• ই-পেপার

বিলম্ব বিচারের শিকার শ্রমিকরা, ঝুলছে ২৮ হাজার মামলা

মাহমুদুর রহমান মান্না

শ্রমিক কল্যাণে কার্ড নয়, দরকার বাস্তব সুফল

নিজস্ব প্রতিবেদক
শ্রমিক কল্যাণে কার্ড নয়, দরকার বাস্তব সুফল

ফ্যামিলি কার্ড ও শ্রমিক কার্ডসহ সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, শ্রমিক কল্যাণে কার্ড নয়, দরকার বাস্তব সুফল।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় মান্না এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশে ফ্যামিলি কার্ড ও শ্রমিক কার্ড নিয়ে অনেক কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এগুলো সত্যিকার অর্থে মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

মান্না অভিযোগ করেন, সরকারের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ীও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অযোগ্য ব্যক্তি এসব কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, কেবল কার্ড বিতরণের মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁদের জন্য প্রয়োজন টেকসই কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সরাসরি আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা। কার্ডের রাজনীতি দিয়ে হবে না, মানুষের জন্য দৃশ্যমান ও কার্যকর সুফল নিশ্চিত করতে হবে।

আজ মহান মে দিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ মহান মে দিবস

মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাঁদের কল্যাণে যুগান্তকারী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেই শহীদ জিয়া নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আরো বলেন, মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৮৮৬ সালের এ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের সেই আত্মত্যাগ শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজও আমাদের প্রেরণা ও শক্তি জোগায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাঁদের কল্যাণে যুগান্তকারী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার শ্রম আইন সংস্কার, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে পেনশন ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, বন্ধ শিল্প চালু, ন্যায্যমূল্যে খাবার সরবরাহ, স্থায়ী শ্রমিক ও কর্মচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতসহ শ্রমিকসমাজের ভাগ্যোন্নয়নে নানা কর্মসূচি ও নীতি গ্রহণ করেছে। আমি আশা করি, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই দিনে আমি দেশে-বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের সকল শ্রমজীবী-কর্মজীবী ভাই-বোন, যাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য, সর্বোপরি দেশের উন্নয়নের জন্য কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন, তাঁদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষই যেকোনো দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি আর অগ্রযাত্রার প্রধান অবলম্বন। শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। সুতরাং তাঁদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানতম অঙ্গীকার। আমি মনে করি, শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব।

জীবিকার তাগিদে নির্ঘুম আর সাহসী রাত কাটে যে নারী শ্রমিকদের

মাসুদ রায়হান পলাশ
জীবিকার তাগিদে নির্ঘুম আর সাহসী রাত কাটে যে নারী শ্রমিকদের

রাত আড়াইটা। গ্রাম-শহরের হাজার হাজার ব্যবসায়ীর পদচারণে মুখর রাজধানীর কারওয়ান বাজার। এর মধ্যে একটি আড়ত থেকে নাসরিন একাই মাথায় তুলে নেন ভারী ঝুড়ি। তাতে ৩৫ কেজি টমেটো। টমেটোগুলো সজিব আহমেদ নামের এক ব্যবসায়ী কিনেছেন। ৩৫ টাকার বিনিময়ে নাসরিন এ বোঝা মাথায় নেন। কিছুদূর হেঁটে মাথা থেকে ঝুড়ি নামান এ নারী মিন্তি। বললেন, পেটের জ্বালায় কাম (কাজ) হরি (করি)। রাইত ১১টার পর কাম হুরু করছি। সকাল ৮টা পর্যন্ত পুরুষের মতো কাম করব। ৭০০-৮০০ টাকা কামাই। দুই ছেলে-মেয়েকে খাওয়াই। কাপড় কিনি। এক মেয়ের বিয়ে দিছি। ওদের বাপ নেই। আমাকে সব ব্যবস্থা করতে হয়। খেটে খাই। ভিক্ষা করতে হয় না, এই শুকরিয়া।

নাসরিন তাঁর ছদ্মনাম। বয়স ৪৯ বছর। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, রাতে মিন্তির কাম হরি। চার-পাঁচডা আড়তের মাল সরিয়ে দিই। ঝাড়ু দিই। ওরা টাকা দেয়। কয়ডা তরকারিও দেয়। মাঝিমধ্যি অনেক তরকারি হয়। এগুলো বেচে দিই ভোরে। কয়ডা টাকা হয়। এসব কথা বলতে বলতে তিনি ঝুড়িটি হাতে নিয়ে আবার রওনা দেন বাজারের ভেতর। আট বছর ধরে নাসরিন এ কাজ করেন। দুই সন্তানকে নিয়ে বেগুনবাড়ি থাকেন। আট বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। তিনি কারওয়ান বাজারের তরকারির ভ্যান টানতেন। নাসরিন অনুরোধ করেন, আমার ছবি তুলছেন। ফেসবুকে দিয়েন না। মেয়ের জামাই দেখলে সম্মান যাইব।

রাত গভীর হয়, পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু কারওয়ান বাজারের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। শুধু নাসরিন নন, এমন অনেক সাহসী নারী আছেন, যাঁরা নির্ঘুম রাত কাটান এ বাজারে। সারা রাত কাজ করেন পেটের দায়ে। গত সোমবার রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গী স্টেশন থেকে কারওয়ান বাজারের উদ্দেশে ট্রেনে রওনা হন হালিমা বেগম (৫৫)। এক দিন পরপর তিনি টঙ্গী থেকে এখানে আসেন। তাঁর ছেলে-মেয়ে নেই। স্বামী মারা গেছেন আরো ২০ বছর আগে। তখন থেকে তিনি তাঁর বড় ভাইয়ের বাসায় থাকেন। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। বাজারের পচা কাদায় তাঁর পায়ে ঘা হয়েছে। রাত ২টার দিকে হালিমা কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার ছেলে-মেয়ে নেই। স্বামী-সংসার নেই। আড়তের লোকদের পানি টানি আইন্যা দিই। চা-টা আইন্যা দিই। কাজ করে দিই। কেউ ১০০ টাকা দেয়, কেউ ৫০। শরীর পারলে কোমরে নিয়ে বস্তা টেইন্যা দিই। মাথায় উঠায়। আরো কিছু টাকা পাই।

হালিমাসহ নাম না-জানা অনেক খেটে খাওয়া মানুষ তাঁদের জীবনযুদ্ধে নেমে পড়েন। পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবন চালিয়ে নেন।

রাত তখন প্রায় ৩টা। কারওয়ান বাজারের মুরগি মার্কেটের সামনে একটি ট্রাক এসে থেমেছে। ওই ট্রাক থেকে কাঁচামাল যাবে একটি আড়তে। মাল নামিয়ে ভ্যানে রাখছেন চালকরা। ওই ভ্যান যখন আড়তের দিকে যাত্রা করে, তখন নার্গিস সুলতানা (ছদ্মনাম) নামের এক নারী ওই ভ্যানটি ঠেলতে থাকে। ভ্যান থেকে মাল নামানোর পর নার্গিস সুলতানাকে ৫০০ গ্রামের মতো পটোল দেন ভ্যানচালক। নার্গিস কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি তেজতুরি বাজার থাকি। রাতে বেটাগোর ভ্যান ঠেলে দিই। বস্তা এগিয়ে দিই। ওদের সুবিধা হয়। তরকারি পাই। টাকাও দেয়। আমার স্বামীও বাজারে আছে। রিকশা চালায়। আমরা দুজনে মিল্লা আয় করি। একটা বাচ্চা স্কুলে পড়ে। আরেকটা বড়। সে বাসের হেল্পার।

নাসরিন, হালিমা আর নার্গিসের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল শ্রমিক দিবস সম্পর্কে। তাঁদের মধ্যে নার্গিস ছাড়া বাকিরা শ্রমিক দিবসের বিষয়টি জানেন। নার্গিস বলেন, শ্রমিক দিবসের কথা জেনে আর কী করব? আমারে কেউ খেতে দেয় না। সরকারও দেখে না। ভোট নিবার সময় কত কথা শুনি। কই, কেউ তো খোঁজও নেয় না। বস্তির বাসায় থাকতে হয়। খুব কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এমন অনেক নারী আছেন, যাঁরা রাতভর এখানে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। কেউ ট্রাক বা ভ্যান থেকে কাঁচামাল নামিয়ে আড়তে সাজিয়ে দেন। কেউ আড়ত থেকে ভ্যানে তুলে দেন। আড়ত পরিষ্কার করে দেন। কোনো কোনো নারী আছেন, যাঁরা নিজেরা ব্যবসাও করেন। বিভিন্ন কাঁচামাল কিনে তা আবার রাতের মধ্যেই শহরের খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেন। এমন কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে কালের কণ্ঠ। তাঁদের মধ্যে একজন নারী জানান, আরো দেড় বছর আগে তিনি যখন প্রথম রাতে কারওয়ান বাজার যাওয়া শুরু করেন, তখন দুজন আড়তদার তাঁকে কুপ্রস্তাব দেন। প্রথমে মানা করলেও তারা শোনেননি। পরে একদিন স্বামীকে নিয়ে ওই নারী যান আড়তদারদের কাছে যান। সেখানে আরো লোকজনও ছিল। কিছু ঝামেলাও হয়। তারপর থেকে আর তিনি ওই ধরনের পরিবেশের সম্মুখীন হননি। তিনি বলেন, জীবনডা যুদ্ধের মতো। হেরে গেলে কেউ দেখার নেই। সন্তানদের নিয়ে আমাদের খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে। হারলে চলবে না।

কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর তালিকায় তৃতীয় সর্বোচ্চ নির্মাণ শ্রমিক

নির্মাণ খাতে বছরে ১২০ শ্রমিকের মৃত্যু

মাসুদ রায়হান পলাশ
নির্মাণ খাতে বছরে ১২০ শ্রমিকের মৃত্যু

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আরশিনগর লাবনী লেক সিটির পাশে একটি বহুতল নির্মীয়মাণ ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করছিলেন রনি (২৮)। গত ২৪ এপ্রিলের ঘটনা। তিনি ভবনের নিচে ছিলেন। ঢালাইয়ের ডাব্বর (লোহার পাত্র) তোলার সময় রশি ছিঁড়ে তাঁর মাথায় পড়ে। তিনি গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইট সোসাইটির (এসআরএস) তথ্য মতে, দেশের নির্মাণ খাতে ২০২৫ সালে ৯৭টি ঘটনায় ১২০ জন নিহত হয়েছে। দেশে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মৃত্যু পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ, আর তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু নির্মাণ খাতে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা জানান, শুধু ২০২৫ সালেই নয়, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৩৫৯ শ্রমিক নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে ৯২, ২০২৩ সালে ১৭৪, ২০২২ সালে ১০৪, ২০২১ সালে ১৩৯, ২০২০ সালে ১১৮, ২০১৯ সালে ১৩০, ২০১৮ সালে ১৮৫, ২০১৭ সালে ১৪৫, ২০১৬ সালে ১২৫ ও ২০১৫ সালে ১৪৭ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। এসআরএসের তথ্য, ২০২৫ সালে সব মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে ৮০২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খানে সর্বোচ্চ ৩৮৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪৫ জন সেবা খাতে, তৃতীয় সর্বোচ্চ ১২০ জন নির্মাণ খাতে, কৃষি খাতে ৯৪ জন ও উৎপাদন খাতে ৫৮ জন শ্রমিক নিহত হন।

এদিকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় সারা দেশে গত ১৫ মাসে ৯২১ শ্রমিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস। সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ১৮৬ জন ও ২০২৫ সালে ৭৩৫ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি রাজধানীতে বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মক্ষেত্র পরিস্থিতি সংক্রান্তের এক সেমিনারে সংবাদপত্র ভিত্তিক জরিপ-২০২৫ ও জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬-এ এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বিলস পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়কালে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় যে ১৮৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তার মধ্যে ১৮৫ জন পুরুষ এবং একজন নারী শ্রমিক।

গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরে বিলস। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহবান জানানো হয়।

লাবনী লেক সিটির বহুতল ভবনে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিক রনির সহকর্মী সেলিম গত বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, দুর্ঘটনা তো আর বলে-কয়ে আসে না। ওই দিন আমিও মরতে পারতাম। রশি ছিঁড়ে প্রথমে মেশিনে (মিক্সচার মেশিন) পড়ে। তারপর রনির গায়ে লাগে। আশপাশে আরো চার-পাঁচজন ছিলেন। তাঁরাও মরতে পারতেন। কেউ আহত হননি। শুধু রনিই মারা গেলেন। রনির পরিবারের সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকায় মিটমাট হয়ে গেছে। আগামী ৫ মে টাকা দেওয়ার কথা। এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। গত ১৫ এপ্রিল রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় পাঁচতলা বাজার এলাকার একটি নির্মীয়মাণ ভবনের ছয়তলা থেকে পড়ে নাজমুল হোসেন (২৮) নামের এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার মৃতের সহকর্মী ও খালাতো ভাই জয়নুল আবেদিন কালের কণ্ঠকে বলেন, নাজমুল ভাই রডের কাজ করত। ছয়তলা ভবনে কলাম ঢালাইয়ের কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তিনি নিচে পড়ে যান। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। শ্রম আইন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকারীর। শ্রমিকের ব্যক্তিগত সুরক্ষা যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া নিয়োগকারী কাউকে কাজে নিয়োগ করতে পারবেন না। কিন্তু আইনের এই বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা তেমন কার্যকর হয় না বলে দাবি করেছেন ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান আজিজ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হেলমেট, গামবুট, নিরাপত্তা বেল্টসহ অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণ ছাড়াই কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। বড় বড় ডেভেলপার কম্পানি ছাড়া অধিকাংশ ছোট ছোট কম্পানি এগুলো যথায়থভাবে সরবরাহ করে না। হাতে গোনা কয়েকটি ডেভেলপার কম্পানি শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে এসব নিরাপত্তাসামগ্রী দিয়ে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোথাও কোথাও এসব নিরাপত্তাসামগ্রী থাকলেও তা শ্রমিকরা অসচেতনতার কারণে ব্যবহার করেন না। এ জন্য শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের দরকার হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না।

কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে কালের কণ্ঠ। তাঁদের একজন আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, পেটের দায়ে কাজ করি। যে কম্পানিতে কাজ করি, তারা যেখানে নিয়ে যায়, সেখানে যাই। কম হলেও আমাদের যেসব সামগ্রী দেওয়া হয়, আমরা তা নিয়ে কাজ করি। তবে শুধু কম্পানির দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরাও সব সময় নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার করি না।

সেফটি অ্যান্ড রাইট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, একটি কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কেমন হবে, তা নিয়ে সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকের ধারণার ঘাটতি রয়েছে। বাস্তবায়নের ঘাটতির কথা নাই বা বললাম। মালিক ও শ্রমিকের বোঝাপড়ার ব্যাপারটা বড়। আবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর, তাদের মূল দায়িত্ব কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ঠিক রাখা। স্বাস্থ্য নিরাপত্তার মান যেন ঠিক থাকে। শ্রমিকের অধিকার যেন প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রম অধিদপ্তরেরও দায়িত্ব রয়েছে শ্রমিকের অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। কিন্তু এগুলো ঠিকঠাকভাবে হচ্ছে না। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। এগুলো নিয়ে ভাবা দরকার। নতুবা প্রতি বছরের এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না।

বিলম্ব বিচারের শিকার শ্রমিকরা, ঝুলছে ২৮ হাজার মামলা | কালের কণ্ঠ