kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

রূপকল্প ও ডিজিটাল অর্থনীতি

অজিত কুমার সরকার   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রূপকল্প ও ডিজিটাল অর্থনীতি

রূপকল্প হচ্ছে দেশকে উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সোনালি পথ নকশা দলিল। এতে প্রতিফলিত হয় একজন নেতার স্বপ্ন ও দূরদর্শিতা। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো যে ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করেন, তার মূল উপজীব্য হিসেবে আবির্ভূত হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দিনবদলের সনদ এই রূপকল্প ঘোষণাকালে তিনি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে প্রেরণাদায়ী দুটি অঙ্গীকার করেন। প্রথমত, ২০২১ সালের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং দ্বিতীয়ত, একই সময়ে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। এই দুটি অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে রূপকল্পের আলোকে তৈরি করা হয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১)।

এরই মধ্যে রূপকল্প ঘোষণার পর এক যুগ পার হয়েছে। এই সময়ে লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে, তা বোঝার জন্য দুটি ঘটনার উল্লেখ করছি। একটি হলো—২০১৫ সালেই বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে যাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ৪৫ ডলারের নিচে, তাদের বলা হয় নিম্ন আয়ের দেশ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর এই তালিকায়ই ছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল এক হাজার ৩১৪ ডলার। দ্বিতীয়টি হলো, এক যুগের পথচলায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের সাফল্য দেশের সীমানা ছাড়ায়। সাউথ-সাউথ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সোমালিয়া, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, ফিজি, ফিলিপিনস ও প্যারাগুয়ের সঙ্গে এসডিজি, ওপেন গভর্নমেন্ট ডাটা, চেইঞ্জ ল্যাবসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান এবং সেবা বা সিস্টেম আদান-প্রদানের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পাঁচটি বেস্ট প্র্যাকটিস যথাক্রমে ডিজিটাল সেন্টার, সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড, এম্পেথি ট্রেনিং, টিসিভি এবং এসডিজি ট্রেকার চিহ্নিত করা হয়। এসব বেস্ট প্র্যাকটিস মডেলই ওই সব দেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভিযাত্রায় ডিজিটাল অর্থনীতি নামক এক নতুন অর্থনীতির উদ্ভব এবং এ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবনা সম্পর্কে আলোকপাত করার জন্যই আলোচ্য প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়েছে। কারণ ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ডিজিটাল অর্থনীতির অবদান ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে তা ১৫.৫ শতাংশ। কভিড মহামারির এই সময়ে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিই অন্যতম প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠছে। এমনই বাস্তবতায় ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্ন অনেকেরই। ২০২০ সালের ১৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (আইসিসি) ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলার উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, ‘বাংলাদেশের আইসিটি রপ্তানি এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অচিরেই এ খাতের রপ্তানি গার্মেন্ট খাতকে ছাড়িয়ে যাবে।’ ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন নবগঠিত সরকারের যাত্রা শুরু হয়, তখন আইসিটি রপ্তানি ছিল মাত্র ২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশসহ ১০০টিরও বেশি দেশে আইসিটি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। আগে বাংলাদেশ ৩০ মিলিয়ন (তিন কোটি) মোবাইল ফোন আমদানি করত। আর ২০১৯ সালে দেশেই উৎপাদিত হয় ২০ মিলিয়ন (দুই কোটি) মোবাইল ফোন। দেশে সফটওয়্যার সেবার বাজার বর্তমানে ১০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে ৫০ শতাংশই দেশি সফটওয়্যার নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণে। হার্ডওয়্যার খাতে দেশে স্মার্টফোন সংযোজন করছে ৯টি ব্র্যান্ড। ৩৯টি হাই-টেক বা আইটি পার্কের মধ্যে এরই মধ্যে নির্মিত সাতটিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে পাঁচটিতে ১২০টি প্রতিষ্ঠান ৩২৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) এক বিলিয়ন ডলারের আইসিটি পণ্য রপ্তানির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির আকার সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পাওয়া যাবে কি? কারণ ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি ও অনলাইন শ্রমবাজার সৃষ্টি, অনলাইনে সরকারি সেবা, ক্রয়, লেনদেন ও বেতন-ভাতা প্রদান, প্রণোদনা, ভর্তুকির অর্থ স্থানান্তর, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের ভাতা, ভর্তি ফি, মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রদানের মতো অনেক কাজই সম্পন্ন করা হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য একেবারেই কম নয়। আমার জানামতে, এ নিয়ে আজ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বা সমীক্ষা হয়নি। আর তা করা হলে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্পর্কে শুধু প্রকৃত তথ্যই পাওয়া যাবে না, তার আকার প্রতিবছরই বড় হচ্ছে—এমন তথ্যও পাওয়া যাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের এক যুগে পথচলার দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায়, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে তা সমৃদ্ধির দিকে যাত্রার এক সোনালি সোপান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। কভিড মহামারি যখন দেশের দ্রুত বর্ধমান অর্থনীতির যাত্রাকে উল্টো পথে প্রবাহিত করতে থাকে, তখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসে ডিজিটাল খাত। তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার করে আর্থিক সেবায় মানুষের অন্তর্ভুক্তির তথ্য চমকে দেওয়ার মতো। মোবাইল ব্যাংকিং সেবাবহির্ভূত বেশির ভাগ মানুষকে ব্যাংকিং সেবার অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১০ বছর আগে চালু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিং খাতে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ৯ কোটি ৬৪ লাখ এবং ২০২১ সালের এপ্রিলে লেনদেন হয়েছে ৬৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। দেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১.৫ হাজার স্টার্টআপ রয়েছে, যাদের বেশির ভাগই পরিচালনা করছে তরুণরা। স্টার্টআপে বিনিয়োগ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত ই-কমার্সের আকার ছিল আট হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা করোনা মহামারিতে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ সাল নাগাদ দেশীয় ই-কমার্সের বাজার ২৫ হাজার কোটিতে পৌঁছতে পারে। এ ছাড়া ৫০ হাজারেরও বেশি ফেসবুকভিত্তিক উদ্যোক্তা, যাঁরা ৩০ হাজারেরও বেশি পণ্য হস্তান্তরে যুক্ত। দেশের গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকায় ই-কমার্সের প্রসারে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘একশপ’।

বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিকটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নীতিনির্ধারকরা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ডিজিটাল বিপ্লবের পথ ধরে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিনির্ভর বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক জাগরণ শুরু হয়েছে সে ব্যাপারে তাঁরা অত্যন্ত সচেতন। আমরা নিওলিথিক যুগের কৃষি বিপ্লবের কথা জানি। আর প্রথম ও দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় শিল্প বিপ্লব বা ডিজিটাল বিপ্লবের আবির্ভাবের কথাও অজানা নয়। আর এই ডিজিটাল বিপ্লবের পথ ধরে যে নতুন নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হচ্ছে, তা খুব ভালোভাবেই পর্যবেক্ষণ করছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান থাকায় তিনি বিশ্বে নতুন নতুন প্রযুক্তির প্রভাবে পরিবর্তনশীল অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রয়োজনে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি আইন, নীতিমালা, স্ট্র্যাটেজি সংশোধন বা নতুন প্রণয়নের নির্দেশনা দিচ্ছেন। ফলে ১২ বছরেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় ও গতিশীল খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়। একটি দেশের অর্থনীতি শুধু কাপড় সেলাইয়ের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না। তাই জোর দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ উদ্যোগটি ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের জন্য আশাব্যঞ্জক। ডিজিটাল অর্থনীতির আকার বাড়াতে মিশন পাঁচ বিলিয়ন ডলার নামে একটি স্ট্র্যাটেজির খসড়া চূড়ান্ত করেছে আইসিটি বিভাগ। সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরামর্শে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক এই স্ট্র্যাটেজির একটি খসড়া প্রণয়নে ত্বরিত পদক্ষেপ নেন। এতে রয়েছে ২০২৫ সালে ডিজিটাল অর্থনীতির আকার পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা। কেন এমন একটি স্ট্র্যাটেজি প্রণয়নের প্রয়োজন হলো, তা বোঝার জন্য জুনাইদ আহেমদ পলকের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, দেশের ৪৫ লাখ পোশাক শ্রমিক প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানিতে ভূমিকা রাখছেন। আর আসিয়ান জাতিগুলোতে ২৫ লাখ তথ্য-প্রযুক্তি শ্রমিক ৩৮২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানিতে ভূমিকা রাখছেন। প্রযুক্তির সহায়তায় কম শ্রমে ডিজিটাল অর্থনীতির আকার বহুগুণ বাড়ানো যায় এটা তার প্রমাণ। তাই আমাদের লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে আইসিটি রপ্তানি পাঁচ বিলিয়ন ডলার বাড়ানো এবং এই বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে মিশন পাঁচ বিলিয়ন ডলার স্ট্র্যাটেজি। মিশন পাঁচ বিলিয়ন ডলার স্ট্র্যাটেজির ছয়টি উপখাত রয়েছে : ১. হাই-টেক উৎপাদন, ২. সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন ও সার্ভিসেস, ৩. বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং, ৪. নেটওয়ার্ক, ডাটা সেন্টার এবং সাইবার সিকিউরিটি এবং আইটি ও আইটি অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, ৫. ই-কমার্স ও ডিজিটাল ফিন্যান্স এবং ৬. ফ্রিল্যান্সিং। উপখাতগুলোর বাস্তবায়নের জন্য ৩১টি অগ্রাধিকারসহ মোট ১০৬টি অ্যাকশন আইটেম রয়েছে, যার বেশির ভাগই ২০২৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। খসড়া কৌশলে আইটিশিল্পকে উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য প্রণোদনা, কর অবকাশ সুবিধার পরামর্শসহ গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সস্তা শ্রমকে কাজে লাগানো, ই-কমার্সের প্রসার এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বৈচিত্র্যময় ব্যবসা ও শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণে ব্যবহার করে ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান ও শিল্পে ভ্যালুচেইন সৃষ্টির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

 

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সাবেক সিটি এডিটর, বাসস



সাতদিনের সেরা