢাকার মূল পরিবেশ আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা আট হাজার ২৩১। এর মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে মামলা হয়েছে মাত্র ১৩২টি। এর অর্থ ৯৮ শতাংশ মামলাই অন্য মামলা। গত ২৩ বছরে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার পর মামলা হয়েছে মাত্র ৫৯২টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৪৭৬। এই তথ্য দেখলে মনে হয়, বাংলাদেশে তেমন পরিবেশদূষণই হয় না। মামলা আর হবে কি। কিন্তু বাস্তবতা আরো ভয়ংকর। বায়ুদূষণ বা শব্দদূষণের  পাশাপাশি নদী বা জলাশয় দূষণের অবস্থা ভয়াবহ।  

বাংলাদেশে বায়ুদূষণে প্রতিবছরে মারা যায় ৮০ হাজার মানুষ। এতে বাড়ছে বিষণ্নতা। বায়ুদূষণের কারণে জিডিপির ৪ শতাংশেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস সময় পর্যন্ত দূষণের মাত্রা এত বেশি থাকে, যা সারা বছরের প্রায় ৬৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের আরো একটি তথ্য মতে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণ জনিত সমস্যায় ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা গেছে। 

স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার কোয়ালিট ফান্ডিং ২০২৩-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বায়ুর গুণগত মানোন্নয়নের তহবিলপ্রাপ্তিতে তৃতীয় ছিল বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বায়ুর মানোন্নয়নে বাংলাদেশ ২.৪ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ বায়ুদূষণ মোকাবেলায় তেমন একটি অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির বাজার এক বিলিয়ন ডলারের। প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। ঢাকায় প্রতিদিন এক কোটি ২০ লাখ পলিব্যাগের বর্জ্য ফেলা হয়। প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছেই। বাংলাদেশে ২০০৫ সালে এর বার্ষিক মাথাপিছু ব্যবহার ছিল তিন কেজি। এটি বেড়ে ২০২০ সালে হয়েছে ৯ কেজি। অর্থাৎ ১৫ বছরে বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে তিন গুণ।  বাংলাদেশে প্রতিদিন তিন হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ঢাকায় প্রতিদিন ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। ঢাকার মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের ৩৭.২ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের ৬০ শতাংশ মেশে রাস্তাঘাট আর নদীতে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, আমাদের দেশে প্রতিবছর আট লাখ ২১ হাজার ২৫০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য হয়। এর মাত্র ৪০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ দুই লাখ ২৮ হাজার টন পুনর্ব্যবহার করা হয়, আর বাকি অংশ পরিবেশেই থেকে যায়।

পলিথিনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি অনেক। চোখ জ্বালা করা, শ্বাসকষ্ট, লিভারের সমস্যা, ক্যান্সার, চর্মরোগ থেকে শুরু করে অনেক ক্ষতিকর রোগের জন্য দায়ী। আমরা বাজারে গেলে পলিথিনে করেই সবকিছু নিয়ে আসি। এমনকি বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যও। অথচ পলিথিনে মোড়ানো এসব খাবারই খাদ্যে বিষক্রিয়ার জন্য দায়ী। মাছ-মাংস পলিথিন ছাড়া আমরা রাখি না। কিন্তু পলিথিনে মাছ-মাংস প্যাকিং করলে অবায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়। প্লাস্টিকের বর্জ্য মাইক্রো ও ন্যানো কণারূপে মানুষের শরীরে ঢুকে হরমোনজনিত নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদন ব্যাহত করছে। ক্যান্সারসহ ত্বকের নানা রকম রোগ সৃষ্টি করছে।

জীবজগতের ৮০ শতাংশের বসবাস বনে। প্রায় ৬০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের আবাসস্থল এই বন। এ ছাড়া উভচর প্রজাতির ৮০ শতাংশ, পাখি প্রজাতির ৭৫ শতাংশ এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রজাতির ৬৮ শতাংশের বসবাস বনে। কিন্তু ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে যাচ্ছে এসব বন। এফএও-এর মতে, বিশ্বব্যাপী ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল নাগাদ প্রায় ১.৪ শতাংশ বন হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশে বেশির ভাগ বন ধ্বংস হচ্ছে দখলের মাধ্যমে। বন বিভাগের তথ্য মতে, সারা দেশে দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বন দখলে চলে গেছে। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গড়ে ২৫ হাজার একর বনভূমি দখল হয়েছে। এসব বন ধ্বংসের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী। এ ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর নেচার কনজারভেশনের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ৩১। এক হাজার ৬০০ প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি হুমকির মধ্যে রয়েছে। আর ৫০টির বেশি প্রজাতি ঝুঁকিতে রয়েছে। আইইউসিএনের ২০০০ ও ২০১৫ সালের প্রতিবেদন তুলনা করলে দেখা যাবে এই বিলুপ্তির হার অত্যধিক। ২০০০ সালে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ছিল ১৩। অর্থাৎ ১৫ বছরে ১৮টি প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা ভয়াবহ বিলুপ্তির হারকে নির্দেশ করছে।

ভয়াবহ বায়ুদূষণের তিনটি প্রধান কারণের একটি ইটভাটা। বাংলাদেশে যত্রতত্রই ইটভাটা রয়েছে। একটি তথ্য মতে, এর সংখ্যা প্রায় আট হাজার। আর এর অর্ধেকই অবৈধ। অবৈধ ইটভাটা বন্ধে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর  বাংলাদেশ উচ্চ আদালতে বেশ কয়েকটি রিট করেছে। এতে কিছুটা সফলতা এলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। ইটভাটার কারণে শুধু বায়ুদূষণই হচ্ছে না। ইট তৈরির জন্য মাটির প্রয়োজন পড়ে। ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ইট তৈরি করা হচ্ছে। ফসলি ক্ষেতের মাটির ওপরের অংশেই মূলত সার থাকে। কৃষকরা না বুঝে মুনাফার লোভে মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে ফসলি জমির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে হাজারেরও বেশি ইটভাটা রয়েছে, যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হয়। এতে অসংখ্য কাঠের প্রয়োজন পড়ে, যা গাছ কেটে তৈরি করা হয়। ইটভাটার জন্য এভাবে অসংখ্য গাছ কাটার কারণে পরিবেশের ওপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে।

যে হারে দূষণ বাড়ছে, ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে; সে হারে পরিবেশ মামলা নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় বিদ্যমান পরিবেশ আইন সংশোধন জরুরি। বিশেষ করে পরিবেশ মামলা করার অধিকার অবশ্যই প্রত্যেক নাগরিককে দেওয়া উচিত। কেননা পরিবেশ অধিকারও এখন এক ধরনের মানবাধিকার।

লেখক : পরিবেশবিষয়ক লেখক

সমন্বিত উন্নয়নে শিক্ষা | কালের কণ্ঠ