kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

সেলিনাদি

হরিশংকর জলদাস

১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সেলিনাদি

ষাটের নিচে যাঁদের বয়স, তাঁরা তো বটেই, ষাটের আগুপিছু বয়স যেসব বাংলা কথাসাহিত্য পাঠকের, তাঁরা সেলিনা হোসেনকে পড়ে পড়েই তাঁদের পাঠরুচি তৈরি করেছেন—বললে খুব বেশি অত্যুক্তি হবে না। উনসত্তরের এই আমি, সব সময় সেলিনা হোসেনকে পাঠ্যান্তর্গত রেখেছি। আমার যে স্বল্পকালীন লেখকজীবন, মেরেকেটে বছর চৌদ্দর, তার গোটাটাই সেলিনা হোসেনের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রেরণা-অনুপ্রেরণায় কেটেছে ও কাটছে। আমার মতো আরো অনেক লিখিয়ে বাংলাদেশে থাকতে পারেন। সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো কিংবা বুড়িগঙ্গা-কর্ণফুলীর মতো বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাংলার সংস্কার-সংস্কৃতি, রাজনীতি, পুরাণকথা, ভাষা আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, একাত্তরের উল্লাস আর পঁচাত্তরের পশুত্ব—সবই তাঁর কথাসাহিত্যে জড়িয়ে-ছড়িয়ে আছে। সমকাল সেলিনা হোসেনের কথাসাহিত্যের প্রধান কুশীলব।

সেলিনা হোসেনকে প্রথম দেখি বাংলা একাডেমিতে। ২০০৩ কি ২০০৪-এর ডিসেম্বরের শেষ শুক্রবার বোধ হয়। আগে বাংলা একাডেমির এজিএমটা ওরকম দিনেই হতো। বাংলা একাডেমির সদস্য ছিলাম না আমি। অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিকের পিছু পিছু সেখানে অবৈধ প্রবেশ ছিল আমার। সেই সময় অবৈধ প্রবেশকারীদের ক্ষেমাঘেন্না করে ছেড়ে দেওয়া হতো। শান্তিদার বৈধ সার্টিফিকেট ছিল। তাই তাঁরই ছত্রচ্ছায়ায় আমার মতো অবৈধের প্রবেশ ঘটেছিল সেবার বাংলা একাডেমিতে।

বাংলা একাডেমিতে চাকরি করতেন তখন সেলিনা হোসেন। বর্ধমান হাউসেই তাঁর অফিসকক্ষ। কী কারণে নিচতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। পাশ থেকে শান্তিদা বলেছিলেন, ওই দেখেন আপনার প্রিয় সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

সেলিনা হোসেনের দিকে চোখ তুলেছিলাম আমি। এই-ই আমার সেলিনা হোসেনকে প্রথম দেখা। তাকিয়ে দেখলাম, ছোটখাটো চেহারার বাঙালি একজন নারী। প্রশান্ত কোমল স্নেহার্দ্র একটা মুখ। তাতে দিঘিজলের গভীরতা নিয়ে দুটি চোখ। তাঁকে ঘিরে তখন অনেকেই। অনুরাগী পাঠক-পাঠিকা, নানা বয়সের, নানা পোশাকের। কেউ ঘনিষ্ঠ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ বা অটোগ্রাফ নিচ্ছেন। সেলিনা হোসেনের হাসিমুখ।

পাশ থেকে শান্তিদা বললেন, যাবেন নাকি, কাছে? কথা বলতে চাইলে বলতে পারেন। দ্বিধার দুটি পা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। খুব বেশি যে সেদিন সেলিনা হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলাম, তা নয়। অনুরাগীতে গিজগিজ করছিল তাঁর চারদিক। শুধু বলতে পেরেছিলাম, “আমি আপনার একজন অনুরাগী পাঠক। আপনার ‘উৎস থেকে নিরন্তর’, ‘যাপিত জীবন’, ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘নীলময়ূরের যৌবন’—এসব পড়েছি।” সেলিনা হোসেন কোমল কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ও তাই! তা আপনার নাম কী?’

আমার নাম শোনার অবকাশ পাননি সেদিন তিনি। অন্য একজন নাছোড় পাঠক তাঁকে দখল করে নিয়েছিলেন।

আমি পেছন ফিরে ছিলাম।

এরপর তো নানা অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে সেলিনা হোসেনের সঙ্গে। তাঁর মতো মধুরভাষিণী লেখকের সঙ্গে বারবার সাক্ষাতে সব সময় সমৃদ্ধ হয়েছি। এত অসাধারণ উচ্চারণ করেন তিনি। কথা বলার সময় শ্রুতিসুখকর একটা ছন্দ বারবার উছলে ওঠে। এ এক অসাধারণ গুণ সেলিনা হোসেনের!

একবার রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিমন্ত্রিত হলাম আমরা। আমরা মানে আমি আর অধ্যাপক ড. রফিকুল্লাহ খান। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। পশ্চিমবঙ্গ থেকে গেলেন অধ্যাপক বরুণকুমার চক্রবর্তী, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলেন ড. বেলা দাস, তখন তিনি বাংলা বিভাগের প্রধান। আর এসেছিলেন উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য। রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক এই সাহিত্য সেমিনারটি হয়েছিল। দুই দিনের এই অনুষ্ঠানের শেষ দিনে রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর অন্তর্গত অন্যান্য কলেজের এমফিল ডিগ্রিকামী ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের থিসিসের সিনফসিস পাঠ করার সুযোগ পেয়েছিল। আশ্চর্য হয়ে শুনছিলাম ছাত্র-ছাত্রীদের গবেষণার বিষয়বস্তুগুলো। প্রায় বিশজন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে আটজনই বেছে নিয়েছিল বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে। তার মধ্যে তিনজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং পাঁচজন সেলিনা হোসেনের কথাসাহিত্যকে তাদের গবেষণার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছিল। গর্বে বুক ফুলে উঠেছিল আমার। কোথায় বাংলাদেশের ঢাকা আর কোথায় ঝাড়খণ্ডের রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়। সেলিনা হোসেনের কথাসাহিত্য হাজার হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করতে সক্ষম। নইলে কেন রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সাহিত্য নিয়ে গবেষণা হয়। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও সেলিনা হোসেনের জয়জয়কার। সেই তুলনায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেলিনা হোসেনের অবস্থা ও অবস্থান কেমন? জানা নেই আমার।

সেলিনা হোসেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। যত সাহিত্যকর্ম তিনি সৃষ্টি করলেন এক জীবনে, তা বাঙালি পাঠকের বহুদিনের খোরাক হয়ে রইল।

তাঁর সাহিত্যে চর্যাগীতির সময়টা এক আশ্চর্য মোহনীয়ভাবে অঙ্কিত হয়েছে। ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’ তার উদাহরণ। ২০০৮-এ প্রকাশিত ‘পূর্ণছবির মগ্নতা’ উপন্যাসটি আমাকে চমকে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গল্পের চরিত্ররাও যে একটি উপন্যাসের কুশীলব হতে পারে, দেখিয়ে দিয়েছেন সেলিনা হোসেন। অনেক আগ্রহ নিয়ে ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ পড়তে বসেছি। ওটা যে জলজ উপন্যাস!

আমরা যারা একটু-আধটু লেখালেখি করি, গল্প-উপন্যাসের নাম নিয়ে সংকটে পড়ি। সেলিনা হোসেন সে রকম সংকটে পড়েছেন বলে আমার মনে হয় না। কী অসাধারণ ছন্দোবদ্ধ একেকটা উপন্যাসের শিরোনাম! যেন শব্দের ঝরনা বয়ে যাচ্ছে—নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি, জ্যোত্স্নায় সূর্যজ্বালা, মগ্নচৈতন্যে শিস, কাঁটাতারে প্রজাপতি, গায়ত্রীসন্ধ্যা, কাঠকয়লার ছবি, ঘুমকাতুরে ঈশ্বর, যমুনা নদীর মুশয়রা, দিনকালের কাঠখড়, জলবতী মেঘের বাতাস, সখিনার চন্দ্রকলা, নুনপান্তার গড়াগড়ি—এ রকম আরো অনেক।

ইদানীং রাজনৈতিক উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন তিনি একের পর এক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সময় ও রাজনীতি সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে ঘুরেফিরে জায়গা করে নিচ্ছে। ৭ই মার্চ, ১৫ই আগস্টের ওপর উপন্যাস তো তাঁর আছেই, এ বছরই তো লিখলেন বধ্যভূমিকে নিয়ে এক অসাধারণ উপন্যাস। এই উপন্যাসসমূহের মূল চরিত্র সময় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট। সেলিনা হোসেন মানুষকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসেন। ওই ভালোবাসাটাই তাঁর চরিত্রের প্রধানতম অনুষঙ্গ। নিজের চারিত্রিক এই উপাদানটি তিনি তাঁর গোটা সাহিত্যকর্মে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। বিষণ্ন প্রকৃতির মানুষও তাঁর কথাসাহিত্য পড়ে বেঁচে থাকার উৎসাহ পায়।

তবে মাঝেমধ্যে রাগও করতে জানেন সেলিনা হোসেন। তবে সেই রাগ অত্যন্ত ঠুনকো, ক্ষণস্থায়ী। মায়াভরা স্নেহে সেই রাগ অচিরেই ভেসে যায়। নিজের কথাই বলি। একবার মোহিত কামাল তাঁর ‘শব্দঘর’-এর জন্য সেলিনা হোসেনের একটা উপন্যাসের আলোচনা লেখালেন আমাকে দিয়ে। উপন্যাসটির কোনো কোনো জায়গায় সেলিনা হোসেনের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। লিখেছিও তা ওই লেখায়। সেলিনা হোসেন নিশ্চয়ই পড়েছিলেন। রাগও করেছিলেন নিশ্চিত। নইলে কেন বছরখানেক পরের এক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে যখন আমার দেখা হলো, কথা বললেন না? এমনকি আমাকে দেওয়া ক্রেস্টটিতে হাত ছোঁয়ানোর অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি। শামসুজ্জামান খান ও নাট্যকার মামুনুর রশীদের হাত থেকে পুরস্কারটি নিয়ে তৃপ্ত থাকতে হয়েছিল আমাকে। বেশ অভিমান হয়ে গিয়েছিল তখন আমার। মনে ভীষণ একটা কষ্ট নিয়ে দর্শকসারিতে এসে বসে পড়েছিলাম। অনুষ্ঠান আরো চলছিল অনেকক্ষণ। সেলিনা হোসেন হয়তো খেয়াল করছিলেন আমার বিষণ্ন মুখ। হঠাৎ মঞ্চে বসা সেলিনা হোসেন তাঁর চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন, মৃদু পায়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং আচমকাই আমার লম্বা চুলে ডান হাতের পাঁচটি আঙুল ডুবিয়ে দিলেন। কিছু না বলে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন সেলিনা হোসেন। এই না হলে সেলিনা হোসেন? রাগকেও অনুরাগে ভাসিয়ে দিতে জানেন তিনি!

একবার তিনি চট্টগ্রামে এলেন, একটা স্কুলের অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শুরু হতে তখনো ঘণ্টা দেড়েক বাকি। চট্টগ্রামের বাতিঘরে গেলেন তিনি। খবর পেয়ে আমিও উপস্থিত। গোলটেবিল সামনে নিয়ে বসেছেন সেলিনা হোসেন। দু-চারজন অনুরাগী সংবাদ পেয়ে পৌঁছে গেছেন। নিজের বইতে অটোগ্রাফ দিতে দিতে কথা বলছিলেন আমার সঙ্গে। আমিও এ কথা-ও কথা জিজ্ঞেস করে যাচ্ছিলাম। হঠাৎই জিজ্ঞেস করে বসেছিলাম, ‘আপনার প্রিয় উপন্যাস কোনটি, মানে আপনার নিজের লেখা উপন্যাস?’

মিষ্টি একটু হেসেছিলেন সেলিনা হোসেন। বলেছিলেন, ‘শংকরবাবু, এ তো বড় কঠিন প্রশ্ন। নিজের সন্তানের মধ্যে কোনটি সবচাইতে পছন্দের, বলা যায়? যায় নাতো!’

আমি আর কী বলব, চুপ করে ছিলাম।

পরে তিনি কণ্ঠস্বরকে একেবারে খাদে নামিয়ে বলেছিলেন, ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ লিখে মনে বড় তৃপ্তি পেয়েছিলাম। যদি জিজ্ঞেস করেন, তাহলে বলব, ওই ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ই আমার প্রিয় উপন্যাস। যথার্থই বলেছিলেন সেলিনা হোসেন। তিন খণ্ডের ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ই তাঁকে অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখবে।

বইটা আমার সংগ্রহে ছিল না। বাতিঘর থেকে কিনে তাঁর দিকে এগিয়ে ধরেছিলাম কিছু লিখে দেওয়ার জন্য। তিনি লিখেছিলেন—

‘হরিশংকর জলদাস

লেখার জগতের অন্য মানুষ

বোধে এবং সৃজনে।’

১২/০৪/২০১৪

একবার তাঁকে আমার একটা উপন্যাস উৎসর্গ করতে ইচ্ছা জাগল। ফোন করলে সম্মতি দিলেন তিনি। মহাভারতের শকুনিকে নিয়ে লেখা ‘সেই আমি নই আমি’ উপন্যাসটি সেলিনা হোসেনকে উৎসর্গ করেছিলাম। উৎসর্গপত্রে লিখেছিলাম—

“কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন

মায়াময় সকাল। গাছের পাতায়, ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু।

শিশিরে-সবুজে-আলোতে জড়াজড়ি।

সেলিনা হোসেনের কথা স্মরণে এলে এ রকম একটা

হেমন্ত-সকালের কথা মনে পড়ে যায় আমার।

সেলিনা দিদির হাতে ‘সেই আমি নই আমি’ উপন্যাসটি

দিতে পেরে আনন্দিত আমি।

পুনশ্চ : রাগ করলেন সেলিনাদি, দিদি ডাকলাম বলে?

আমার যে কোনো বড়দিদি নেই!”

সেই থেকে সেলিনা হোসেন আমার দিদি। আর আমি তাঁর কাছে শংকরবাবু থেকে শংকর, আপনি থেকে তুমি।

সেলিনাদি, আরো দীর্ঘজীবী হোন আপনি—এই কামনা।