kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও নিরাপত্তাহীনতা

অনলাইন থেকে

২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শোনা যায়, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান নাকি তাঁর সহকর্মীদের একবার বলেছিলেন, ‘রাজনীতির প্রথম নিয়ম হওয়া উচিত (যা মেনে চলতে হবে) কখনো আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালিয়ো না।’ এটা একটা শিক্ষা, ইমপেরিয়াল ব্রিটেনের জন্য শিক্ষা, যা ব্রিটেন কঠিন বাস্তবতার মুখে শিখেছে উনবিংশ ও বিংশ শতকে তিনটি পৃথক ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনার পর। ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বরের পর যখন আফগানিস্তানভিত্তিক আল-কায়েদা তালেবান সরকারের দ্বারা সুরক্ষিত হয়ে সফলভাবে নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে হামলা চালিয়েছিল—এই শিক্ষাটা খুব দ্রুত ভুলে যাওয়া হয়েছিল।

তার বদলে যুক্তরাজ্য ও ন্যাটোর সমর্থনপুষ্ট হয়ে আল-কায়েদাকে ধ্বংস করার জন্য এবং তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করল। শুরুর দিকে তারা বিস্ময়কর সাফল্য পেল—কাবুল সরকারের অপ্রত্যাশিত পতনের দ্বারা সে ঘটনা চিহ্নিত হয়ে আছে। পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় আল-কায়েদার অবস্থানে ব্যাপক বোমা হামলা করা হলো। এই সামরিক অভিযান পরে কাঙ্ক্ষিত সীমার বাইরে চলে গেল এবং শেষ পর্যন্ত এ অভিযান পরাজয়ের মুখও দেখল।

পশ্চিমাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুদ্ধ-পরবর্তী বিধির আইডিয়ালাইজ ভাষ্যের (পোস্টওয়ার অর্ডারের আইডিয়ালাইজড ভিশনের) ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, তাতে আঞ্চলিক বাস্তবতার এবং সামরিক সামর্থ্যের বিষয়ে অগভীর ধারণা ছিল। তালেবান পুনঃসংগঠিত হয়েছে এবং আবার অস্ত্রসজ্জিত হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক বিরোধ (সিভিল কনফ্লিক্ট) শুরু হলো। এ সপ্তাহে যুদ্ধ-সংঘাতের প্রায় ২০ বছর হতে চলল, জো বাইডেন সিদ্ধান্ত নিলেন যে যথেষ্ট হয়েছে, আমেরিকার অন্তত একটি অজিত এবং জিত-অযোগ্য যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয়েছে। তিনি মার্কিন সেনাদের দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছেন। মার্কিন মিত্ররা তাদের মধ্যে ব্রিটেনও রয়েছে, এখন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করবে, তারা সবাই বহির্গমনের দরজায় অপেক্ষা করছে।

এই সপ্তাহে টেলিভিশনে দেওয়া তাঁর ভাষণে জো বাইডেন ঘোষণা করলেন যে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন ও ন্যাটো সেনা—তাদের মধ্যে ৭৫০ জন যুক্তরাজ্যের—আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে বিদায় নিতে শুরু করবে। তারা সবাই সময়মতো সরে যাবে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখের মধ্যে তারা সরে যাবে; ওই সময় আফগানিস্তানে নাইন-ইলেভেন হামলার ২০ বছর পূর্ণ হবে। প্রেসিডেন্ট যা যা বললেন তা আসলে আফগান অভিযানের বিষয়ে বিদায় ভাষণ। শেষ পর্যন্ত—এবং যথেষ্ট অর্জন থাকা সত্ত্বেও এটা একটা ব্যর্থ অভিযান। ডোনাল্ড ট্রাম্প একই রকম সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন ভিন্ন এবং অধিকতর আইসোলেশন্টি স্ট্যান্ডপয়েন্ট থেকে। যদিও তিনি বাইডেনের মতো নন, তিনি এ ব্যাপারে প্রথমে মিত্রদের সঙ্গে কোনো পরামর্শই করেননি। এসবের কোনো কিছুই কংগ্রেশনাল রিপাবলিকানদের থামাতে পারবে না। তারা বলবে, ‘জো বাইডেনের এবিষয়ক সিদ্ধান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন।’

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় কিছু সীমাবদ্ধতার প্রকাশ ঘটেছে, সেগুলো একবিংশ শতকের আমেরিকান শক্তিমত্তা (পাওয়ার) বিষয়ক। এ কথা ঠিক যে যখন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সংযুক্ত হলো, দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় শিক্ষা বিকশিত হলো, মেয়েদের জন্যও, যে মেয়েরা মূলত বাদ পড়ে গিয়েছিল তালেবানের কারণে। গড় আয়ু প্রতিবছরই বেড়েছে, এখন তা ৬৫ বছর। কিন্তু এসব অর্জন ভঙ্গুর (বা স্থিতিশীল নয়) এবং এসব অর্জনের ভবিষ্যৎ খুবই অনিশ্চিত। যখন ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়া সমর্থিত আফগান সরকার ধসে পড়ল, তালেবান দ্রুত ক্ষমতাগ্রহণে সক্ষম ছিল। ৩০ বছর পর আমেরিকার বিদায় নেওয়ার পর হয়তো একই জিনিস ঘটাতে পারে। শান্তি আলোচনা অব্যাহত আছে কিন্তু তালেবানের জন্য এ আলোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার তেমন কোনো যুক্তি নেই।

জো বাইডেনের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিশেষ এক ধরনের আমেরিকান আত্মবিশ্বাসের মৃত্যু ঘটল। যুদ্ধের নতুন ধরন, ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং কম স্থলবাহিনী মোতায়েন করা প্রভৃতি আগের যুদ্ধগুলোতে যেমন ভিয়েতনাম কাজে লেগেছে। দুই দশক আগে এ কৌশল প্রয়োগ করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড। কিন্তু তাঁরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি. যেমনটি তিনি (বাইডেন) দাবি করেছেন।

বড় আকারে সেনা মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি না দিয়ে এ ধরনের যুদ্ধজয়ের পরিকল্পনা কাজ করেনি। আফগান মতামত আরো বেশি বিভক্ত হয়েছে এবং এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরুদ্ধ মত আরো বেড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ২০০১ সালে পশ্চিমাদের ধারণাগুলো যদি অনুমোদিত হতো, তাহলে যা ঘটত তার চেয়েও বেশি বিরুদ্ধ মত এখন দেখা গেছে। (আফগানদের মধ্যে) আঞ্চলিক রেষারেষির অবসান ঘটানো যায়নি। এ যুদ্ধের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের জনমতও ক্রমবর্ধমান হারে বিরুদ্ধ মনোভাবাপন্ন হয়েছে।

আফগানিস্তান এবং পরে ইরাকেনেশন বিল্ডিংয়ের যে দাবি করা হয়েছিল তা অন-অর্জনযোগ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। যুদ্ধ যখন শুরু করা হয়েছিল তখন এসবের অনেক বিষয়ে আগাম বলা হয়েছিল এবং আরো কিছু বিষয় প্রেডিকটেবল ছিল। এখন যা ঘটতে যাছে তা দেখে সন্তুষ্ট হওয়ার খুব কম কারণই আছে; কারণ অনেক আফগানের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অনিরাপত্তা রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা-অনিরাপত্তা বহমান রয়েছে।

 

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক