kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

সাদাকালো

কত দিনে করোনা থামবে

আহমদ রফিক

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কত দিনে করোনা থামবে

ছয় মাস হয়ে গেল করোনাভাইরাসের আক্রমণ বন্ধ হয়নি বাংলাদেশে। এর আগে চীন থেকে শুরু করে বিশ্বের দেশে দেশে করোনার ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যু। কেন জানি না, বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে এ ভয়াবহ ঘটনার অশনিসংকেতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাদি গ্রহণে বিচক্ষণতা প্রদর্শন করেনি।

যাই হোক, চলতি বছরের মার্চে যখন সত্যি সত্যি বাঘ পালে পড়ল তখনকার পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনেও দেখা যায়, স্বাস্থ্য বিভাগ এ ব্যাপারে করণীয় থেকে পিছিয়ে আছে। মাস্ক, পিপিই—এগুলো নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ। অভিযোগ যেমন সরবরাহের, তার চেয়ে বেশি এগুলো নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির। আর সেসব কথা মানুষের মুখে মুখে।

শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর ‘লকডাউন’ নির্দেশ কিছুটা মান্য করার কারণেই কি না জানি না, সূচনা মাসে মৃত্যুর সংখ্যা খুব কম। ক্রমে তা বেড়েছে। সেটা কি জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি-বিধান যথাযথভাবে পালনে শিথিলতা এবং অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের যথার্থ ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে, নাকি আরো কোনো কারণে বলা কঠিন। তবে প্রথম দুটি কারণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছিল অনেক।

শুরুতে করোনা সংক্রমণ ছিল মূলত রাজধানী এবং সন্নিহিত শহর নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। এ ব্যাপারে একটি অপ্রিয় সত্য মানতেই হবে যে দুই ঈদে কর্মস্থল ছেড়ে না যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ খুব একটা মানা হয়নি। দলে দলে মানুষ বাড়িতে গেছে অনেকটা বেপরোয়াভাবে। বলা বাহুল্য, ঢাকার বাইরে, গ্রামাঞ্চলে করোনা বিস্তারের এটি অন্যতম কারণ, অস্বীকারের উপায় নেই।

আশা করা গিয়েছিল এবং এ ধরনের কিছু লেখালেখিও হয়েছিল যে মাস তিনেকের মধ্যে করোনা সংক্রমণের উগ্রতা নিম্নমুখী হবে। প্রত্যাশা, আর তিন মাসে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুর সংখ্যা সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছাবে।

দুই.

এখন ছয় মাস পর সেপ্টেম্বরে পৌঁছে একাধিক দৈনিক পত্রিকায় হতাশাব্যঞ্জক সংবাদ শিরোনাম করোনা সংক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে। যেমন ১১ সেপ্টেম্বরের (২০২০) একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘ছয় মাস পরও করোনার উপসর্গে মৃত্যু থামছে না’। ‘বিপিও’ প্রতিবেদনের তথ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে।

অন্য একটি দৈনিকের শিরোনাম : ‘করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ২১৮০ জনের’। এর আগে যে কারণেই হোক করোনা কিছুটা সদয় হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা কমে এসেছিল। আশা করা যাচ্ছিল, করোনা সংক্রমণ এবার সত্যি নিম্নমুখী হবে। সে আশায় ছাই দিয়ে হঠাৎ করেই আবার মৃত্যুসংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী।

ঘটনার প্রকাশ একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনামে : ‘৯ দিন পর দৈনিক মৃত্যু আবার ৪০ ছাড়াল’। অর্থাৎ মৃত্যু ৪১ জনের। বিপিওর বিপরীতে এই প্রতিবেদনে দেশে করোনা পরিস্থিতির চিত্রটি নিম্নরূপ : ‘মোট শনাক্ত : ৩,৩১,০৭৮, মোট মৃত্যু ৪৫৯৩’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মৃত্যু বাড়লেও রোগী শনাক্তের হার কমেছে।’

কিন্তু প্রতিবেদক একটি বিষয় লক্ষ করেছেন কি না জানি না, করোনা উপসর্গের রোগীর নমুনা পরীক্ষা কতটা ব্যাপকভাবে করা হয়েছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের কতটা এলাকা পরীক্ষার আওতায় এসেছে। মৃত্যুর সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। তাই সংখ্যার বৈপরীত্য সূত্র থেকে সূত্রে।

দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে—ছয় মাসেও করোনা সংক্রমণ বা মৃত্যুর হার লক্ষণীয় মাত্রায় কমে আসছে না কেন? গত মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী; কিন্তু সে তুলনায় গৃহীত প্রতিরোধব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়ে যাচ্ছে।

বিশেষভাবে বিচার্য বিষয় হলো, করোনার উৎসগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নমুনা পরীক্ষার আওতা বাড়ানো, করোনা পজিটিভদের আইসোলেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, করোনা রোগীর চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করা, বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে। সর্বোপরি ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ রোধে কার্যকর নতুন কোনো কৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না।

এই পরিপ্রেক্ষিতে একটি দৈনিক পত্রিকায় (কালের কণ্ঠ, ২০.৮.২০২০) একটি শিরোনামে লেখা হয় : ‘ভেঙে পড়েছে সংক্রমণ প্রতিরোধের সব ব্যবস্থা’। এই প্রতিবেদনে যা লেখা হয়েছে তা হলো যেমন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তরফে একটা নিশ্চিন্তির ভাব (তাদের মতে, করোনা সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে), তেমনি অন্যদিকে নাগরিকদের পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি, নিয়ম-নীতি না মানার এক ধরনের শিথিলতা, ঢিলাঢালা ভাব বেশ স্পষ্ট।

উদাহরণস্বরূপ বলা হয়েছে, করোনা পজিটিভ হওয়া সত্ত্বেও উপসর্গ না থাকার কারণে অনেকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চলাফেরা করছে। অবশ্য স্বাস্থ্যসচেতন ব্যতিক্রমীদের কথা আলাদা। তাঁরা ঠিকই হোম কোয়ারেন্টিনে নিয়ম মেনে চলছেন, চিকিৎসাব্যবস্থাসহ। সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থা পরিবহন খাতে। এর দায়িত্ব কে নেবে?

বিমানের ফ্লাইট যেমন বাড়ছে, বিদেশাগত যাত্রীর সংখ্যাও বাড়ছে। তাদের বেশির ভাগ আসছে করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে। সে ক্ষেত্রে নিয়মমাফিক কোয়ারেন্টিনে রাখার তেমন কোনো কড়াকড়ি ব্যবস্থা লক্ষ করা যায় না। সম্ভবত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পূর্বোক্ত ধারণার কারণে। এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মনীতির বিরোধী।

বিমানবন্দরই নয়, স্থলবন্দর দিয়েও বাইরে থেকে মানুষ আসছে। তাদের ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার নীতি আরোপ করা হচ্ছে না। তারা দিব্যি অপরীক্ষিত হয়েই জনারণ্যে মিশে যাচ্ছে। কে বলতে পারে, তাদের মধ্যে কোনো করোনা পজিটিভ বা করোনা উপসর্গের ব্যক্তি নেই! তারা হয়ে যাচ্ছে করোনা সংক্রমণ বিস্তারের মাধ্যম। বিষয়গুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিবেচনায় রাখছে না কেন?

আরো একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। বাইরে বেরোলে অবস্থা দেখে মনে হয়, দেশটি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আছে, এখানে করোনা নামের কোনো ভাইরাস সংক্রমণ নেই। মানুষের চলাফেরায় এ ধরনেরই মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে। স্বাস্থ্য রক্ষা বিধি পালন বা সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলার কোনো বালাই নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ এ ব্যাপারে নির্বিকার।

করোনা বিষয়ে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মনে হয়, ছয় মাস ধরে করোনা সংক্রমণ সচল থাকার এগুলোও অন্যতম কারণ। ‘লকডাউন’, ‘রেড জোন’ সব উধাও হয়ে গেছে। বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে স্বাস্থ্যবিধিসংক্রান্ত নিয়ম-নীতি (এমনকি প্রয়োজনে লকডাউন, রেড জোন) কড়াকড়িভাবে কার্যকর করা দরকার। বিশেষ করে বিদেশাগতদের কোয়ারেন্টিনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বলে মনে হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ কি ভেবে দেখবে, নাকি করোনা সংক্রমণকে তার ইচ্ছামতো চলতে দেবে?

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা