• ই-পেপার

জীবিকার তাগিদে নির্ঘুম আর সাহসী রাত কাটে যে নারী শ্রমিকদের

বিলম্ব বিচারের শিকার শ্রমিকরা, ঝুলছে ২৮ হাজার মামলা

মেহেদী হাসান পিয়াস
বিলম্ব বিচারের শিকার শ্রমিকরা, ঝুলছে ২৮ হাজার মামলা

করোনাভাইরাস মহামারির সময় অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিটিমিটেড বন্ধ করে দেওয়া হয়। কপাল পোড়ে দেড় হাজারের বেশি শ্রমিকের। বন্ধ হওয়ার আগে এই প্রতিষ্ঠানে ১৮ বছর চাকরি করেছেন মো. আব্দুল কুদ্দুছ। তিনি ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিমিটেডের প্রোডাকশন বিভাগের ফ্লোর ম্যানেজার ছিলেন। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ার সময় কুদ্দুছের সাত মাসের বেতন বকেয়া ছিল। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিমিটেড পর্যায়ক্রমে কুদ্দুছসহ বাকিদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করে। সে সময় প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধেরও দাবি জানান তাঁরা। কিন্তু মালিকপক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শরণাপন্ন হন কুদ্দুছসহ বাকিরা। তাঁদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মালিক-শ্রমিক-অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী চার কিস্তিতে সব পাওনা পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিমিটেড কুদ্দুছসহ অনেকের পাওনাই আর পরিশোধ করেনি। এরপর আবার আন্দোলনে নামেন তাঁরা। কাজ না হওয়ায় ২০২১ সালে ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। সে মামলা এখনো বিচারাধীন।

পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে দুই হাজার ৭৬টি মামলার বিচারকাজ। অথচ শ্রম আইনের ২১১(৬) ধারায় আদালতে অভিযোগ দাখিলের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। যদি এই সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি সম্ভব না হয়, তবে উপযুক্ত কারণ উল্লেখ করে আদালত সময় আরো ৯০ দিন বাড়াতে পারেন। সব মিলিয়ে আইনে ১৫০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৩টি শ্রম আদালতে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা এক হাজার ৮৯৯। দেওয়ানি মামলা রয়েছে দুই হাজার ৯০২টি। আর একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ২৭৫টি মামলা চলছে।

মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. হেদায়েতুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বেশির ভাগ সময় দ্বিতীয় পক্ষের (বিবাদী) সময় আবেদনের কারণে মামলার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটে। তবে মামলা নিষ্পত্তির সাম্প্রতিক হার আগের চেয়ে ভালো। তবে আপসের মাধ্যমে মামলা দায়ের কমানো গেলে মামলাজট কমবে বলে মনে করেন তিনি।

 

৬ মাসের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ১৩ হাজার ৮৩৩টি মামলা

শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের ১৩টি শ্রম আদালত ও একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৭ হাজার ৫৪৬। এর মধ্যে ১৩টি শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৬ হাজার ৪৫৩ এবং শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এক হাজার ৯৩। এসব আদালতে ছয় মাসের (১৮০ দিন) বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ১৩ হাজার ৮৩৩টি মামলা। আর উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত হয়ে আছে ৭০টি মামলার বিচারকাজ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতে ১০ হাজার ৬০টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে প্রথম আদালতে চার হাজার ৪৯৩টি, দ্বিতীয় আদালতে ছয় হাজার ৩৯৮টি এবং তৃতীয় শ্রম আদালতে তিন হাজার ১৬৯টি মামলা বিচারাধীন।

চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতে যথাক্রমে এক হাজার ৬৭০ এবং ৮৬৯টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ১৬৪টি, রাজশাহীতে ৮৫টি, রংপুরে ১০২টি, সিলেটে ৬৪টি, বরিশালে ৬৮টি, নারায়ণগঞ্জে দুই হাজার ৮১৫টি, কুমিল্লায় ৩২৬টি এবং গাজীপুরে ছয় হাজার ২৩০ মামলা বিচারাধীন।

পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণঞ্জ ও চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি শ্রম মামলা বিচারাধীন। অন্যদিকে বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহীর শ্রম আদালতে মামলা রয়েছে ১০০টিরও কম। রংপুর ও খুলনার আদালতে রয়েছে এক শর কিছু বেশি মামলা।

শ্রমিকদের পক্ষে নিয়মিত মামলা লড়ে থাকেন জজকোর্টের আইনজীবী এ কিউ এম কাদের। শ্রম আদালতে মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতার জন্য এই আইনজীবী আইনি অস্পষ্টতাকে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা বলা আছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি তো হচ্ছে না। আর না হলে কী করতে হবে তা আইনে বলা নেই। ফলে এর সুযোগ নিচ্ছে দ্বিতীয় পক্ষ (বিবাদী)। তারা নানা অজুহাতে সময় নিচ্ছে। এক পর্যায়ে মামলার কার্যক্রম ঝুলে যায়। আর এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন খেটে খাওয়া শ্রমিক-কর্মচারীরা। আইনজীবী এ কিউ এম কাদেরের মতে, শিল্প এলাকায় শ্রম আদালত স্থাপন করা উচিত।

একই মত গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহকারী সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈনেরও। এই শ্রমিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস করতে না পারলে শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। হচ্ছেনও তাই।

তিনি বলেন, বেশির ভাগ মামলা নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আর বিচারে বিলম্ব হওয়ায় শ্রমিকরা একটা পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেন। কারণ তাদের তো অন্য কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে খেতে হয়। বছরের পর বছর ধরে একজন শ্রমিক মামলার পেছনে আদালতে দৌড়াবেন, না কাজ করবেন?

শ্রম আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারিদুই ধরনের মামলাই হয়ে থাকে। দেওয়ানি মামলাগুলো মূলত কর্মীদের বেতন বকেয়াসংক্রান্ত। অন্যদিকে ফৌজদারি মামলাগুলো মূলত কারখানা মালিকদের আইন না মানা সংক্রান্ত। ফৌজদারি মামলার বেশির ভাগই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) পরিদর্শক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর। এ ছাড়া রয়েছে শ্রম আদালতের আদেশ অবমাননাসংক্রান্ত মামলাও।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলার সংখ্যা অনুপাতে শ্রম আদালতের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। তা না হলে শ্রম আদালতের প্রতি শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষই আস্থা হারাবে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় শ্রম আইন দ্রুত যুগোপযোগী করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

মাহমুদুর রহমান মান্না

শ্রমিক কল্যাণে কার্ড নয়, দরকার বাস্তব সুফল

নিজস্ব প্রতিবেদক
শ্রমিক কল্যাণে কার্ড নয়, দরকার বাস্তব সুফল

ফ্যামিলি কার্ড ও শ্রমিক কার্ডসহ সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, শ্রমিক কল্যাণে কার্ড নয়, দরকার বাস্তব সুফল।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় মান্না এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশে ফ্যামিলি কার্ড ও শ্রমিক কার্ড নিয়ে অনেক কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এগুলো সত্যিকার অর্থে মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

মান্না অভিযোগ করেন, সরকারের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ীও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অযোগ্য ব্যক্তি এসব কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, কেবল কার্ড বিতরণের মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁদের জন্য প্রয়োজন টেকসই কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সরাসরি আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা। কার্ডের রাজনীতি দিয়ে হবে না, মানুষের জন্য দৃশ্যমান ও কার্যকর সুফল নিশ্চিত করতে হবে।

আজ মহান মে দিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ মহান মে দিবস

মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাঁদের কল্যাণে যুগান্তকারী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেই শহীদ জিয়া নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আরো বলেন, মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৮৮৬ সালের এ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের সেই আত্মত্যাগ শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজও আমাদের প্রেরণা ও শক্তি জোগায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাঁদের কল্যাণে যুগান্তকারী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার শ্রম আইন সংস্কার, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে পেনশন ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, বন্ধ শিল্প চালু, ন্যায্যমূল্যে খাবার সরবরাহ, স্থায়ী শ্রমিক ও কর্মচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতসহ শ্রমিকসমাজের ভাগ্যোন্নয়নে নানা কর্মসূচি ও নীতি গ্রহণ করেছে। আমি আশা করি, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই দিনে আমি দেশে-বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের সকল শ্রমজীবী-কর্মজীবী ভাই-বোন, যাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য, সর্বোপরি দেশের উন্নয়নের জন্য কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন, তাঁদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষই যেকোনো দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি আর অগ্রযাত্রার প্রধান অবলম্বন। শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। সুতরাং তাঁদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানতম অঙ্গীকার। আমি মনে করি, শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব।

কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর তালিকায় তৃতীয় সর্বোচ্চ নির্মাণ শ্রমিক

নির্মাণ খাতে বছরে ১২০ শ্রমিকের মৃত্যু

মাসুদ রায়হান পলাশ
নির্মাণ খাতে বছরে ১২০ শ্রমিকের মৃত্যু

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আরশিনগর লাবনী লেক সিটির পাশে একটি বহুতল নির্মীয়মাণ ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করছিলেন রনি (২৮)। গত ২৪ এপ্রিলের ঘটনা। তিনি ভবনের নিচে ছিলেন। ঢালাইয়ের ডাব্বর (লোহার পাত্র) তোলার সময় রশি ছিঁড়ে তাঁর মাথায় পড়ে। তিনি গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইট সোসাইটির (এসআরএস) তথ্য মতে, দেশের নির্মাণ খাতে ২০২৫ সালে ৯৭টি ঘটনায় ১২০ জন নিহত হয়েছে। দেশে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মৃত্যু পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ, আর তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু নির্মাণ খাতে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা জানান, শুধু ২০২৫ সালেই নয়, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৩৫৯ শ্রমিক নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে ৯২, ২০২৩ সালে ১৭৪, ২০২২ সালে ১০৪, ২০২১ সালে ১৩৯, ২০২০ সালে ১১৮, ২০১৯ সালে ১৩০, ২০১৮ সালে ১৮৫, ২০১৭ সালে ১৪৫, ২০১৬ সালে ১২৫ ও ২০১৫ সালে ১৪৭ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। এসআরএসের তথ্য, ২০২৫ সালে সব মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে ৮০২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খানে সর্বোচ্চ ৩৮৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪৫ জন সেবা খাতে, তৃতীয় সর্বোচ্চ ১২০ জন নির্মাণ খাতে, কৃষি খাতে ৯৪ জন ও উৎপাদন খাতে ৫৮ জন শ্রমিক নিহত হন।

এদিকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় সারা দেশে গত ১৫ মাসে ৯২১ শ্রমিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস। সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ১৮৬ জন ও ২০২৫ সালে ৭৩৫ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি রাজধানীতে বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মক্ষেত্র পরিস্থিতি সংক্রান্তের এক সেমিনারে সংবাদপত্র ভিত্তিক জরিপ-২০২৫ ও জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬-এ এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বিলস পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়কালে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় যে ১৮৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তার মধ্যে ১৮৫ জন পুরুষ এবং একজন নারী শ্রমিক।

গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরে বিলস। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহবান জানানো হয়।

লাবনী লেক সিটির বহুতল ভবনে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিক রনির সহকর্মী সেলিম গত বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, দুর্ঘটনা তো আর বলে-কয়ে আসে না। ওই দিন আমিও মরতে পারতাম। রশি ছিঁড়ে প্রথমে মেশিনে (মিক্সচার মেশিন) পড়ে। তারপর রনির গায়ে লাগে। আশপাশে আরো চার-পাঁচজন ছিলেন। তাঁরাও মরতে পারতেন। কেউ আহত হননি। শুধু রনিই মারা গেলেন। রনির পরিবারের সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকায় মিটমাট হয়ে গেছে। আগামী ৫ মে টাকা দেওয়ার কথা। এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। গত ১৫ এপ্রিল রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় পাঁচতলা বাজার এলাকার একটি নির্মীয়মাণ ভবনের ছয়তলা থেকে পড়ে নাজমুল হোসেন (২৮) নামের এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার মৃতের সহকর্মী ও খালাতো ভাই জয়নুল আবেদিন কালের কণ্ঠকে বলেন, নাজমুল ভাই রডের কাজ করত। ছয়তলা ভবনে কলাম ঢালাইয়ের কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তিনি নিচে পড়ে যান। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। শ্রম আইন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকারীর। শ্রমিকের ব্যক্তিগত সুরক্ষা যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া নিয়োগকারী কাউকে কাজে নিয়োগ করতে পারবেন না। কিন্তু আইনের এই বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা তেমন কার্যকর হয় না বলে দাবি করেছেন ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান আজিজ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হেলমেট, গামবুট, নিরাপত্তা বেল্টসহ অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণ ছাড়াই কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। বড় বড় ডেভেলপার কম্পানি ছাড়া অধিকাংশ ছোট ছোট কম্পানি এগুলো যথায়থভাবে সরবরাহ করে না। হাতে গোনা কয়েকটি ডেভেলপার কম্পানি শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে এসব নিরাপত্তাসামগ্রী দিয়ে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোথাও কোথাও এসব নিরাপত্তাসামগ্রী থাকলেও তা শ্রমিকরা অসচেতনতার কারণে ব্যবহার করেন না। এ জন্য শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের দরকার হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না।

কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে কালের কণ্ঠ। তাঁদের একজন আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, পেটের দায়ে কাজ করি। যে কম্পানিতে কাজ করি, তারা যেখানে নিয়ে যায়, সেখানে যাই। কম হলেও আমাদের যেসব সামগ্রী দেওয়া হয়, আমরা তা নিয়ে কাজ করি। তবে শুধু কম্পানির দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরাও সব সময় নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার করি না।

সেফটি অ্যান্ড রাইট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, একটি কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কেমন হবে, তা নিয়ে সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকের ধারণার ঘাটতি রয়েছে। বাস্তবায়নের ঘাটতির কথা নাই বা বললাম। মালিক ও শ্রমিকের বোঝাপড়ার ব্যাপারটা বড়। আবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর, তাদের মূল দায়িত্ব কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ঠিক রাখা। স্বাস্থ্য নিরাপত্তার মান যেন ঠিক থাকে। শ্রমিকের অধিকার যেন প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রম অধিদপ্তরেরও দায়িত্ব রয়েছে শ্রমিকের অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। কিন্তু এগুলো ঠিকঠাকভাবে হচ্ছে না। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। এগুলো নিয়ে ভাবা দরকার। নতুবা প্রতি বছরের এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না।

জীবিকার তাগিদে নির্ঘুম আর সাহসী রাত কাটে যে নারী শ্রমিকদের | কালের কণ্ঠ