কোনো সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের সাফল্য শুধু কতগুলো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, কত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে কিংবা কতগুলো যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে—এসব দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি সফরের প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় সেই সফরসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কৌশলগত অগ্রাধিকার, পারস্পরিক প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথকে কতটা স্পষ্ট করে, তা থেকেও।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরও ঠিক তাই। এই সফর ঘিরে নানা ধরনের মূল্যায়ন হচ্ছে, হবেও। কেউ একে অর্থনৈতিক সাফল্য বলছেন, কেউ কূটনৈতিক অর্জন, আবার কেউ আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিচার করলে সফরটি তিনটি সমান্তরাল বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রথমত, চীন নিশ্চিত করেছে যে বাংলাদেশ তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবেই থাকবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আস্থার সংকেত খুঁজছিল, এই সফর তা অনেকাংশে এনে দিয়েছে। আর তৃতীয়ত এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশ নিজেই এখন একটি নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি। কারণ প্রতিশ্রুতি আদায় করা যত সহজ, তা বাস্তবায়নের পরিবেশ তৈরি করা ততটাই কঠিন।
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। দ্বিপক্ষীয় গতিপথে কোনো পরিবর্তন আনা নয়। চীন সেটি পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করেছে এবং সফলতার সঙ্গে অর্জনও করেছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঐতিহাসিক ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্পাঞ্চল, বন্দর, সেতু, যোগাযোগ—প্রায় প্রতিটি বড় উন্নয়ন খাতে চীনের উপস্থিতি ক্রমাগত বেড়েছে। এই সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য হলো, বেইজিং সাধারণত সরকার পরিবর্তনের চেয়ে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ চীন বিএনপিকে ‘সমর্থন’ দেয়নি, বরং বাংলাদেশকে তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবেই পুনরায় নিশ্চিত করেছে।
এই বিষয়টি আমাদের পণ্ডিত ও নীতিনির্ধারকদের পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকে সফরটিকে বিএনপির প্রতি চীনের রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবে চীন ব্যক্তি বা দল নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। ফলে নতুন বিনিয়োগ, ঋণ প্রতিশ্রুতি এবং নতুন সমঝোতা স্মারকগুলো মূলত এই বার্তাই দেয় যে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক অব্যাহত রাখাই বেইজিংয়ের অগ্রাধিকার। তবে এটিও সত্য যে এই ধারাবাহিকতাই বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জনে পরিণত হয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিকে স্পষ্ট বা প্রচ্ছন্নভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেটি হলো বিএনপি সরকার কতটা গ্রহণযোগ্য, কতটা স্থিতিশীল এবং বড় শক্তিগুলো তার সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে কতটা আগ্রহী।
চীন সফরকালে তারেক রহমানের সরকারের প্রতি বেইজিংয়ের উচ্চ পর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা এবং উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রতিশ্রুতি সেই প্রশ্নের অন্তত আংশিক উত্তর দিয়েছে। বিনিয়োগের অঙ্ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর রাজনৈতিক বার্তা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি এক ধরনের আস্থার বার্তা বহন করে। অর্থাৎ একটি বড় শক্তি বর্তমান সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রস্তুত। এটি বিএনপির জন্য নিঃসন্দেহে একটি কূটনৈতিক সাফল্য। কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে নতুন বাস্তবতা।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। কিন্তু এই সফরের পর সেই চ্যালেঞ্জ অনেকটাই বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই বিনিয়োগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা ও ব্যাবসায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে? এই অর্থে বলা যায়, সফরটি চীনের জন্য যতটা সুযোগ সৃষ্টি করেছে, বাংলাদেশের জন্য ততটাই পরীক্ষা তৈরি করেছে। চীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব এখন বাংলাদেশের।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের ওপর চাপ, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বাস্তব বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। চীন বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, কিন্তু সেই বিনিয়োগ টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতার ওপর। তিস্তা ইস্যুও এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে।
সফরের আগে অনেকেই আশা করেছিলেন, তিস্তা প্রকল্পে বড় ধরনের কৌশলগত ঘোষণা আসবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সমঝোতা স্মারকের সীমার মধ্যেই রয়ে গেছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে চীন অত্যন্ত সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেছে। বেইজিং কোনোভাবেই এই প্রকল্পকে ভারতবিরোধী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়নি। অর্থাৎ চীন নিজেই ভারতকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে উসকে দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিস্তা শুধু একটি নদী ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, এটি বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিএনপি ও তাদের সমর্থকমহলের একটি বড় অংশ ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে এসেছে। তিস্তা, সীমান্ত, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য—এসব ইস্যু সেই রাজনৈতিক বয়ানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে ভারতও গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই নতুন কোনো ইস্যু সামনে চলে এসেছে। কখনো সীমান্ত, কখনো রাজনৈতিক বক্তব্য, কখনো সংখ্যালঘু প্রশ্ন, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি—একটি সমস্যা শেষ না হতেই আরেকটি সামনে চলে আসছে।
ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনেকটা ইংরেজিতে যাকে বলে ‘হোয়্যাক আ মোল’ খেলায় পরিণত হয়েছে! একটি সংকট সামলাতে না সামলাতেই আরেকটি সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় চীনের উপস্থিতি, চীনের বাড়ন্ত বিনিয়োগ ও বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন খাতে আরো গভীর সংযোগ ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ আরো বাড়াবে—এটিই স্বাভাবিক। তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত দিকটি অন্যত্র। বাংলাদেশ এরই মধ্যে এমন কিছু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও সমঝোতায় যুক্ত হয়েছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক কৌশলগত বোঝাপড়ার, যা ভবিষ্যতে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক পরিচালনাকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।
ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনীতি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও সামুদ্রিক কৌশল—এসব ক্ষেত্রের বিভিন্ন অঙ্গীকার একসময় পারস্পরিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
চীন এসব সম্বন্ধে অবগত। তবু তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ হলো, বেইজিং এখন বাংলাদেশের কাছ থেকে আরো বেশি নীতিগত ধারাবাহিকতা, কৌশলগত স্বচ্ছতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার সক্ষমতা প্রত্যাশা করবে। অর্থাৎ চীন শুধু অর্থ বিনিয়োগ করেনি, তারা তাদের কৌশলগত আস্থাও বিনিয়োগ করেছে। এখন সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের। সফরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।
বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। চীন তাদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারতের উদ্বেগ দূর হয়নি, বরং নতুন মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সফরের সাফল্য নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ নিজেই। কারণ কূটনৈতিক সফরে প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দিতে লাগে দক্ষ প্রশাসন, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা।
চীন তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে। বিএনপি তার কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্জন করেছে। কিন্তু এখন শুরু হয়েছে আসল পরীক্ষা! সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে এই সফর ইতিহাসে বড় অর্জন হিসেবে নয়, বরং অপূর্ণ সম্ভাবনার আরেকটি অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক : রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক



প্রধানমন্ত্রী ২৬ জুন সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের আলোচনায় দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিনিময় ও সহযোগিতা জোরদার, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারি ইত্যাদি গুরুত্ব পায়। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন সব সময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে এবং উভয় দেশের মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলোতে পরস্পরকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চীনের সহযোগিতার কথা জানান। তিনি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করার ব্যাপারে চীনের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন। ওই দিন তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি। তাঁদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি ছাড়াও রাজনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে কথাবার্তা হয়। 
