kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৬ সফর ১৪৪২

বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে যুবদের সংযুক্তি

ড. নূর মোহাম্মদ

১২ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে যুবদের সংযুক্তি

মানবকুলের চলার পথে কিছু বাধা বা অন্তরায় সব সময়ই ছিল, আছে বা থাকবে। এ বাধাগুলোই আমাদের পেছনে ফেলে রাখে বা টেনে ধরে। কখনো বা আমাদের যাত্রাকে স্থবির করে তোলে। এ অন্তরায়গুলো কখনো প্রকৃতিগত, কখনো বা মানবসৃষ্ট আবার কখনো বা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভাবে ঘটে থাকে।

স্বাভাবিকভাবেই আমরা এ বাধা-বিপত্তি নিয়ে ভাবি। ভাবি এ অন্তরায়গুলো কিভাবে সরানো যায়, কিভাবে আমাদের পথচলাকে আরো মসৃণ করে তোলা যায়। যে বা যারা সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে সঠিক সময়ে তারা এগিয়ে যায় আর যারা তা পারে না তারা পিছিয়ে পড়ে।

সমষ্টিগতভাবে যখন ভাবা হয় তখন এই পিছিয়ে পড়া মানুষ বা মানুষকুল অন্যদের এগিয়ে যাওয়াকেও পেছনে টেনে ধরে। আমরা একেকজন মানুষ যখন যূথবদ্ধ হয়ে ভাবি তখন পরিবার, সমাজ, দেশ কিংবা এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে গড়ে তুলি। এ মানবজাতি যখন একটি ভূখণ্ডে আবাস গড়ে তোলে তখন একজনের বা এক দেশের পিছিয়ে পড়া পুরো বিশ্বকে টেনে ধরে, পিছিয়ে ফেলে।

আর এ কারণেই সবাইকে নিয়ে ভাবার প্রবণতা শুরু হয়েছে এ বিশ্বকে আরো সুন্দরতম গড়ার প্রয়াসে। উৎপত্তি হয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক কিংবা আন্তর্জাতিক সহাবস্থানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্থার। এরই ফসল হলো জাতিসংঘ কিংবা এ রকম আরো কিছু বৈশ্বিক সংস্থার। একসঙ্গে ভাবতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট বিরতিতে বসি এবং চেষ্টা করি একত্রে কিছু লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করার, যাতে আমরা একসঙ্গে এ বিশ্বকে আরো বাসযোগ্য, আরো নিরাপদ করতে পারি।

জাতিসংঘ সংজ্ঞায়ন করেছে ১৫-১৪ বছর বয়সী যারা, তারাই যুব। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মানুষই যুব শ্রেণির আওতাভুক্ত। আমাদের দেশে সর্বশেষ আদমশুমারি হয়েছে ২০১১ সালে, আগামী বছর আরেকটি শুমারি হবে বলে আমরা আশা করছি। জাতিসংঘের সংজ্ঞা (তারা আবার ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ‘তরুণ’ বলে আখ্যায়িত করে) ধরলে এ দেশে এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। অন্যদিকে সরকারি হিসাবে ‘যুব’ গোষ্ঠীর আনুপাতিক হার মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ। কাজেই শুধু এ সংখ্যার বিচারেই যুব জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে রাখার যেমন কোনো সুযোগ নেই, তেমনি তাদের বাদ দিয়ে দেশের কোনো ‘উন্নয়ন’ ভাবনাও ভাবা যায় না।

কিন্তু আমরা কি এ যুবগোষ্ঠীকে সত্যি ‘সম্পদ’ ভাবছি, নাকি ‘বোঝা’ ভাবছি? আমরা যদি সত্যি দেশের উন্নয়নের কথা ভাবি, তাদের সঙ্গে নিয়ে এগোনোর বিকল্প হতেই পারে না। তাদের অংশগ্রহণ প্রতিটি স্তরে : পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নে নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের শুনতে হবে, তাদের দেখতে হবে, তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, তবেই দেশের উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে টেকসই হবে। তাদের ‘সমস্যা’ না ভেবে ‘সম্ভাবনা’ ভাবতে হবে। ‘জেনারেশন গ্যাপ’-এর দোহাই দিয়ে তাদের দূরে ঠেলে রাখলে চলবে না। আর এ কারণেই যুব-বড়দের মধ্যে ‘মিথস্ক্রিয়া’ আরো বাড়াতে হবে। আমরা প্রায়ই বলে থাকি, আমরা তো পরিকল্পনা করার আগে তো তাদের মতামত নিচ্ছি। এ মতামত নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমরা যারা সিনিয়ররা বিভিন্ন নীতি নির্ধারণ করি, তাদের রজার হার্টের (১৯৯৭) ‘অংশগ্রহণের মই’-এর কথা মাথায় রেখে অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের ‘টোকেনিজম’ থেকে ‘শেয়ারড ডিসিশন’ লেভেলে পৌঁছতে হবে। তবেই জাতীয় উন্নয়ন তথা বৈশ্বিক উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্যে আমরা পৌঁছতে পারব। নতুবা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ পর্যায়েই আমরা সীমিত হয়ে রব, অর্জন দুরূহ হবে।

এ কথা অনস্বীকার্য, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই যুবগোষ্ঠীর কথা বেশ আগে থেকেই ভাবছে। এরই ফলে বাংলাদেশে পৃথক অধিদপ্তর ‘যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর’-এর জন্ম স্বাধীনতার প্রথম দশকেই এবং মন্ত্রণালয় সেই শুরু থেকেই। আমরা যুবদের জন্য নানা স্কিম দেখেছি। জীবিকায়নের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা করা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর অনেক সফল যুব উদ্যোক্তার জন্ম দিয়েছে। এখনো অনেক পথ বাকি। এই পথকে আরো সফলতার দিকে নিয়ে যাবে যদি আমরা অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হই। বিশেষ করে আমাদের সামাজিক যেসব ক্ষত রয়েছে—অল্প বয়সে বিয়ে, অল্প বয়সে সন্তানধারণ, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার, স্কুল ড্রপআউট, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, দুর্নীতি, অপরাজনীতি ইত্যাদি প্রতিরোধে তাদের আরো সম্পৃক্ত করতে হবে। তবেই আমরা সুন্দর দেশ তথা সুন্দর বিশ্ব দেখতে পাব।

লেখক : পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) নির্বাহী পরিচালক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা