kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

জনবিচ্ছিন্নতা কাম্য নয়

এ কে এম শাহনাওয়াজ

১৩ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জনবিচ্ছিন্নতা কাম্য নয়

আমাদের দেশে এত অঘটন ঘটে থাকে যে কোনো একটি ঘটনা আলোচনার তুঙ্গে ওঠার আগেই তামাদি হয়ে যায়। কিন্তু কোনো কোনো ঘটনা স্মরণে রাখা দরকার। না হলে ভবিষ্যতের ভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। কারো জানতে বাকি নেই যে ঈদ-পূর্ব ঢাকায় একটি অদ্ভুত অপ্রয়োজনীয় ঘটনার মঞ্চায়ন হয়েছিল ধানমণ্ডির তেঁতুলতলা ‘মাঠ’ ঘিরে।

বিজ্ঞাপন

এই নাটক শুধু দেশবাসী নয়, বিশ্বের অনেকেই অবলোকন করেছে। অঘটনের কশাঘাতে পিষ্ট স্থানীয় শিশু-কিশোর আর তাদের অভিভাবক। তাদের রক্ষায় বিবেক হিসেবে এগিয়ে এসেছিলেন বিভিন্ন ব্যানারের নাগরিক সমাজের মানুষ। কয়েক দিনের মহড়ায় অসহায় দৃষ্টিতে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল কিছু যুক্তিহীন নিম্নমানের অপতৎপরতা।

সাম্প্রতিক জরিপ ফলাফলে ঢাকা দিল্লিকে টপকে অল্পের জন্য বিশ্বের এক নম্বর দূষিত নগরী হতে পারেনি। চ্যাম্পিয়নের মুকুট পাওয়ার জন্য আমাদের প্রশাসন যে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে তা স্পষ্ট হয় তেঁতুলতলা মাঠ ঘিরে কিছুদিনের শোডাউন ও প্রশাসনিক দায়িত্বশীলদের অপ্রয়োজনীয় ও তাৎপর্যহীন বক্তব্যে। পরিসংখ্যান মতে, জনসংখ্যা অনুপাতে যেখানে ঢাকা শহরে কমপক্ষে আড়াই হাজার মাঠ-পার্ক বা খোলা চত্বর থাকার কথা, সেখানে আড়াই শও টিকে নেই। এর অনেকগুলো আবার সংকুচিত হয়ে গেছে। অনেকগুলো রয়েছে দখলদারদের দখলের হুমকিতে। এমন অবস্থায় নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় দেশের সরকারেরই ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু যুগ যুগ ধরে এ দেশের সরকারগুলো খাল দখল, নদী দখল আর মাঠ দখলের মতো মহা-অপকাণ্ডে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে। কখনো কখনো সরকারপক্ষই দখলদারের ভূমিকায় নেমেছে। এরই ধারাবাহিকতা যেন দেখতে হলো তেঁতুলতলা মাঠকাণ্ডে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক মমতায় শেষ রক্ষা করতে ভূমিকা রেখে সংকটের বরফ গলিয়েছিলেন। কিন্তু এর আগে মাঠ রক্ষায় সমাবেশ চলেছে, চলছে প্রতিবাদী আলোচনা, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় প্রবোধ দিয়েছিলেন নতুন জায়গা খোঁজা হচ্ছে থানা ভবন নির্মাণের জন্য। পাওয়া গেলে থানার জায়গা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু যখন দেখা গেল একদিকে প্রত্যাশার আলো জ্বালানো হচ্ছে, অন্যদিকে নির্মাণকাজ চলছে, তখনই বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এ সময়ই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। এ দেশের যেকোনো সমস্যা যেহেতু সংশ্লিষ্ট দপ্তর সমাধান করতে পারে না, তাই মানুষ শেষ আশ্রয়স্থল ভেবে রাখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ। এবারও তাই প্রত্যাশিত ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই আসবে। সব শেষে বঙ্গবন্ধুকন্যাকেই এগিয়ে আসতে হলো উদারতা নিয়ে। তিনিই যেন বুঝতে পারলেন ছোটদের জন্য মাঠ থাকার গুরুত্ব। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই শিশু ও এলাকাবাসীর সামনে যেন ঈদের উপহার নিয়ে এলেন। জানিয়ে দিলেন এই মাঠ যেমন ছিল তেমন থাকবে। এখানে শিশুরা খেলবে। এলাকাবাসীর সামাজিক কাজ সম্পন্ন হবে। অতিরিক্ত পাওনা হলো পুলিশ বন্ধুর মতো মাঠের দেখভাল করবে। এটি নিশ্চয় একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

এভাবে মধুর সমাধান হলেও কতগুলো প্রশ্ন থেকে যায়। কংক্রিটের বস্তির মাঝখানে এই একচিলতে খোলা জায়গা ছিল স্থানীয় শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ, তরুণ আর প্রবীণদের প্রাতর্ভ্রমণ ও সান্ধ্য ভ্রমণের জায়গা। ছোটখাটো সামাজিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ তৈরির স্থান। ঈদের নামাজ পড়া আর মৃতের জানাজা পড়ার ঠিকানা। অনেক দিন থেকেই এসব কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল মাঠটি। এসব তো অজানা থাকার কথা নয়। তাহলে সাধারণ মানুষের এবং শিশু অধিকারের মানবিক বিষয়টি আমলে না এনে পুলিশ প্রশাসনের এখানেই কেন থানা ভবন নির্মাণ করতে হবে, তা আমাদের বোধগম্য হয়নি। আমলারা তো বরাবরই হুকুমবরদার। তাই জেলা প্রশাসক মাঠ বন্ধ করে খাসজমির অজুহাতে কিভাবে জমি বরাদ্দ দিলেন থানা করার জন্য সে প্রশ্ন করা নিরর্থক। বড় অঙ্কের টাকায় কেন থানা করার জন্য মাঠ কেনা হলো—এ বিষয়গুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাবনার কোনো বিষয় মনে হয়েছিল কি না আমরা জানি না।

আমরা লক্ষ করেছি, সরকারি শক্তি যখন দাপুটে হয় আর সব প্রতিষ্ঠানে যখন দলীয়করণের অসুুস্থ প্রবণতা কার্যকর থাকে তখন সুস্থ চিন্তা কাজ করে না। এ প্রবণতার বাস্তবতায় ঢাকা শহরের অনেক মাঠ আর শিশুদের জন্য উন্মুক্ত নেই। স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তিমানরা নানা উপলক্ষে গ্রাস করছে। ১০ লাখের ওপর মানুষের বাস ঢাকা শহরে। প্রতিদিন এ সংখ্যা বাড়ছে। কার্যকর মাঠের সংখ্যার সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাত যুক্ত করার কোনো সুযোগই নেই। ঢাকা সিটি করপোরেশনের অধীনে ১২৯টি ওয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠই নেই। বাকিগুলোতে মাঠের অস্তিত্ব থাকলেও এর অনেকগুলো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলে। কোথাও বাণিজ্যের পসরা বসেছে। কোনোটি গাড়ি রাখার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহে গেণ্ডারিয়া গিয়েছিলাম। ঐতিহাসিক ধূপখোলা মাঠের দুর্দশা দেখে দুঃখ পেলাম। একসময় এই মাঠ ছিল ক্রীড়া ও সংস্কৃতি চর্চার পীঠস্থান। উনিশ শতকে এই মাঠে প্রতি ঈদুল ফিতরের বিকেলে কত্থক নাচের মঞ্চ তৈরি হতো। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন ইস্ট এন্ড ক্লাবের মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই মাঠটি। পরবর্তী সময়ে এই বিশাল মাঠকে তিনটি মাঠে রূপান্তর করা হয়। এক অংশে ইস্ট এন্ড ক্লাবের মাঠ, আরেক অংশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ আর বাকি অংশে সাধারণের ব্যবহার করা মাঠ। খেলাধুলা ছাড়াও সকাল-বিকাল স্থানীয় মহল্লাগুলোর নারী-পুরুষ অনেকেই হাঁটাহাঁটি করতেন। এখন চারদিক ঘেরাও করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মযজ্ঞ চলছে। মাঠ দখল করে তৈরি হচ্ছে বিশাল শপিং মল। অনেক প্রতিবাদের পর একটুখানি মাঠের অংশ রাখা হয়েছে। ভাবখানা এমন যে যেভাবে পারো এখানে মিলেমিশে খেলাধুলা এবং হাঁটাহাঁটি করতে পারো।

এসব দেখে আমার রাজনৈতিক কমিটমেন্টের দুর্দশার কথা মনে হলো। এ দেশের রাজনৈতিক নেতারা একটি শব্দযুগল আমাদের উপহার দিয়েছেন। তা হচ্ছে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’। আমি এর সরল অর্থ করেছি—‘মিছে কথা’। নেতাদের যে কথাগুলো  বিতর্কিত, যা বলেন তা বিশ্বাস থেকে বলেন না, তাকে নিজেরাই ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ নাম দিয়ে দায় সারিয়ে নেন। তাই যখন মঞ্চ কাঁপিয়ে বলেন তাঁরা নগরীর পরিবেশ রক্ষা নিয়ে কাজ করছেন, শিশু-কিশোরদের মানসিক-শারীরিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠ-পার্ক করে দিচ্ছেন। আর কার্যত উল্টো পথে হাঁটছেন, তখন বুঝতে হবে এগুলো তাঁদের ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’।

এর সমিল সাম্প্রতিক একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। দলীয়করণের দুর্যোগে নানা বিশেষজ্ঞ কমিটিও হয়তো হয় দলীয় দৃষ্টিতে। তাই মাঝে মাঝে সংকটে পড়তে হয়। এ কারণে হঠাৎ কাগজে একটি সিদ্ধান্ত দেখে হোঁচট খেতে হয়েছিল। যেখানে বিশ্বের সব সভ্য দেশে তাঁদের ন্যাশনাল কারিকুলামে স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত অন্তত নিজ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য চর্চা আবশ্যিক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে, সেখানে আমাদের কারিকুলামে স্কুল পাঠ্যসূচিতে ইতিহাস পাঠ সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। ইতিহাস নামে আলাদা কোনো বই থাকছে না। সমাজবিজ্ঞানের ভেতর মাত্র ১৫ নম্বরের ইতিহাস পাঠের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথমে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছি। পরে যখন জানলাম এই সিদ্ধান্ত নাকি সরকার কার্যকর করতে যাচ্ছে, তখন চট করে এগারো-বারো শতকের সেন রাজাদের কথা মনে হলো। এই বিদেশি শাসকরা বাঙালির প্রতিবাদী শক্তিকে আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ করেছিল। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি যাতে প্রতিবাদী হতে না পারে তাই বাঙালির জ্ঞানচক্ষু বন্ধ করে দিতে চাইল। এই লক্ষ্যে বাংলা চর্চা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। এখন কেন দেশীয় শাসকরা বাঙালিকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানা থেকে বিরত করতে চাইছেন বুঝতে পারলাম না।

বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, ইতিহাস একাডেমি ও ইতিহাস সমিতির নেতৃবৃন্দ আমরা এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন সহজেই। তাই ১০ মিনিটেই সভা শেষ করে দিলেন। জানালেন যেমন ছিল ইতিহাস তেমনই থাকবে। এও বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ইতিহাসের প্রতি সংবেদনশীল। আমরা খুশি মনে চলে এলাম। কিন্তু পরে হতাশার সঙ্গে বুঝতে পারলাম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের এটি ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য। অবশ্য এর মধ্যে যদি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে আমি আমার বক্তব্য ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত।

আমাদের দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। এভাবে জনস্বার্থবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্ত একে একে ক্ষমতার দাপটে বাস্তবায়িত হতে থাকলে একসময় হতাশ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। সরকার ও সরকারি যন্ত্রসমূহের প্রতি আস্থার সংকট কখনো স্বস্তিদায়ক হতে পারে না। যেখানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার সাধারণ মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধনে ভূমিকা রাখবে সেখানে সরকারি সিদ্ধান্ত যদি মানুষের কল্যাণ হরণ করে তখন স্বাভাবিকভাবে সরকারের প্রতি বিরাগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আমরা কখনোই চাইব না সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাক।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা