kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

উন্নয়নের আত্মপ্রসাদ ও গৃহকর্মীদের আর্তনাদ

ফরিদুর রহমান

৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উন্নয়নের আত্মপ্রসাদ ও গৃহকর্মীদের আর্তনাদ

গৃহকর্মী নাজমা বেগম সৌদি আরব থেকে স্বজনদের কাছে পাঠানো এক বার্তায় দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছিলেন। পাঁচ মিনিট ১১ সেকেন্ডের এই ভিডিও বার্তায় সৌদি গৃহস্বামী এবং তাঁদের পরিবারের অন্যদের অকথ্য নির্যাতনের বিবরণের পাশাপাশি কান্নাজড়িত কণ্ঠে একাধিকবার তিনি তাঁর জীবনের আশঙ্কার কথা বলেছেন। একটি টয়লেট থেকে লুকিয়ে কথা বলার সময় নাজমা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ মিশনে ফোন করা হলে সেখান থেকেও অশ্লীল ইঙ্গিত করে, মালিকপক্ষ কী ধরনের নির্যাতন করেছে তা তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়! নাজমাকে অবশ্য খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি, এই ভিডিও কলে কথা বলার অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি তাঁর স্বদেশ, প্রিয় বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। তবে নিজের পায়ে হেঁটে নয়, নাজমা এসেছেন কফিনের বাক্সে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুসারে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ১১টি শবদেহ বাক্সবন্দি হয়ে দেশে পৌঁছাচ্ছে। এসব কফিনে যাঁরা ফিরে আসছেন তাঁদের মধ্যে নানা পেশায় কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ ছাড়াও এসেছে বিপুলসংখ্যক নারী গৃহকর্মীর লাশ। বাংলাদেশ থেকে গত সাড়ে তিন বছরে আড়াই লাখেরও বেশি নারী গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যাত্রা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অত্যাচারে, অনাহারে, নিপীড়নে, নির্যাতনে এবং অসুস্থতায় সাড়ে তিন বছরে সৌদি আরবেই মৃত্যুবরণ করেছেন সাড়ে তিন শতাধিক নারী। যেসব গৃহকর্মী জীবন নিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন, তাঁদের মধ্যে শরিয়তপুরের কুলসুম, ভোলার শামসুন্নাহার, খুলনার কবিরুন, শেরপুরের হাজেরা ও মৃত নাজমাসহ আরো অসংখ্য ভাগ্যবিড়ম্বিত নারীর বয়ান থেকে জানা যায়, সৌদি গৃহকর্তা এবং পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দ্বারা যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ, চাবুক এবং লাঠির প্রহার, শরীরে গরম পানি ও গরম তেল ঢেলে দেওয়া, শরীরে গরম ছেঁকা দেওয়া, বাথরুমে বা অন্ধকার ঘরে বন্ধ করে রাখা এবং যথেষ্ট খাবার খেতে না দেওয়া ইত্যাদি অনেকের ক্ষেত্রেই ছিল প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব হত্যাকাণ্ড প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই হৃদরোগের কারণে মৃত্যু অথবা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর কারণ যদি আত্মহত্যাও হয়, তাহলে স্বামী, সন্তান ফেলে রেখে ভাগ্য ফেরাতে বিদেশে যাওয়া একজন কর্মঠ নারী জীবনের কোন দুঃসহ পর্যায়ে পৌঁছালে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।  

বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা অবশ্য নির্যাতন-নিপীড়নের বিষয়টি স্বীকার না করে এটি গৃহকর্মীদের দেশে ফেরার ‘অজুহাত’ বলে মনে করেন। তাঁরা গৃহকর্মীদের ভাষাজ্ঞানের অভাব, সৌদিদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে চলতে না পারা এবং সাংস্কৃতিক বৈপরীত্যের পাশাপাশি নানাভাবে আমাদের গৃহকর্মী নারীদের দোষত্রুটি খুঁজে বের করে তাঁদের ওপরই সব দায়ভার চাপিয়ে নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পন্ন করেন। গত বছর অবসরে যাওয়ার আগে প্রবাসী কল্যাণ বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ‘সৌদি ফেরত গৃহকর্মীরা দেশে ফেরার জন্য গল্প বানায়!’ সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে গৃহকর্মী নারীদেরই একতরফাভাবে দায়ী করে একই ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন।

আমাদের মনে রাখা দরকার, এই সৌদি আরব নবী করিম (সা.)-এর পুণ্যভূমি নয়, এই সৌদি আরব বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে, এই সৌদি আরব পবিত্র হজকে উপলক্ষ করে সারা বিশ্বের পুণ্যার্থী মুসলমানের কাছ থেকে অর্জিত অর্থে আগ্নেয়াস্ত্র কিনে ইয়েমেনের নিরপরাধ নারী ও শিশু হত্যায় ব্যবহার করছে এবং এই সৌদি আরব পবিত্র কাবা শরিফ ও মক্কা-মদিনা নগরীর হেফাজতকারীর ইমেজের আড়ালে ইরানকে কোণঠাসা করার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিস্তৃত করে চলেছে।

বিশ্বের যেকোনো ভূখণ্ডে আমরা যখন নির্বিচারে নির্যাতন বা হত্যার কথা জানতে পারি, তখন সঙ্গত কারণেই মনে হয় অবর্ণনীয় নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে নিশ্চয়ই সেই দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দায়ী। কিন্তু আমরা যদি সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে সে দেশের বর্বর মধ্যযুগীয় বিচারব্যবস্থা সম্পর্কেও কিছুটা ধারণা হতে পারে, যে বিচারব্যবস্থা অসহায় ও দুর্বল গৃহকর্মীর শিরশ্ছেদ এবং প্রবল শক্তিধর মালিকের স্বার্থ সংরক্ষণের বিধিমালায় সুরক্ষিত।

ইন্দোনেশিয়া থেকে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে আসা তুতি তারসিলাওয়াতির মৃত্যুদণ্ডের মধ্য দিয়ে সৌদি বিচারব্যবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে। ২০০৯ সালে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে সৌদি আরবে আসেন তুতি। ২০১০ সালে ধর্ষণে বাধা দেওয়ার একপর্যায়ে তুতির ছুরিকাঘাতে সৌদি গৃহকর্তা নিহত হন। বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া তুতি গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আরো ৯ জন সৌদি বর্বরের ধর্ষণের শিকার হন। সৌদি বিচারে ধর্ষকদের কোনো নামই উচ্চারিত হয়নি; কিন্তু মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন তুতি তারসিলাওয়াতি। ইন্দোনেশিয়ার সরকার ও অসংখ্য মানবাধিকার সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব নেতাদের অনুরোধ উপেক্ষা করে গত বছর ২৯ অক্টোবর তুতির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।   

শ্রমজীবী নারীদের যথাযথ মজুরি পরিশোধ না করা, চুক্তিভঙ্গ করে ভিন্ন মালিকের কাছে হস্তান্তর করা, যথেষ্ট খাবার না দেওয়া এবং নির্যাতন, ধর্ষণ ও আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার কারণে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনস এবং শ্রীলঙ্কা অনেক আগেই সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করেছে। আমরা কি শুধু আমাদের রেমিট্যান্সের প্রবাহ অব্যাহত রাখতে আমাদের মা-বোন ও মেয়েদের বিবেকবর্জিত সৌদি পুরুষদের বিকৃত লালসার সামনে ঠেলে দেব? সরকার যদি সম্মানজনক শর্ত কার্যকর করে নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে শ্রমজীবী মানুষকে বিদেশে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে, তাহলেই তা দেশের সমৃদ্ধি ও দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন বলে ধরা যেতে পারে। মেরুদণ্ডহীন আমলা কর্মচারী দিয়ে সম্পাদিত নতজানু দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মধ্যে অর্থ উপার্জনের আত্মপ্রসাদ আছে, সম্মান ও মানবিক বিবেচনাবোধ নেই। আসল কথা হলো, উন্নয়নের ঢক্কানিনাদের আড়ালে আমরা আর কোনো নাজমা, কুলসুম কিংবা সালমার আর্তচিৎকার হারিয়ে যেতে দিতে চাই না।  

 

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা