ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় ইয়েস কার্ড পেয়েছিলেন জিসান। সেরা দশে ঠাঁই পেলে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ! বড় বড় ক্লাবের খেলোয়াড়দের সঙ্গে প্রশিক্ষণের হাতছানি। এ জন্য ঢাকায় চূড়ান্ত বাছাইয়ে নামতে হবে। কিন্তু একমাত্র ছেলেকে চোখের আড়াল করতে চাননি জিসানের মা। ফলে নেত্রকোনা জেলার অনূর্ধ্ব-১২ ও অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবল টিমে খেলেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে জিসানকে। ভালো ফুটবল খেলতেন। গানের গলাও ভালো। এলাকায় নামডাকের কারণে বন্ধুর সংখ্যাও অনেক। একদিন তারাই মিক্সড অ্যালবাম ‘আশাবাদী ভালোবাসা’র ‘চাঁদের জোসনা’ গাওয়ার জন্য ডেকে নেয় তাকে। ভরসা এত দিন বাবার কণ্ঠে শুনে আসা গান। জিসানের বাবা মুক্তিযোদ্ধা মো. ফিরোজ খান ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী। এলাকার ছেলে-মেয়েদের গান শেখাতেন। গানে ছেলের মন নেই দেখে শেখাতে জোরাজুরি করেননি। বাবা এবং একমাত্র বোন মারা যাওয়ার পর জীবনের মোড় ঘুরে যায় জিসানের। চলে আসেন ঢাকায়। শুরু করেন গান নিয়ে যাত্রা। “দেখলাম গান আমাকে আশ্রয় দিচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য ফুটবল ছেড়ে তাই গান বেছে নিই। দুটি ব্যান্ডও গড়ি। সেগুলো ভেঙে যাওয়ার পর সর্বশেষ গড়ি ‘ফানুস’। শুরুতে গান গেয়ে মোবাইলে ভিডিও করে ফানুসের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করতাম। সবার কাছ থেকে ইতিবাচক রেসপন্স পেতে লাগলাম। এরপর একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডাক পাই”—বলছিলেন জিসান। পেশাদার শিল্পী হিসেবে শুরুটা তার পরই। বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এখন পর্যন্ত সাতটি গানের ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে তাঁর। এর মধ্যে চারটিই ছাড়িয়েছে কোটি ভিউয়ার। শুরুটা ২০১৮ সালে ঈগল মিউজিকের ‘এক সুন্দরী মাইয়া’ দিয়ে। ইউটিউবে গানটির ভিউয়ার এখন প্রায় সাড়ে চার কোটি! এরপর ধ্রুব মিউজিক কটেজ থেকে আসে ‘বিষের ছুরি’। সেটির ভিউয়ার দুই কোটি ১৪ লাখের বেশি। একই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ‘ভুলিনি তোমায়’-এর ভিউয়ার এক কোটি ৩৬ লাখের বেশি। ‘তোর মনের পিঞ্জিরায়’ স্টুডিও ভার্সন ভিডিও করে পান তিন কোটি ৭০ লাখ ভিউয়ার। এরপর ঈগল মিউজিক ভিডিও স্টেশন থেকে অফিশিয়াল ভিডিও প্রকাশ করেন। সেটির ভিউয়ার এখন দুই কোটি ২৫ লাখ। অন্য গানগুলো হলো—‘পিরিতের সাম্পান’, ‘খাড়ার ওপর মইরা যামু’ ও ‘মনেরই মোহনায়’। ‘আমি খুব সাধারণ মানুষ। গানের কথা-সুরও খুব সাধারণভাবে করার চেষ্টা করি। ভিডিওতেও সেটা ফুটিয়ে তুলি। শ্রোতারা হয়তো তাঁদের মনের চাওয়াটা আমার গানে খুজে পান। তাই এত পছন্দ করেন’— বলছিলেন জিসান। নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করেন এই গায়ক। তবু পথেঘাটে ধরা পড়েন ভক্তদের কাছে, ‘একবার এক ভক্ত আমাকে চিনে ফেলে। জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। আমার গান শুনে নাকি তার মনের কষ্ট দূর হয়।’ নিজের গানের কথা-সুর নিজেই করেন জিসান। গিটারও বাজান। বলেন, ‘চলতে-ফিরতে গানের কথা মনে এলে স্মার্টফোনের নোটপ্যাডে লিখে রাখি। কোনো সুর এলে সেটাও গুনগুন রেকর্ড করে ফেলি। পরে সেভাবে কথা সাজাই।’ ‘ফানুস’ই তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে বলে অভিমত জিসানের। ২০১৭ সালে ব্যান্ডটি যাত্রা শুরু করে। ব্যান্ডের নামে খোলা ইউটিউব চ্যানেল থেকে এ পর্যন্ত ৯-১০টি গান প্রকাশ করেছেন। সব গানের ভিডিওই মোবাইলে করা। চ্যানেলটির সাবস্ক্রাইবার এক লাখ পেরিয়েছে। পেয়েছেন সিলভার বাটনও। রবীন্দ্রসরোবরে ভক্তদের নিয়ে শিগগিরই এই প্রাপ্তি উদ্যাপন করবেন। চ্যানেলের গানগুলো ঘষামাজা করে অ্যালবাম প্রকাশ করবেন। অ্যালবামের নামও চূড়ান্ত—‘উন্মাদ’। ফানুসের প্রথম গানের শিরোনাম। জিসানের স্বপ্ন আর্মি স্টেডিয়ামে ‘জয় বাংলা’ কনসার্টে ব্যান্ডকে নিয়ে পারফরম করার। গান করার পাশাপাশি শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে মিউজিক নিয়ে পড়ছেন জিসান। সংগীত পরিচালক হিসেবে চাকরি করছেন ধ্রুব মিউজিক স্টেশনে।