kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

মতলবের সমালোচনা মানুষকে বিভ্রান্ত করে

আবদুল মান্নান

৯ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মতলবের সমালোচনা মানুষকে বিভ্রান্ত করে

বাংলাদেশে এমন কিছু সুধীজন আছেন, যাঁরা সব সময় অস্বস্তিতে ভোগেন, বিশেষ করে সরকারের কোনো ভালো অর্জন বা কৃতিত্বে। আর সরকারে যদি আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা থাকেন, তাহলে তো কথাই নেই। সেটি শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের আমল থেকে। তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, পরে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। যখন দেশের ও দেশের বাইরের অনেকেই দেশটির কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেখতে পাননি তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আলো দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তিন বছর কাউকে কিছু দিতে পারবেন না। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, এই ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়াতে এই সময়টুকু তো লাগবেই। তাঁর নিরলস পরিশ্রমের কারণে তিন বছরের মাথায় বাংলা নামের দেশটি শুধু উঠে দাঁড়ায়নি, হাঁটতে শুরু করেছিল। যারা বাংলাদেশ স্বাধীন হোক চায়নি, তাদের এটা সহ্য হয়নি। এদের মধ্যে জামায়াত আর চীনপন্থী বামরা তো রয়েছেই, তাদের সঙ্গে রয়েছে আরেক দল, যাদের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলেও তারা মূলত ছিল সনাতনকে আঁকড়ে ধরা ঘরানার মানুষ, যারা দেশভাগ হওয়ার পর বলত, ইংরেজ আমল ভালো ছিল আর বাংলাদেশ সৃষ্টি হলে বলে বেড়াত পাকিস্তান আমলে তারা অনেক সুখী ছিল। এদের প্রায় সবাই শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যবিত্ত। এদের অস্বস্তির সীমা ছিল না। বর্তমানে সমাজে এই ঘরানার মানুষ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় আছেন টানা তিন মেয়াদ। তাঁর সরকারের বেশ কিছু ব্যর্থতার মাঝেও তিনি বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে কমবেশি চেহারা পাল্টে দিয়েছেন—এই সত্যটি আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত হলেও দেশের এক শ্রেণির মানুষ তা মানতে নারাজ। তারা শুধু যে প্রতিনিয়ত শেখ হাসিনাকে নানা অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেই প্রস্তুত তা-ই নয়, বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক মন্তব্যেরও জন্ম দেয়। আর বর্তমানে ফেসবুক লাইভের নামে যেকোনো ব্যক্তি টক শোর আয়োজন করতে সক্ষম। কে বলে বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, এই সমালোচকরা দেশের বাইরে কিছু পরিচিত ব্যক্তির সহায়তাও নিচ্ছেন।

সম্ভবত গত বছরের কথা। একসময় বিবিসির উত্তর-পূর্ব ভারতের সংবাদদাতা সুবীর ভৌমিক, যিনি একজন অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট, ছিলেন ভারতের সরকার-ঘনিষ্ঠ, হঠাৎ এক সংবাদে জানালেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা করেছে তাঁরই একজন দেহরক্ষী। তিনি একটি কাল্পনিক চিত্রনাট্যও তৈরি করে প্রকাশ করলেন। স্বাভাবিক কারণেই চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল, তবে কারো কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। দেশের একটি টিভি চ্যানেল সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তাঁর রিপোর্টের সমর্থনে জানালেন, তিনি দীর্ঘদিন বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন, গুজব ছড়ানো বা অসত্য সংবাদ পরিবেশন করা তাঁর কাজ নয়। সম্প্রতি তিনি ইস্টার্ন লিংক নামের অখ্যাত এক অনলাইন নিউজ পোর্টালে স্বনামে ও বেনামে বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা ধরনের নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করা শুরু করেছেন। একমাত্র উদ্দেশ্য বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা।

সুবীর ভৌমিকের একজন স্বগোত্রীয় বাংলাদেশি সাংবাদিক বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বাস করেন। তিনি একসময় বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনেও রিপোর্টার ছিলেন। খালেদা জিয়াকে তিনি মা ডাকেন বলে তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকে জানা গেছে। পদ্মা সেতু নিয়ে দেশে যখন একটি মহল সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল, তখন এই ব্যক্তি মাইক্রোফোন নিয়ে শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে অন ক্যামেরায় রিকশাওয়ালা, পান দোকানদার, পত্রিকার হকারের কাছে প্রশ্ন করতেন, ‘সরকার তো পদ্মা সেতুর সব অর্থ সরিয়ে ফেলেছে—এ প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য কী?’ পরে একসময় তিনি সুযোগ বুঝে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। বর্তমানে তাঁর কাজ হচ্ছে খুঁজে খুঁজে সরকারবিরোধী অথবা সরকারের ওপর নানা কারণে বিরক্ত ব্যক্তিদের এনে ফেসবুক লাইভে সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের গালগল্প ফাঁদা। সম্প্রতি তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক এক বিতর্কিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ধরে এনে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার, তাঁর প্রয়াত মিলিটারি সেক্রেটারি সম্পর্কে এক কল্পকাহিনি বলেন। শুনেছি, এই কর্মকর্তার খায়েশ ছিল সেনাপ্রধান হওয়ার। তা হতে না পেরে তিনি বর্তমানে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানা ধরনের কল্পকাহিনি প্রচার করার সুযোগ খুঁজছেন আর এই সুযোগে তিনি এই সাংবাদিকের দেওয়া সুযোগ লুফে নিয়েছেন। এই সেনা কর্মকর্তার সব বক্তব্য সমর্থন করে বেশ নিজের খোলামেলা মতামত পেশ করলেন আওয়ামী লীগের এক সাবেক সংসদ সদস্য। এই সাবেক আওয়ামী লীগারকে শেখ হাসিনা একবার সংসদ সদস্য বানিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি মনোনয়ন না পেয়ে সেজে গেলেন তাঁর একজন বিরাট সমালোচক। এ রকম চরিত্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়, তবে আওয়ামী লীগে তাঁদের সংখ্যা সম্ভবত একটু বেশি। কারণ বর্তমানে সম্ভবত সবচেয়ে সহজ কাজ আওয়ামী লীগ বা তার অঙ্গসংগঠনের সদস্য হওয়া এবং সেই সুবাদে দেশে যত রকমের অপকর্ম আছে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া। বঙ্গবন্ধুর সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন তাঁদের শিক্ষা ছিল, দলের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য ছিল, দেশপ্রেম ছিল, তাঁরা সব ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ছিলেন। তবে তখনো এই খলনায়কদের উপস্থিতি ছিল, তবে তাদের আধিপত্য কম ছিল। জাতীয় চার নেতার মধ্যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বা কামারুজ্জামানের ঢাকায় কোনো বাড়ি ছিল না। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী আজীবন যে বাড়ি থেকে রাজনীতি করেছেন সেই বাড়িতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রথম মন্ত্রিসভায় একজন মন্ত্রী ছিলেন। এমন নির্লোভ মানুষ এখনো আওয়ামী লীগে আছেন, তবে তাঁদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এখন এমন সব ব্যক্তি দলে জায়গা করে নিচ্ছেন, যাঁরা দলের আশীর্বাদ হারালে দলের আর দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার বড় সমালোচক বনে যান।

সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও বর্তমানে কভিড-১৯-এর দাপটে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভাইরাসটির যখন আগমন ঘটে তখন বিশ্বের কোনো দেশই প্রস্তুত ছিল না, বাংলাদেশও না। এমনিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য ভালো নয়, তার ওপর এই মহামারির বিপদ। সরকারের চেষ্টা ছিল কিন্তু এই খাতের ব্যবস্থাপনায় যাঁরা জড়িত তাঁদের দূরদর্শিতার অভাব, এই খাতে বেপরোয়া দুর্নীতি আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার ঘাটতির কারণে সরকারের চেষ্টা কিছুটা সফল হতে সময় নিয়েছে। মানুষের ভোগান্তি লাঘব করতে যথারীতি প্রয়োজন হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রথম দিকে সব মহলকেই ভীষণ বেগ পেতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজের সরকারি বাসভবন গণভবনকে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র বানিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চরম আনাড়িপনায় শুরুর দিকে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এই সুযোগে অনেক চোর, ডাকাত, বাটপাড় সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে পড়ে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দুর্নীতির মহোৎসব চালু করার চেষ্টা করেছে।

বর্তমানে দেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ-সুবিধার অনেক সংকট দূর হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ওঠানামা করছে। আর এই সংখ্যা নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ অপরাজনীতি করার সুযোগ খুঁজছে। তাদের মতে, নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কম বলে আক্রান্তের সংখ্যাও কম। কয়েক দিন আগে একজন সবজান্তা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন, জার্মানির মতো উন্নত দেশে করোনায় যদি ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে এত কম মানুষের মৃত্যু ও সংক্রমণ হয় কিভাবে? তিনি ও তাঁর মতো অনেকে প্রায়ই বলে থাকেন, নমুনা পরীক্ষা কম বলে সংক্রমণের সংখ্যাও কম। প্রথম কথা হচ্ছে, সরকার তো রাস্তা থেকে জোরপূর্বক মানুষ ধরে ধরে নমুনা পরীক্ষা করাতে নিয়ে যেতে পারবে না। যাদের সমস্যা আছে তাদের নিজেদেরই এই নমুনা পরীক্ষার জন্য নমুনা পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হবে। গত এক সপ্তাহে আমি চট্টগ্রামের দশটা গ্রামে একটি নমুনা জরিপ করার চেষ্টা করেছি। শুধু একটা গ্রাম থেকে খবর পেয়েছি শুরুর দিকে তাদের দুজন আক্রান্ত হয়েছিল, তবে তারা শহরফেরত। বর্তমানে তাদের গ্রামে কোনো করোনা রোগী নেই। সব গ্রামেই জীবনযাত্রা স্বাভাবিক। আমার এক ছাত্রী জানাল, সে ঈদে নোয়াখালীতে তার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস। সেখানে গিয়ে সে দেখে সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বলে, ‘সবাই মনে করেছে আমিই করোনা রোগী!’

কয়েক দিন আগে দেশের একটি প্রথম সারির ইংরেজি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান সংবাদ ছিল ঢাকার বস্তিতে করোনা রোগী না থাকার কথা। প্রশ্ন ছিল, ‘তাহলে কি এই মহামারি বস্তির গরিব মানুষের জন্য নয়?’ বিশ্বের বৃহত্তম বস্তি মুম্বাইয়ের ধারবি বস্তি, যেখানে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ বাস করে আর প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে দুই লাখ ৭৭ হাজার মানুষ। আয়তন মাত্র দুই বর্গকিলোমিটার। ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেল সেখানে করোনা রোগীর সংখ্যা নগণ্য আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর হচ্ছে এই বস্তির ৫৭ শতাংশ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। এসব দেখেশুনে এবং মৃত ব্যক্তিদের প্রফাইল চেক করে দেখা গেছে, এযাবৎ যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত। আমার একটি ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, যাদের জীবন আরাম-আয়েশে ভরপুর, তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ততটুকু দুর্বল। আমার এই ধারণা নিয়ে অন্য সময় আলোচনা করার ইচ্ছা আছে। যারা বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা বেশি না কেন, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম হারাম হয়, তাদের এসব চিন্তা করে দেখার জন্য বলি। গঠনমূলক সমালোচনা ভালো কিন্তু মতলবের সমালোচনা মানুষকে শুধু বিভ্রান্ত করে, লাভ কিছুই হয় না।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা