রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আরশিনগর লাবনী লেক সিটির পাশে একটি বহুতল নির্মীয়মাণ ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করছিলেন রনি (২৮)। গত ২৪ এপ্রিলের ঘটনা। তিনি ভবনের নিচে ছিলেন। ঢালাইয়ের ডাব্বর (লোহার পাত্র) তোলার সময় রশি ছিঁড়ে তাঁর মাথায় পড়ে। তিনি গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইট সোসাইটির (এসআরএস) তথ্য মতে, দেশের নির্মাণ খাতে ২০২৫ সালে ৯৭টি ঘটনায় ১২০ জন নিহত হয়েছে। দেশে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মৃত্যু পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ, আর তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু নির্মাণ খাতে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা জানান, শুধু ২০২৫ সালেই নয়, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৩৫৯ শ্রমিক নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে ৯২, ২০২৩ সালে ১৭৪, ২০২২ সালে ১০৪, ২০২১ সালে ১৩৯, ২০২০ সালে ১১৮, ২০১৯ সালে ১৩০, ২০১৮ সালে ১৮৫, ২০১৭ সালে ১৪৫, ২০১৬ সালে ১২৫ ও ২০১৫ সালে ১৪৭ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। এসআরএসের তথ্য, ২০২৫ সালে সব মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে ৮০২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খানে সর্বোচ্চ ৩৮৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪৫ জন সেবা খাতে, তৃতীয় সর্বোচ্চ ১২০ জন নির্মাণ খাতে, কৃষি খাতে ৯৪ জন ও উৎপাদন খাতে ৫৮ জন শ্রমিক নিহত হন।
এদিকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় সারা দেশে গত ১৫ মাসে ৯২১ শ্রমিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস। সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ১৮৬ জন ও ২০২৫ সালে ৭৩৫ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি রাজধানীতে ‘বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মক্ষেত্র পরিস্থিতি’ সংক্রান্তের এক সেমিনারে সংবাদপত্র ভিত্তিক জরিপ-২০২৫ ও জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬-এ এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বিলস পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়কালে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় যে ১৮৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তার মধ্যে ১৮৫ জন পুরুষ এবং একজন নারী শ্রমিক।
গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরে বিলস। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহবান জানানো হয়।
লাবনী লেক সিটির বহুতল ভবনে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিক রনির সহকর্মী সেলিম গত বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা তো আর বলে-কয়ে আসে না। ওই দিন আমিও মরতে পারতাম। রশি ছিঁড়ে প্রথমে মেশিনে (মিক্সচার মেশিন) পড়ে। তারপর রনির গায়ে লাগে। আশপাশে আরো চার-পাঁচজন ছিলেন। তাঁরাও মরতে পারতেন। কেউ আহত হননি। শুধু রনিই মারা গেলেন। রনির পরিবারের সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকায় মিটমাট হয়ে গেছে। আগামী ৫ মে টাকা দেওয়ার কথা। এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। গত ১৫ এপ্রিল রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় পাঁচতলা বাজার এলাকার একটি নির্মীয়মাণ ভবনের ছয়তলা থেকে পড়ে নাজমুল হোসেন (২৮) নামের এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার মৃতের সহকর্মী ও খালাতো ভাই জয়নুল আবেদিন কালের কণ্ঠকে বলেন, নাজমুল ভাই রডের কাজ করত। ছয়তলা ভবনে কলাম ঢালাইয়ের কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তিনি নিচে পড়ে যান। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। শ্রম আইন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকারীর। শ্রমিকের ব্যক্তিগত সুরক্ষা যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া নিয়োগকারী কাউকে কাজে নিয়োগ করতে পারবেন না। কিন্তু আইনের এই বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা তেমন কার্যকর হয় না বলে দাবি করেছেন ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান আজিজ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হেলমেট, গামবুট, নিরাপত্তা বেল্টসহ অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণ ছাড়াই কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। বড় বড় ডেভেলপার কম্পানি ছাড়া অধিকাংশ ছোট ছোট কম্পানি এগুলো যথায়থভাবে সরবরাহ করে না। হাতে গোনা কয়েকটি ডেভেলপার কম্পানি শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে এসব নিরাপত্তাসামগ্রী দিয়ে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোথাও কোথাও এসব নিরাপত্তাসামগ্রী থাকলেও তা শ্রমিকরা অসচেতনতার কারণে ব্যবহার করেন না। এ জন্য শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের দরকার হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না।
কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে কালের কণ্ঠ। তাঁদের একজন আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, ‘পেটের দায়ে কাজ করি। যে কম্পানিতে কাজ করি, তারা যেখানে নিয়ে যায়, সেখানে যাই। কম হলেও আমাদের যেসব সামগ্রী দেওয়া হয়, আমরা তা নিয়ে কাজ করি। তবে শুধু কম্পানির দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরাও সব সময় নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার করি না।’
সেফটি অ্যান্ড রাইট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘একটি কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কেমন হবে, তা নিয়ে সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকের ধারণার ঘাটতি রয়েছে। বাস্তবায়নের ঘাটতির কথা নাই বা বললাম। মালিক ও শ্রমিকের বোঝাপড়ার ব্যাপারটা বড়। আবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর, তাদের মূল দায়িত্ব কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ঠিক রাখা। স্বাস্থ্য নিরাপত্তার মান যেন ঠিক থাকে। শ্রমিকের অধিকার যেন প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রম অধিদপ্তরেরও দায়িত্ব রয়েছে শ্রমিকের অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। কিন্তু এগুলো ঠিকঠাকভাবে হচ্ছে না। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। এগুলো নিয়ে ভাবা দরকার। নতুবা প্রতি বছরের এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না।