kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

সেই রাত্রির কল্পকাহিনী

নির্মলেন্দু গুণ

১৪ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ২ মিনিটে



তোমার ছেলেরা মরে গেছে প্রতিরোধের প্রথম পর্যায়ে,

তারপর গেছে তোমার পুত্রবধূদের হাতের মেহেদী রং,

তারপর গেছেন তোমার জন্মসহোদর ভাই শেখ নাসের,

তারপর গেছেন তোমার প্রিয়তমা বাল্যবিবাহিত পত্নী,

আমাদের নির্যাতিতা মা।

 

এরই ফাঁকে এক সময় ঝরে গেছে তোমার বাড়ির

সেই গরবিনী কাজের মেয়েটি, বকুল।

এই ফাঁকে এক সময় প্রতিবাদে দেয়াল থেকে

খসে পড়েছে রবীন্দ্রনাথের দরবেশ মার্কা ছবি।

এরই ফাঁকে এক সময় সংবিধানের পাতা থেকে

মুছে গেছে দুটি স্তম্ভ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।

এরই ফাঁকে এক সময় তোমার গৃহের প্রহরীদের মধ্যে

মরেছে দুইজন প্রতিবাদী, কর্নেল জামিল ও নাম না-জানা

এক তরুণ, যাঁরা জীবনের বিনিময়ে তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল।

 

তুমি কামান আর মৃত্যুর গর্জনে উঠে বসেছ বিছানায়,

তোমার সেই কালো ফ্রেমের চশমা পরেছ চোখে,

লুঙ্গির উপর সাদা ফিনফিনে ৭ই মার্চের পাঞ্জাবি

মুখে কালো পাইপ, তারপর হেঁটে গেছ বিভিন্ন কোঠায়।

সারি সারি মৃতদেহগুলি তোমার কি তখন খুব অচেনা ঠেকেছিল?

তোমার রাসেল? তোমার প্রিয়তমা পত্নীর সেই গুলিবিদ্ধ গ্রীবা?

তোমার মেহেদীমাখা পুত্রবধূদের মুজিবাশ্রিত করতল?

রবীন্দ্রনাথের ভূলুণ্ঠিত ছবি?

তোমার সোনার বাংলা?

 

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামবার আগে তুমি শেষবারের মতো

পাপস্পর্শহীন সংবিধানের পাতা উল্টিয়েছ,

বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে একমুঠো মাটি তুলে নিয়ে

মেখেছ কপালে, ঐ তো তোমার কপালে আমাদের হয়ে

পৃথিবীর দেওয়া মাটির ফোঁটার শেষ তিলক, হায়!

তোমার পা একবারও টলে উঠল না, চোখ কাঁপল না।

তোমার বুক প্রসারিত হলো অভ্যুত্থানের গুলির অপচয়

বন্ধ করতে, কেননা তুমি জানো, এক-একটি গুলির মূল্য

একজন কৃষকের এক বেলার অন্নের চেয়ে বেশি।

কেননা তুমি তো জানো, এক-একটি গুলির মূল্য একজন

শ্রমিকের এক বেলার সিনেমা দেখার আনন্দের চেয়ে বেশি।

মূল্যহীন শুধু তোমার জীবন, শুধু তোমার জীবন, পিতা।

 

তুমি হাত উঁচু করে দাঁড়ালে, বুক প্রসারিত করে কী আশ্চর্য

আহ্বান জানালে আমাদের। আর আমরা তখন?

আমরা তখন রুটিনমাফিক ট্রিগার টিপলাম।

তোমার বক্ষ বিদীর্ণ করে হাজার পাখির ঝাঁক

পাখা মেলে উড়ে গেল বেহেশতের দিকে...।

...তারপর ডেড্স্টপ।

 

তোমার নিষ্প্রাণ দেহখানি সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে, গড়াতে

আমাদের পায়ের তলায় এসে হুমড়ি খেয়ে থামল।

—কিন্তু তোমার রক্তস্রোত থামল না।

সিঁড়ি ডিঙিয়ে, বারান্দায় মেঝে গড়িয়ে সেই রক্ত,

সেই লাল টক্টকে রক্ত বাংলার দূর্বা ছোঁয়ার আগেই

আমাদের কর্নেল সৈন্যদের ফিরে যাবার বাঁশি বাজালেন।

[পুনর্মুদ্রণ]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা