kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা ও বুদ্ধের শিক্ষা

ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়

২৬ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা ও বুদ্ধের শিক্ষা

শুভ বুদ্ধপুর্ণিমা বৌদ্ধদের একটি পুণ্যময় তিথি, তাৎপর্যমণ্ডিত দিন। এই দিনে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব গৌতম বুদ্ধ বিশাখা নক্ষত্রে বৈশাখের পুণ্যালোকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সিদ্ধার্থ গৌতমের পিতা ছিলেন শাক্যবংশের রাজা শুদ্ধোদন। মাতা ছিলেন রানি মহামায়া। হিমালয়ের পাদদেশে নেপালের শাক্যদের রাজধানী ছিল কপিলাবস্তু। সিদ্ধার্থ গৌতমের মাতৃদেবী রানি মহামায়া পিত্রালয়ে যাওয়ার পথে কপিলাবস্তু থেকে কয়েক মাইল দূরে লুম্বিনী কাননে বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে রাজকুমার জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

সিদ্ধার্থ গৌতম রাজকীয় ঐশ্বর্যের মধ্যে লালিত-পালিত হলেও বাল্যকাল থেকে তিনি জগত্সংসার সম্পর্কে চিন্তা করতেন। রাজা শুদ্ধোদন তাঁর বৈরাগ্যভাব দেখে সংসারের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য যশোধরা নাম্নী এক অনুপম সুন্দরীর সঙ্গে ১৯ বছর বয়সে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ করান। সংসারের দুঃখ-কষ্ট যাতে সিদ্ধার্থের দৃষ্টিগোচর না হয় তার সব ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু জীবনে যে দুঃখ সত্য, তা সংসারে আবদ্ধ হয়ে সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করলেন। মানুষের জীবনে জরা, ব্যাধি, মরণ কেন হয়, তা সিদ্ধার্থ গৌতমকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল। পুত্র রাহুলের জন্মের পরই সিদ্ধার্থ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে রাজসিংহাসন, ভোগ-ঐশ্বর্য—সব কিছু ত্যাগ করে সংসার-বন্ধন ছিন্ন করে সত্যের অন্বেষণে বেরিয়ে পড়লেন। রাজকীয় ঐশ্বর্য, সুন্দরী স্ত্রী, পুত্র রাহুল—কোনো বন্ধনই তাঁকে আবদ্ধ করে রাখতে পারেনি।

দুঃখের নিবৃত্তির পথ খুঁজেছিলেন তথাগত বুদ্ধ। তিনি তার সন্ধানও পেয়েছিলেন। বোধি লাভের পর চারটি আর্য সত্য উপলব্ধি করলেন, তা হলো—১. দুঃখ আছে। ২. দুঃখের উৎপত্তি আছে। ৩. যার উৎপত্তি আছে তার লয়ও আছে, সুতরাং দুঃখেরও লয় আছে। ৪. দুঃখ নিরোধের পথও আছে। এ চতুরার্য সত্য ব্যতীত জগতে অন্য কোনো ধর্ম নেই। এতেই পৃথিবীর সব সত্যের সন্ধান নিহিত। বুদ্ধ ৪৫ বছরব্যাপী দেব মানবের হিতে তাঁর এই সত্যের বাণী প্রচার করেন।

তথাগত বুদ্ধের বয়স যখন ৮০ বছর, তখন উপলব্ধি করলেন, তাঁর মহাপরিনির্বাণের সময় আসন্ন। বৈশালীতে তিনি একদিন তাঁর ভিক্ষুসংঘকে ডেকে বললেন, ‘বৈশালীতে এই আমার শেষ অবস্থান, তিন মাস পরই তথাগত পরিনির্বাপিত হবেন। তোমরা কাতর হয়ো না। যে ধর্ম তোমাদের কাছে প্রকাশ করলাম, অনুরাগের সঙ্গে সেই ধর্ম অনুশীলন করে নির্বাণ লাভের জন্য আয়াস করো।’ অতঃপর বুদ্ধ আনন্দকে ডেকে বললেন, ‘কুশীনগরে গিয়ে মল্লদের সংবাদ দাও, তথাগতের পরিনির্বাণ আসন্ন। পরে যেন তারা খেদ না করে যে তথাগত আমাদের গ্রামেই দেহ রক্ষা করলেন; কিন্তু শেষ সময় আমরা তাঁকে দেখতে পেলাম না।’

অনন্তর বুদ্ধ সমবেত শিষ্যদের বললেন, ‘সংহত পদার্থ মাত্রই নশ্বর। এই সকল বস্তুই ক্ষয়শীল। তোমরা অপ্রমাদের সঙ্গে নিজের মুক্তির পথ অন্বেষণ করো।’ তথাগত বুদ্ধ এ কুশীনগরের মল্লদের শালবনে মহাপরিনির্বাণপ্রাপ্ত হলেন, সেদিনও ছিল বৈশাখের পুণ্যলগ্ন পূর্ণিমা তিথি। মহাপরিনির্বাণ লাভের আগে বুদ্ধ শিষ্যদের যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন, “‘আত্মদীপো ভব’—তুমি নিজে তোমার আলোকবর্তিকা হও, তোমার প্রজ্ঞাদৃষ্টিই তোমাকে পথ দেখাবে; তোমার পথ দেখাবার আলো আসবে না তোমার বাইরে থেকে। যারা পথ দেখাবার ভিড় করে না, তারা কেবল বাড়ায় খোঁজা।” এই প্রজ্ঞাদৃষ্টি লাভ করেই সিদ্ধার্থ গৌতম পথের সন্ধান পেয়েছিলেন। তিনি আলোকবর্তিকা বুদ্ধ হয়েছিলেন। আর তখনই তিনি বলতে পেরেছিলেন ‘সর্বোচ্চ জ্ঞান লাভ করে আমি আর কার কাছে শিক্ষা নেব।’ শিষ্যদেরও উপদেশ দিয়ে বলছেন, “‘অত্তা হি অত্তনো নাথো কোহি নাথো পরো সিযা’—তুমিই তোমার নাথ বা প্রভু। তুমিই তোমার আশ্রয়। তুমি ছাড়া তোমার অন্য কোনো আশ্রয় আছে? সুতরাং ‘তুম্মে হি কিচচং আতপ্পং’—মুক্তির চেষ্টা তোমাকেই করতে হবে; আমি পথ প্রদর্শক মাত্র!”

তথাগত বুদ্ধের ধর্ম বিশেষভাবে প্রজ্ঞানির্ভর। বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ মানব, যিনি অরি (শত্রু) ধ্বংস করে অরহত প্রাপ্ত হয়েছেন, তিনি অশুদ্ধ; অকৃতজ্ঞ (নির্বাণপ্রাপ্ত), মানবিক ও দিব্য, সর্বপ্রকার যোগ বা বন্ধন থেকে মুক্ত, সব তৃষ্ণা বর্জন করে তিনি প্রব্রজিত, অনাগারিক। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা গৃহীর পক্ষে তো এই আদর্শে উপনীতি হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে বুদ্ধ সব তৃষ্ণার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য বলেছেন। তৃষ্ণার বন্ধনে আবদ্ধ থেকে মানবমুক্তি কি কখনো সম্ভব? তৃষ্ণাই তো সব দুঃখের মূল। যত দিন না মানব লোভ-দ্বেষ-মোহের মূলোৎপাটন করতে পারবে, তত দিন নানা দুঃখের সাগরে মানবকে ভাসতে হবে। তবে গার্হস্থ্যজীবনেও দুঃখের অবসান ঘটানো যায়—তা কুসুমাস্তীর্ণ নয়। অসংখ্য বন্ধন ছিন্ন করা সে তো কত কঠিন, নিজেকে উপলব্ধি করলে এর সত্যতার প্রমাণ মিলবে। বৌদ্ধশাস্ত্রে গৌতম বুদ্ধকে বলা হয়েছে ‘সম্যক সম্বুদ্ধ’, ‘লোকোত্তর পুরুষ’ ও ‘তথাগত’। বুদ্ধের নামে ‘তথাগত’ নামটি কিন্তু বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অতীত বুদ্ধদের মতো যিনি মানবমুক্তির জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন (তথা আগত) তাঁকে তথাগত বলা হয়। অতীত বুদ্ধদের মতো যিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন বলে ‘তথাগত’। গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব শান্তিকামী বিশ্বের জন্য এক মহাবিস্ময়। বুদ্ধের আবির্ভাবে ভারতবর্ষসহ বিশ্বের মানবাত্মার মহিমা নতুন করে উদঘোষিত হয়।

তথাগত বুদ্ধ যে সত্য ধর্ম প্রচার করেন, তাতে বলা হয়েছে—মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্য নিয়ন্তা, আত্মশরণে বা আত্মপ্রচেষ্টায় নির্বাণ লাভে সক্ষম, অন্য কারো কৃপায় নয়।

মহাপরিনির্বাণ লাভের আগে তথাগত বুদ্ধ তাঁর প্রিয় শিষ্য আনন্দকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, ‘হে আনন্দ, আত্মদীপ হয়ে বিহার করো, ধর্মশরণ হয়ে বিহার করো।’

তথাগত বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও মহাপরিনির্বাণ বৈশাখের মহাপূর্ণলগ্নে বিশাখা নক্ষত্রযোগে সংঘটিত হয়েছিল বলে বিশ্বে সর্বত্র ‘শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা’ নামে উদযাপিত হয়। এটি তথাগত বুদ্ধে ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত মহাপুণ্যময় দিন। শান্তি, মৈত্রী ও করুণার প্রতীক তথাগতের ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত দিনটি বৌদ্ধ ও শান্তিকামী মানুষ স্মরণ এবং পালন করে থাকে।

এমন সময়ে শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা সমাগত, যখন করোনাভাইরাস তথা কভিড-১৯ মহামারিতে সবাই বিপদগ্রস্ত। এই ভয়ংকর অতিমারিতে ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোত্র, ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন সবাই মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন। এই মহাবিপর্যয় থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি—সব ধর্মের মাঝে মানব ধর্ম সার ভুবনে। সমন্বিতভাবে এই বিপর্যয় থেকে রক্ষায় মানবজাতিকে এগিয়ে আসতে হবে, যা বুদ্ধেরই অহিংসা ও মানবতার শিক্ষা।

শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা পুণ্যালোকে ধরণি হোক সুশীতল। বিশ্বের সব প্রাণী সুখী হোক, শান্তি লাভ করুক। 

লেখক : সম্পাদক, সৌগত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন, ঢাকা 

[email protected]