kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

পেশাগত দ্বন্দ্বে পিছিয়ে প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন

ড. মো. সহিদুজ্জামান

২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পেশাগত দ্বন্দ্বে পিছিয়ে প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন

ভেটেরিনারি ও পশুপালন দুটি সম্পূরক পেশার পরস্পরবিরোধী মনোভাব, শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এবং অবস্থান দখলকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ, তা প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে প্রধান অন্তরায়। ফলে কৃষির অন্যান্য সেক্টর, যেমন—কৃষি ও মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন এগিয়ে গেলেও প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ছে। এ দুটি পেশার দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ, যা বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ময়মনসিংহ ৬৯-৭০ শতাংশ কোর্স নিয়ে ডিভিএম ডিগ্রি (ভেটেরিনারি) এবং ২০-৩০ শতাংশ কোর্স নিয়ে বিএসসি এএইচ ডিগ্রি (পশুপালন) প্রবর্তনই পেশাগত বিভাজন বা দ্বন্দ্বের মূল কারণ। এর আগে ভারত বিভাজনের পর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভেটেরিনারিয়ানরা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) এসে কুমিল্লায় একটি ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে, ‘ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি’ নামে তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে। পরে কলেজটি ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান ভেটেরিনারি কলেজ অ্যান্ড এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি রাখা হয় ১৯৫৭ সালে। মাঠপর্যায়ে প্রাণীর সেবা বা ব্যাবহারিক কাজকে অপূর্ণাঙ্গ ও অবিচ্ছেদ্য বিবেচনা করে প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে উভয় ডিগ্রিকে একীভূত করে ডিগ্রির নাম দেওয়া হয়েছিল বিএসসি ভেটসায়েন্স অ্যান্ড এএইচ, যা ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। পূর্ব বাংলার ন্যাশনাল এডুকেশনাল কমিশন এবং ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার কমিশনের সুপারিশে ১৯৬২ সালে আবার এই পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রিটি ভেঙে আলাদা করা হয় এবং ভেটেরিনারি ও পশুপালন নামক দুটি পৃথক অনুষদে বিভক্ত করে আলাদা ডিগ্রি দুটি আবার চালু করা হয় বাকৃবিতে। এরই ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও (পবিপ্রবি) ডিগ্রি দুটি আলাদাভাবে চালু করা হয়।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী মনোভাব বা দ্বন্দ্বের জের গড়ায় মাঠপর্যায়ে। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও ব্যাবসায়িক কর্মক্ষেত্রে এই দুই পেশার গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে তিক্ততার জের নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এই দুই পেশার মুখোমুখি বিরোধ বা পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রায়ই উদ্যোক্তাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। এভাবে প্রাণিসম্পদের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ে সেবা ব্যাহত হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উভয় পেশা, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত গ্র্যাজুয়েট দ্বারা প্রাণিসম্পদের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে এনিম্যাল সায়েন্স বা পশুপালন কোর্সকে ভেটেরিনারি স্কুলে ভর্তির আগে প্রস্তুতিমূলক কোর্স হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ ভেটেরিনারি পেশার গ্র্যাজুয়েট হওয়ার জন্য প্রস্তুতিমূলক কোর্স হিসেবে এনিম্যাল সায়েন্স ডিগ্রি করে থাকে। বিশেষায়িত জ্ঞান ও গবেষণার জন্য ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সের বিভিন্ন ক্ষেত্র উন্মুক্ত থাকলেও সমন্বিত কোর্সের গ্র্যাজুয়েট দিয়ে প্রাণীর সেবা ও সম্পদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হচ্ছে বহির্বিশ্বে। ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ এই দুই পেশার বিভক্তি প্রাণিসম্পদের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা বুঝতে পেরে সমন্বিত বা একক ডিগ্রি ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেও বাংলাদেশে এটি এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

কোনো পেশাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে একজন উদ্যোক্তা বা খামারি তার পালিত গবাদি পশু-পাখির জন্য যেমন চিকিৎসা ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা। অথচ একীভূত ডিগ্রির গ্র্যাজুয়েট দিয়ে উভয় চাহিদা মেটানো সম্ভব। পশু ও পাখির স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনশীল পরিবেশ নিশ্চিতে এই দুই পেশার জ্ঞানের সমন্বয় জরুরি, যা এক স্বাস্থ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পরিবেশের সুস্বাস্থ্য ও প্রণিসম্পদের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশে নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ভূয়সী ভূমিকা রাখবে।

একই দেশে একই কাজের জন্য দুই ধরনের গ্র্যাজুয়েট তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি একদিকে সরকারের শত শত কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষক বা প্রাণী পালনকারীরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের চাহিদা ও সম্ভাবনাময় প্রাণী শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে এবং বাংলাদেশের জনসাধারণের আমিষের জোগান বা পুষ্টির নিশ্চয়তা দিতে দুটি ডিগ্রিকে এক করে স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞানসমৃদ্ধ যুগোপযোগী গ্র্যাজুয়েট তৈরির প্রয়োজনীয়তা বহুদিন থেকে প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে। চাহিদার আলোকে সরকার উদ্যোগী হয়ে যৌথ কারিকুলামসমৃদ্ধ গ্র্যাজুয়েট তৈরির লক্ষ্যে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। প্রাণিসম্পদের উচ্চশিক্ষায় বর্তমানে বাংলাদেশে ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান থেকে সমন্বিত কোর্সের সমন্বয়ে ডিভিএম বা বিএসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি ডিগ্রি প্রদান করা হলেও মাতৃসম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ময়মনসিংহ ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি) থেকে ডিভিএম ও পশুপালন নামে দুটি আলাদা ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে সমন্বিত কোর্স সংবলিত প্রায় ৫০০ জন গ্র্যাজুয়েট প্রতিবছর বের হয়। অপরদিকে বাকৃবির ভেটেরিনারি ও পশুপালন অনুষদ থেকে আলাদাভাবে বের হয় প্রায় ১৮০ জন ডিভিএম এবং ১৫০-১৮০ জন এএইচ গ্র্যাজুয়েট। আবার পবিপ্রবি থেকে এ দুটি ডিগ্রি নিয়ে আলাদাভাবে বের হয় ৫০-৭০ জন গ্র্যাজুয়েট।

প্রাণিজ শিল্পের উদ্যোক্তারা এখন নিয়োগের ক্ষেত্রে সমন্বিত গ্র্যাজুয়েটদের প্রাধান্য দিচ্ছে। এই শিল্পের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ৮০ শতাংশের বেশি গ্র্যাজুয়েট সমন্বিত ডিগ্রিধারী। তাই বর্তমানে দ্বিধাবিভক্ত ডিগ্রিকে একীভূত করা জরুরি, যাতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েটদের কর্মক্ষেত্রে অনুপ্রবেশে সম্মুখীন হতে না হয়। এ ছাড়া আলাদা ডিগ্রি হওয়ায় একই সেক্টরে দুই ধরনের গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ ও পদোন্নয়নের ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিষয়গুলো অনুধাবন করে সর্বশেষ ২০১৭ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ডিগ্রি দুটিকে একীভূত করতে পরিপত্র জারি করলেও কোনো প্রকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি পৃথক ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয়ের তৎকালীন প্রশাসন।

এদিকে সরকারের একীভূত ডিগ্রির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪১তম বিসিএসে লাইভস্টক ক্যাডারে ৭৬টি পদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে শুধু ডিভিএম ডিগ্রিধারীদের জন্য ৫৯টি এবং শুধু এএইচ ডিগ্রিধারীদের জন্য ১৭টি পদ রয়েছে অথচ সমন্বিত ডিগ্রিধারীরা সবগুলো পদেই আবেদন করতে পারবে। কিন্তু বাকৃবি ও পবিপ্রবিতে পৃথক দুটি ডিগ্রি চালু থাকায় পাসকৃত গ্র্যাজুয়েটরা সমস্যায় পড়েছেন চাকরির ক্ষেত্রে। যদিও প্রাণিসম্পদে অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে শুধু ডিভিএম ডিগ্রিধারীদের জন্য এক বছর ও এএইচ ডিগ্রিধারীদের জন্য এক বছর ছয় মাস মেয়াদি মেকআপ কোর্স প্রদানের অপশন রাখা হয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে মেকআপ কোর্স প্রদান বন্ধ হয়ে গেলে এ দুটি পৃথক ডিগ্রির গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সরকারি ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই দেশব্যাপী অভিন্ন কোর্স কারিকুলামে একক ডিগ্রি সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন। উদ্যোগক্তাদের চাহিদা এবং প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচেষ্টা চলছে, সেখানে আমাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা একান্তই কাম্য।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা