kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

এইচএসসি-২০২০ উত্তীর্ণদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কিছু কথা

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামীম ফরহাদ, এনডিসি, পিএসসি

২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



এইচএসসি-২০২০ উত্তীর্ণদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কিছু কথা

আমরা জানি যে করোনা পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা শুরুর মাত্র তিন দিন আগে এইচএসসি পরীক্ষা মুলতবি ঘোষণা করা হয়। পরে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেকটা সময় দোদুল্যমান অবস্থায় থেকে বছর শেষে জানতে পারে, তাদের এইচএসসি পরীক্ষা দিতে হবে না। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার নম্বরের ওপর ভিত্তি করে তাদের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফলে আমরা দেখতে পেয়েছি, এইচএসসি ২০২০-এর তুলনামূলক ভালো ফলাফল এবং শতভাগ পাস। শতভাগ পাসের পাশাপাশি এবার জিপিএ ৫-এর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এত সংখ্যক ছাত্র একসঙ্গে পাস করা যতটা সবার জন্য আনন্দদায়ক, উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া হবে ততটাই চ্যালেঞ্জিং। দেশে উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের ভালো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আকাঙ্ক্ষা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমিত সিট সংখ্যার কারণে সব শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষায় ধারণ করা সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ মাধ্যমিক ২০২০-এ কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য আজকের এ আয়োজন।

সীমিত উচ্চশিক্ষার অবয়ব ও তার ধারণক্ষমতা মাথায় নিয়ে এখনই তোমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমি আশা করি, যারা সত্যিকার অর্থে বুদ্ধিমান, তারা এরই মধ্যে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছ এবং প্রস্তুতির শেষ পর্যায় আছ। যে পরীক্ষাগুলো এরই মধ্যে তোমরা দিয়ে এসেছে অর্থাৎ  PEC, JSC, SSC, HSC—এসব পরীক্ষায় ভালো নম্বর/জিপিএ ৫ পাওয়া উচ্চশিক্ষায় ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি নয়। কারণ আমরা জানি, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে গেলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এই ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে আজকে আলোকপাত করব। যারা এসএসসি বা এইচএসসি একটু খারাপ করেছ, তাদের হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। তোমরাও ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করলে ভালো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে ২০১৯ ও ২০২০ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নেবে, তারপর ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা গুচ্ছ পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে ঘোষিত যোগ্যতা অনুযায়ী ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীরা আবেদন করবে। এ জন্য কোনো ফি লাগবে না। এরপর আবেদন করা প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই (স্ক্রিনিং) করে নির্ধারিতসংখ্যক প্রার্থীকে ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ দেওয়া হবে। যারা ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য যোগ্য হবে, সেটি তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে। এরপর যোগ্য প্রার্থীরা ৫০০ টাকা ফি দিয়ে আবার আবেদন করবে এবং তারাই ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবে। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় ভুল উত্তরের জন্য নম্বর কাটা যাবে।

গত বছরের মতো এবারও কৃষি ও কৃষির প্রাধান্য থাকা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে অবস্থিত প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একই গুচ্ছে পরীক্ষা নেবে বলে জানিয়েছে। অন্যবারের মতো এবারও মেডিক্যাল কলেজগুলো গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেবে। গুচ্ছ পদ্ধতির বাইরে থেকে নিজ নিজ নিয়মে পরীক্ষা নেবে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে প্রায় ৪.৫ লাখ আসন রয়েছে। ১৩টি শতবর্ষী কলেজে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করে ছাত্র ভর্তি করা হবে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

আমরা জানি, প্রতিবছর এইচএসসি শিক্ষার্থীদের বৃহৎ অংশ সামরিক বাহিনী অর্থাৎ সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, মেরিন একাডেমি ইত্যাদিতে পরীক্ষা দেয়। সে ক্ষেত্রে তোমাদের মনে রাখতে হবে প্রতিটি বাহিনীর চাহিদা ভিন্ন, পরীক্ষার ধাপগুলো ভিন্ন এবং সিলেবাসও ভিন্ন। প্রার্থীর ন্যূনতম শারীরিক যোগ্যতার প্রয়োজনীয়তা জেনে তারপর আবেদন করবে। আন্তঃবাহিনী নির্বাচন পর্ষদের পরীক্ষা কিভাবে নেওয়া হয়, সেটা তাদের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত দেওয়া আছে।

আমাদের অনেক ছাত্র, যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজগুলোতে সুযোগ পাবে না, তাদের অনেককেই তুলনামূলক ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কোন বিশ্ববিদ্যালয় কেমন মানের তা ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করলে জানতে পারবে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি তোমরা ভর্তি হতে চাও, তবে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা জানতে হবে। সেখানে প্রতি সেমিস্টারে পরীক্ষা হয়। কোন সেমিস্টারের ভর্তি পরীক্ষা কবে, তা তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে গিয়ে জানতে হবে।

দেশের বাইরে যারা উচ্চশিক্ষা লাভ করতে চাও, সে ক্ষেত্রে তোমরা তোমাদের চাহিদা অনুযায়ী যে বিষয়ে পড়তে চাও সেটা বিদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খোঁঁজ নাও। টিউশন ফি, অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ এবং কত দিন লাগবে পড়তে, সেটা যাচাই করতে হবে। সবার আগে যাচাই করতে হবে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমন মান। যেনতেন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ নিয়ে তা ভবিষ্যতে চাকরিপ্রাপ্তিতে কিংবা জীবন গঠনে তোমার কাজে না-ও আসতে পারে।

এবার আমি কাঙ্ক্ষিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেতে হলে কী কী করতে হবে, সেটা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব। তুমি কী হতে চাও, সেটা নিজের সক্ষমতা দিয়ে বিবেচনা করো, তোমার ভালো লাগার ক্ষেত্রটা আবিষ্কার করো। মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, অর্থনীতি কিংবা গণিত, পদার্থবিজ্ঞান—কোন ক্ষেত্রে বা বিষয়ে তোমার আগ্রহ রয়েছে তা ভেবে দেখো; সে বিষয়ে পড়ার সুযোগ অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নাও। তোমার অভিভাবকের কাছ থেকে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নাও। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের কাছে বিনীত অনুরোধ, আপনার অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেবেন না। তাকে নিজের ভালো লাগা থেকে বিকশিত হতে দিন। ছাত্রদের এটাও মনে রাখতে হবে, তোমার স্বপ্ন যেন নির্দিষ্ট ভার্সিটিকেন্দ্রিক না হয়ে বিষয়কেন্দ্রিক হয়। তাহলে তোমার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে। শৈশব থেকে লালিত কোনো পেশাজড়িত স্বপ্ন বাস্তবায়ন প্রায় সম্পূর্ণই নির্ভর করে ভর্তি পরীক্ষার ওপর। ভর্তি পরীক্ষাকে হালকাভাবে নিলে হবে না। জীবনে তুমি অসংখ্য পরীক্ষা দিয়ে থাকলেও ভর্তি পরীক্ষাটা আলাদা করে দেখতেই হবে; নিতে হবে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে।

কভিডের কারণে তোমরা প্রায় এক বছর সময় পেয়েছ। এই সময়টাতে প্রচুর পড়াশোনা করে থাকলে অবশ্যই আসবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। যতক্ষণ না তুমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারবে যে তুমি সফলতা পাওয়ার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছ, ততক্ষণ পর্যন্ত পড়তেই হবে। মনে রাখতে হবে, ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোনো অধ্যায় বাদ দিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। সব অধ্যায়ই পড়তে হবে এবং অবশ্যই বুঝে পড়তে হবে। ভর্তি প্রস্তুতিতে প্রয়োজন প্রচুর অনুশীলন; অনুশীলনের মাধ্যমে কেটে যায় আত্মবিশ্বাসহীনতা, বাড়ে দক্ষতাও।

এই ভর্তিযুদ্ধের দুটি বিশেষ অস্ত্রের নাম ‘আত্মবিশ্বাস’ ও ‘যথাযথ প্রস্তুতি’। কোচিং মূলত প্রস্তুতিতে সহায়তা করে, তবে পড়তে হবে তোমাকেই। কভিডের কারণে এবার ভর্তি কোচিং ঠিকমতো না-ও হতে পারে। অনলাইন প্রস্তুতি পরীক্ষা কোনোটা ভালো হবে, আবার কোনোটা খুব খারাপ। এই স্রোতের ওঠানামার সঙ্গে টিকে থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে, তবে সীমার মধ্যে। ‘চেষ্টা করি বা না করি আমি টিকবই’—এ ধরনের মানসিকতা হচ্ছে ‘ওভার কনফিডেন্স’, যা মানুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরাজয় এনে দেয়।

চেষ্টা করবে বেশিসংখ্যক ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। অনেকেই মনে মনে নির্বাচন করে অমুক ভার্সিটি আমার ভালো লাগে না, অমুক ভার্সিটি দূরে, এত দূর যেতে আলসেমি লাগে, পরীক্ষাই দেব না ইত্যাদি; এসব চিন্তা মাথা থেকে এখনই ঝেড়ে ফেলো। কারণ ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতার চিত্রটা তোমার কল্পনার বাইরে। তুমি যত ভালো ছাত্র বা ছাত্রীই হও না কেন, অন্তত এখন কোনো ভার্সিটিকেই ছোট করে দেখবে না। কারণ ভর্তি পরীক্ষায় একটা বিরাট ভূমিকা রাখে নিয়তি বা ভাগ্য। এই ভাগ্যের কাছে হেরে গিয়ে অনেক মেধাবী তাদের প্রাপ্য ভার্সিটিতে চান্স পায় না। তাই ভর্তির আবেদন করার ক্ষেত্রে বাছবিচার না করে সবখানে পরীক্ষা দাও।

পরীক্ষার এক বা দেড় ঘণ্টা সময়টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি আর জ্ঞান ঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে কি না, তার ওপরই তোমার চূড়ান্ত বিজয় নির্ভর করে। ওই সময়টুকুতে মাথা পুরো ঠাণ্ডা রাখতে হবে। উদ্বেগের কারণে মানুষ জানা প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। প্রতিটি প্রশ্নের সম্ভব না হলেও সর্বোচ্চ প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করবে। এ জন্য কয়েক ধাপে উত্তর করতে হবে। যেমন ধরো, পরীক্ষায় ১০০টি বহু নির্বাচনী প্রশ্ন আছে। এখন এমনভাবে উত্তর করা যাবে না যে তুমি এক এক করে এগিয়ে শেষ প্রশ্নের উত্তর করলে, আর তখন সময়ও শেষ হলো; বরং নিজের নির্ধারিত সময়ে প্রথম ধাপে সব প্রশ্ন পড়ে যেগুলো একেবারে নিশ্চিত সেগুলোর উত্তর করো। দ্বিতীয় ধাপে যেগুলো সামান্য চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন সেগুলোতে সময় দাও। যেহেতু ভুল উত্তরের জন্য ভর্তি পরীক্ষার নম্বর বিয়োগ হবে, তাই আন্দাজে উত্তর না দেওয়াই সমীচীন।

সবশেষে আমি শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করব, ভর্তিযুদ্ধ বা ভর্তি পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ উতরানোর জন্য প্রথমেই নিজের সঙ্গে আর যোগ্যতার সম্পর্কে ধারণা রাখো। নিজের ওপর আস্থা রাখো; সাহস রাখো যে অন্যরা পারলে আমি পারবই। পরীক্ষা হলে মাথা ঠাণ্ডা রেখে উত্তর দিতে পারবে, যদি তুমি নিয়মিত সময় ধরে অনুশীলন করে থাকো। সাধ্যমতো চেষ্টা করার পরে তুমি যেখানেই সুযোগ পাও, সেটা মেনে নাও। তুমি যে বিষয়ই পেয়ে থাকো না কেন (যদি পছন্দের বিষয় না-ও পেয়ে থাকো), সেই বিষয়কে ভালোবেসে এগিয়ে যাও। সত্যিকার অর্থে তোমার মধ্যে যদি যোগ্যতা থাকে, তুমি যে বিষয়ে পড়াশোনা করো না কেন, ইনশাআল্লাহ ভালো করবেই। আসন্ন ভর্তি পরীক্ষায় তোমরা আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সুযোগ পাও, এই আশাবাদ ব্যক্ত করে সবার সুন্দর ভব্যিষৎ কামনা করছি।

লেখক : অধ্যক্ষ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা