করোনাভাইরাস মহামারির সময় অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিটিমিটেড বন্ধ করে দেওয়া হয়। কপাল পোড়ে দেড় হাজারের বেশি শ্রমিকের। বন্ধ হওয়ার আগে এই প্রতিষ্ঠানে ১৮ বছর চাকরি করেছেন মো. আব্দুল কুদ্দুছ। তিনি ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিমিটেডের প্রোডাকশন বিভাগের ফ্লোর ম্যানেজার ছিলেন। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ার সময় কুদ্দুছের সাত মাসের বেতন বকেয়া ছিল। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিমিটেড পর্যায়ক্রমে কুদ্দুছসহ বাকিদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করে। সে সময় প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধেরও দাবি জানান তাঁরা। কিন্তু মালিকপক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শরণাপন্ন হন কুদ্দুছসহ বাকিরা। তাঁদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মালিক-শ্রমিক-অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী চার কিস্তিতে সব পাওনা পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিমিটেড কুদ্দুছসহ অনেকের পাওনাই আর পরিশোধ করেনি। এরপর আবার আন্দোলনে নামেন তাঁরা। কাজ না হওয়ায় ২০২১ সালে ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। সে মামলা এখনো বিচারাধীন।
পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে দুই হাজার ৭৬টি মামলার বিচারকাজ। অথচ শ্রম আইনের ২১১(৬) ধারায় আদালতে অভিযোগ দাখিলের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। যদি এই সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি সম্ভব না হয়, তবে উপযুক্ত কারণ উল্লেখ করে আদালত সময় আরো ৯০ দিন বাড়াতে পারেন। সব মিলিয়ে আইনে ১৫০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৩টি শ্রম আদালতে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা এক হাজার ৮৯৯। দেওয়ানি মামলা রয়েছে দুই হাজার ৯০২টি। আর একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ২৭৫টি মামলা চলছে।
মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. হেদায়েতুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেশির ভাগ সময় দ্বিতীয় পক্ষের (বিবাদী) সময় আবেদনের কারণে মামলার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটে। তবে মামলা নিষ্পত্তির সাম্প্রতিক হার আগের চেয়ে ভালো।’ তবে আপসের মাধ্যমে মামলা দায়ের কমানো গেলে মামলাজট কমবে বলে মনে করেন তিনি।
৬ মাসের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ১৩ হাজার ৮৩৩টি মামলা
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের ১৩টি শ্রম আদালত ও একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৭ হাজার ৫৪৬। এর মধ্যে ১৩টি শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৬ হাজার ৪৫৩ এবং শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এক হাজার ৯৩। এসব আদালতে ছয় মাসের (১৮০ দিন) বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ১৩ হাজার ৮৩৩টি মামলা। আর উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত হয়ে আছে ৭০টি মামলার বিচারকাজ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতে ১০ হাজার ৬০টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে প্রথম আদালতে চার হাজার ৪৯৩টি, দ্বিতীয় আদালতে ছয় হাজার ৩৯৮টি এবং তৃতীয় শ্রম আদালতে তিন হাজার ১৬৯টি মামলা বিচারাধীন।
চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতে যথাক্রমে এক হাজার ৬৭০ এবং ৮৬৯টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ১৬৪টি, রাজশাহীতে ৮৫টি, রংপুরে ১০২টি, সিলেটে ৬৪টি, বরিশালে ৬৮টি, নারায়ণগঞ্জে দুই হাজার ৮১৫টি, কুমিল্লায় ৩২৬টি এবং গাজীপুরে ছয় হাজার ২৩০ মামলা বিচারাধীন।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণঞ্জ ও চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি শ্রম মামলা বিচারাধীন। অন্যদিকে বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহীর শ্রম আদালতে মামলা রয়েছে ১০০টিরও কম। রংপুর ও খুলনার আদালতে রয়েছে এক শর কিছু বেশি মামলা।
শ্রমিকদের পক্ষে নিয়মিত মামলা লড়ে থাকেন জজকোর্টের আইনজীবী এ কিউ এম কাদের। শ্রম আদালতে মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতার জন্য এই আইনজীবী আইনি অস্পষ্টতাকে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, ‘সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা বলা আছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি তো হচ্ছে না। আর না হলে কী করতে হবে তা আইনে বলা নেই। ফলে এর সুযোগ নিচ্ছে দ্বিতীয় পক্ষ (বিবাদী)। তারা নানা অজুহাতে সময় নিচ্ছে। এক পর্যায়ে মামলার কার্যক্রম ঝুলে যায়। আর এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন খেটে খাওয়া শ্রমিক-কর্মচারীরা।’ আইনজীবী এ কিউ এম কাদেরের মতে, শিল্প এলাকায় শ্রম আদালত স্থাপন করা উচিত।
একই মত গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহকারী সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈনেরও। এই শ্রমিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস করতে না পারলে শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। হচ্ছেনও তাই।’
তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ মামলা নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আর বিচারে বিলম্ব হওয়ায় শ্রমিকরা একটা পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেন। কারণ তাদের তো অন্য কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে খেতে হয়। বছরের পর বছর ধরে একজন শ্রমিক মামলার পেছনে আদালতে দৌড়াবেন, না কাজ করবেন?’
শ্রম আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি—দুই ধরনের মামলাই হয়ে থাকে। দেওয়ানি মামলাগুলো মূলত কর্মীদের বেতন বকেয়াসংক্রান্ত। অন্যদিকে ফৌজদারি মামলাগুলো মূলত কারখানা মালিকদের আইন না মানা সংক্রান্ত। ফৌজদারি মামলার বেশির ভাগই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) পরিদর্শক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর। এ ছাড়া রয়েছে শ্রম আদালতের আদেশ অবমাননাসংক্রান্ত মামলাও।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার সংখ্যা অনুপাতে শ্রম আদালতের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। তা না হলে শ্রম আদালতের প্রতি শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষই আস্থা হারাবে।’ শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় শ্রম আইন দ্রুত যুগোপযোগী করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।



