kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

সেবার মাঝে পরার্থপরতা কই!

গোলাম কবির

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সেবার মাঝে পরার্থপরতা কই!

সেবাশুশ্রূষা প্রায় সমার্থক শব্দ দুটির মধ্যে সেবা শব্দটির মাহাত্ম্য খর্ব হতে চলেছে। সেবা বলতে সাধারণভাবে বোঝা যায়, নিঃস্বার্থ উপকারের জন্য এগিয়ে আসা। তবে এই সেবা দুস্থের লালনের পরিবর্তে যদি হাতিয়ে নেওয়া বা বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের আগ্রহ বেশি হয়, তাহলে একে সেবা বলা যায় কি না, তা নতুন করে মানুষকে ভাবিত করে। অনুভূত হয় সেবা শব্দটির ওপর ব্যভিচার করার মতো।

আজকাল প্রায় সব শ্রেণির চাকরিকে সেবা বলার রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হচ্ছে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে সেবা অভিধাটি মুখ লুকাবার জায়গা পাচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের কাজের বিনিময়ে নির্ধারিত বেতন থাকে। যাকে ভদ্রভাবে পারিতোষিক বলে চালিয়ে দিতে চাওয়া হয়, তা সে যেভাবেই বলা হোক না কেন এটা কাজের বিনিময়। একে কোনোভাবে সেবা বলা যায় কি!

এখন পত্রপত্রিকায় লেখা হয় : ঘুষ ছাড়া সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে কোনো কাজ হয় না। এ অভিজ্ঞতা অমূলক নয়। আবার তিক্ত রসিকতায় বলা হয় বিশেষ বিশেষ ভবনের চেয়ার-টেবিলও যেন ঘুষ চায়। আরদালি-পিওন ঘুষ না পেলে দর্শনার্থীকে উপেক্ষা করে। এ সংস্কৃতি পুরনো। তবে ধরন বদলেছে। ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের এই যে অশুভ প্রবণতা, সে সংস্কৃতি থেকে পরিত্রাণের জন্য বোধ হয় মার্কস সম্পদ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রেখে ব্যক্তির সম্পদের সীমারেখা টানার পক্ষে ছিলেন। আমরা সেসব মহাদর্শনের কথা বলব না। কারণ সে বিষয়ে আমাদের ধারণা সীমাবদ্ধ।

দৃশ্যমান সামন্ততন্ত্র পর্বের পর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ চালনার যে বিধান শুরু হয়, সেখানে জনগণ রাজা-বাদশা বানায়। এই ধারায় দেশ চালনাকারীদের বলা হয় জনসেবক। এঁরা জনসেবার কথা বলে নির্বাচনের সময় সমর্থন ভিক্ষা করেন। কখনো ধর্মের পোশাকে, কখনো মতবাদের পতাকা উড়িয়ে, কখনো আবার পেশিশক্তির ব্যবহারে ক্ষমতায় বসেন। তারপর সেবা আর ধর্ম থাকে না। এ যেন নিরঙ্কুশ ভোগের অলিখিত অধিকার, অন্যতর সামন্ততন্ত্র।

সম্প্রতি এসব বিষয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি চলছে। জনসেবায় কারা আসবেন। নিঃস্বার্থ সেবা বায়বীয় কাল্পনিক ধারণা। সেবার কাজে নেমে ব্যক্তি আত্মপ্রসাদ লাভ করেন বলে সেখানে স্থিত হন। এখানেও অদৃশ্য থাকে স্বার্থ। মানুষ এ স্বার্থকে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করে। তাই একদা জনসেবা বা রাজনীতির আসরে অবতীর্ণ ব্যক্তিরা বৈষয়িক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা বড় করে দেখতেন না। তাঁদের শ্রদ্ধা-সম্মান দেখাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতেন। এই মহৎ কর্মসাধনা কোথায়! এখন যাঁরা আসছেন, তাঁদের কাজ কারো উদ্দেশ্য বগলদাবা করা! এখন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সবাই রাজদর্শনে আসেন না। নব্য রাজাদের সম্মান দেখানোর জন্য প্রখর রোদে শিশুদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমনকি শিশু-কিশোরদের দিয়ে ছোট্ট খালের ওপর মানব সাঁকোও বানানো হয় কোথাও কোথাও।

যার কাজ তারে সাজে বলে একটা প্রবচন আছে। এখন যার যে কাজ নয়, তাতেই সে প্রলুব্ধ। তারা সেবার নামাবলি পরে আখের গোছানোর ধান্দায় লিপ্ত। এরা কেউ কেউ ধরা পড়ছে। পত্রপত্রিকায় আসছে, কুকীর্তির সব ঘাট সেরে অবৈধ উপার্জিত অর্থের ভেট দিয়ে ক্ষমতার বাহন হিসেবে আসছে। এ কারণে অন্যায়কারী এবং তার সহযোগী সমান দণ্ডে দণ্ডিত হওয়া উচিত।

আমরা আগেই বলেছি, মেকি সেবাদানকারীরা এখন সদর্পে ঘুরে বেড়ায়। ভলতেয়ার বলেছিলেন, জনগণ পরিচ্ছন্ন হলে কৃত্রিম সেবকরা সামনের কাতারে আসতে পারত না। আসলে আমরা সত্যিকার পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠতে পারিনি। অথচ নিজেদের সেবক ভাবছি।

চাকরি করা অবস্থায় অনেকে গাছেরটা খেয়ে তলারটা কুড়িয়ে সচ্ছল জীবন কাটিয়ে দেন। তাতে কারো কারো মন ভরে না। কয়েক পুরুষ ধরে স্বচ্ছন্দে থাকার ব্যবস্থা করতে উদ্বাহু। যোগ্য ব্যক্তিকে যথাস্থানে নিয়োগ করা হলে সেই সঙ্গে চমক সৃষ্টি করে ক্ষমতাবানদের অন্ধকার পথে আগ্রাসী হওয়ার পথ রুদ্ধ করতে পারলে অনাচার কমে আসবে এবং সেবার নামে সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে সাহস করবে না কেউ।

সত্যিকারের সেবাদানকারী গ্রাসাচ্ছাদনের অভাব পূরণ করে জনগণ। তাতে মোক্ষ লাভের বাসনা সন্তর্পণে থাকে হয়তো, অনেক সময় তথাকথিত সেবকদের বিত্তবৈভবের পরিধি দেখে বিস্ময়ের অবধি থাকে না। এখানেও কোনো মন্তব্য করা সহজ নয়। ফলে সেসব সেবক যে অজান্তে জোঁকের মতো মূঢ় মানুষের রক্ত শোষণ করছে, তা ভেবে দেখার অবকাশ আমরা পাই না বলে সামাজিক অনাসৃষ্টিকে আসমানি বালা বলে সান্ত্বনা পেয়ে থাকি।

সামাজিক এত সব ব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে হলে সত্যিকার সেবার অর্থ বোঝা দরকার। তখন ছদ্মবেশী সেবাদানকারী কোনো ব্যক্তি অন্যায় কাজে প্রলুব্ধ হবে না।

 

লেখক : সাবেক শিক্ষক

রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা