kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

শুভ জন্মদিন

শিল্পী গবেষক সংগঠক সন্‌জীদা খাতুন

তুহিন ওয়াদুদ

৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিল্পী গবেষক সংগঠক সন্‌জীদা খাতুন

সন্‌জীদা খাতুন বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ধীরে বয়ে চলা এক প্রগাঢ় প্রবাহ। তিনি সতত অবদমিত। অপ্রতিরোধ্য। ইস্পাতদৃঢ়তায় বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। সন্‌জীদা খাতুনকে মূল্যায়ন করতে হলে সময়ের মলাট খুলে দেখতে হবে তিনি কতটা বিরূপ সময়ের গভীর থেকে উঠে এসেছেন। তাঁকে বুঝতে হলে সময়ের বিশ্লেষণ সাপেক্ষে বুঝতে হবে। আজকের দিনে ৮৭ বছরের যে সন্‌জীদা খাতুনকে আমরা পাই, তার গোড়াপত্তন হয়েছে এক দীর্ঘ প্রতিকূল স্রোতে। বলা যায় প্রতিকূল স্রোতে চলতে গিয়েই তিনি ঈর্ষণীয় দৃঢ়তায়, ব্যক্তিত্ববোধের পরম উচ্চতায় নিজেকে আসীন করেছেন।

প্রথমেই বুঝতে হবে কোন সংস্কৃতিতে সন্‌জীদা খাতুন পথ চলতে শিখেছেন। তিনি জন্মেছেন ব্রিটিশ-ভারতে ১৯৩৩ সালে। তখনকার দিনে বাঙালি মুসলমান পুরুষরাই শিক্ষাবিমুখ ছিলেন। নারীদের লেখাপড়ার পথ ছিল ভীষণতর বন্ধুর। নারীদের জীবন ছিল অবরুদ্ধ। মুসলমান নারীদের সংগীতচর্চাকে রীতিমতো গর্হিত কাজ বিবেচনা করা হতো। সনাতন ধর্মের নারীদেরও স্বাধীন জীবন ছিল না বললেই চলে। কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক রচনাগুলো মুসলমান-হিন্দু উভয় জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছে সমালোচিত হচ্ছিল। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে আলো হয়ে বিকশিত হয়েছেন সন্‌জীদা খাতুন। ষাটের দশকে যখন কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা সংশোধন করার অপচেষ্টা চলেছে তখনো সন্‌জীদা খাতুন পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চার পথ সমুন্নত করার কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীদের যে অবরুদ্ধ জীবনের ছবি এঁকেছিলেন সন্‌জীদা খাতুনের মতো নারীরা সেই অবরুদ্ধতা ভেঙে বেরিয়ে আসা নারী। পঠনে-মনন গঠনে তাঁরা রচনা করেন নতুন পথরেখা। সেই পথরেখায় আজও হাঁটছেন প্রগতিশীল বাঙালি নারীরা। সম্প্রদায়ভেদ-লিঙ্গভেদ তুচ্ছ করা চলা এক পথযাত্রী সন্‌জীদা খাতুন।

ব্রিটিশ-ভারতে ঔপনিবেশিক শোষণে শৈশব কাটিয়েছেন সন্‌জীদা খাতুন। কৈশোরেই দেখেছেন পশ্চিম পাকিস্তানি আগ্রাসন। পূর্ববঙ্গজুড়ে পাকিস্তানি নির্যাতন-পীড়নের কালে যাঁরা রাজনীতির বাইরে থেকে বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছেন তাঁদের অন্যতম সন্‌জীদা খাতুন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পরই ভাষার প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানের অবস্থান পূর্ব পাকিস্তানিদের দ্বিধান্বিত করে। বাধ্য করে আন্দোলন করতে। প্রাণ দিয়ে ভাষা রক্ষায় নিজেদের অবস্থান জানান দেয় পূর্ববঙ্গের আপামর জনতা। সন্‌জীদা খাতুন ভাষা রক্ষার মিছিলে যুক্ত থেকেছেন। যুক্ত থেকেছেন দেশরক্ষার আন্দোলনে।

পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠী ১৯৫৮ সালে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী। সামরিক শাসক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে জেলে দেয়। তখন মূলত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বেঁচে ছিল পাকিস্তানের শোষণ-পীড়নবিরোধী আন্দোলন। উনিশ শতকের ষাটের দশকে তাই সাংস্কৃৃতিক শক্তিকেও অবরুদ্ধ করতে তত্পর হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এই সময় যাঁরা সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দিয়েছিলেন তাঁদের সক্রিয় সংগঠকদের একজন সন্‌জীদা খাতুন।

ষাটের দশকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি সংস্কৃতির চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। তাঁর রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা একাডেমিতে যাতে পালন করা না হয় সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমিতে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। তখন সংস্কৃতিসেবীরা মিলে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী কমিটি গঠন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সন্‌জীদা খাতুনের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

তত্কালীন পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে সংস্কৃতিচর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তখন যাঁরা ছায়ানট প্রতিষ্ঠা করেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম সন্‌জীদা খাতুন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংস্কৃৃতি প্রতিপালনে তথা অনুশীলনের বাতিঘর হয়ে আছে ছায়ানট। ছায়ানট যে প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটি মূল স্রোত বজায় রেখে প্রবাহিত হয়েছে তারও অন্যতম কারণ সন্‌জীদা খাতুনের নিরবধি কর্মী হিসেবে নিবেদিত থাকা। ছায়ানটে যে সংগীত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে তারও সূত্রপাত সন্‌জীদা খাতুনের হাত ধরে।

নিরবধি ছুটে চলা কর্মযোগী হচ্ছেন সন্‌জীদা খাতুন। বাংলাদেশে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলনের আয়োজকদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

সন্‌জীদা খাতুন একাধিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ থেকে রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার ও দেশিকোত্তম পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন তিনি।

তিনি অধ্যাপক, গবেষক, লেখক, শিল্পী, সংগঠক, সম্পাদক, ছায়ানট, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি নির্মোহ মানবিক মূল্যবোধসমৃদ্ধ একজন মানুষ। তাঁর জন্মদিনে পাঠক-স্রোতা-অনুসারীদের পক্ষে বিনম্র প্রণতি। তিনি আরো দীর্ঘকাল নেতৃত্ব দেবেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে—এই আশাবাদ আমাদের।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা