আজ ১০ই জানুয়ারি উপমহাদেশের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। সর্বকালের স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তির মধ্যে তিনি সর্বোত্তম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার মহানায়ক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-ধ্যান-জ্ঞান এবং একনিষ্ঠ দৃঢ়তায় এ দেশ স্বাধীন হয়। আর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটি পৃথিবীর মানচিত্রে এক বিশেষ স্থান করে নেয়। বঙ্গবন্ধু আপসহীন, ভয়হীন, আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী, প্রতুৎপন্নমতি ও সংগ্রামী ছিলেন। সংগ্রামই যেন তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি এ দেশে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন অন্যায়, অত্যাচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি সংগ্রাম করেন মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে। তাই বলা হয়, তাঁর জীবন যেন অবিরাম, নিরন্তর ও ছেদহীন এক বর্ণিল সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কাউকে কখনো আলাদা করে দেখেননি। এই অসাম্প্রদায়িক মনোভাব তাঁকে আরো মহান করে তোলে। তিনি যেকোনো পরিস্থিতি ও প্রতিবন্ধকতা অত্যন্ত দৃঢ়তা এবং ধৈর্য সহকারে মোকাবেলা করেন। এটি তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ। তাঁর রাজনৈতিক বাগ্মিতা, প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শী মনোভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য সৃষ্টি করে এক গতিশীল ও বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। তিনি উপস্থিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে খুবই প্রাজ্ঞ ছিলেন। দেশকে স্বাধীন করার জন্য ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে শুনিয়েছেন স্বাধীনতার অমোঘমন্ত্র, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ তাঁর এই ভাষণে তিনি এ দেশের সর্বস্তরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। তাঁর রাষ্ট্রনায়োকচিত সংগ্রামী ভাষণে তৎসমকালীন পাকিস্তানি প্রশাসন দিশাহারা হয়ে যায়। তখন তারা বুঝতে পারে বঙ্গবন্ু্লই একমাত্র নেতা, যাঁর মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন রচিত হবে। তারপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি নির্ভীক, অকুতোভয়, অসম সাহসী সর্বোপরি অন্যায়ের প্রতিবাদী ছিলেন। তিনি কখনো পাকিস্তানের সঙ্গে আপস করেননি কিংবা আপস করতে শিখেননি। তিনি বন্দি হবেন জেনেও ভয়ে কোথাও চলে যাননি। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে আমাকে আমার সহকর্মীরা চলে যেতে অনুরোধ করেন। তখন আমি তাদের বলেছিলাম, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বিপদে রেখে আমি চলে যেতে পারব না। মরতে হলে আমি এখানেই মরব’। একজন বীর কখনো নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসেন না। প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু আমাদের একমাত্র নেতা, যাঁকে অন্য কারো সঙ্গে তুলনা করা যায় না, আর যাবেও না কখনো। তিনি অতুলনীয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁরই নামে মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে হানাদার, দখলদার ও শত্রুমুক্ত করার জন্য স্বাধীনতার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করেন। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় তাঁরই নামে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়কাল এ দেশকে শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন করার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের শোচনীয় পরাজয় এবং করুণ অবস্থা দেখে তখন বাংলার স্বাধীনতার স্বাদ জাগানিয়া লৌহমানব প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার মুক্তি না দিয়ে আর অন্য কোনো উপায় ছিল না। অবশেষে ৮ই জানুয়ারি ১৯৭২ পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। তিনি ঢাকার উদ্দেশে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ঢাকায় এসে পৌঁছেন। ঢাকায় পৌঁছলে তাঁকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। তিনি বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে চলে আসেন। এখানে এসে তিনি আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। পাকিস্তানি কারাগার থেকে তিনি যখন মুক্তি লাভ করেন, তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো তাঁকে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের শিথিল সম্পর্ক রাখার আহ্বান জানালে তিনি বলেন, আমার জনসাধারণের কাছে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আমি কিছুই বলতে পারব না। এখানে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের জনগণকেই বড় করে দেখিয়েছেন। আর বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের দীপ্ত-সাহসী চেতনাকে সম্মান দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু বলেই এটি সম্ভব হয়েছে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে তিনি দেশের অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করা প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এখন যদি কেউ স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তাহলে সে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য মুজিব সর্বপ্রথম প্রাণ দেবে।’ এখানে তিনি স্বাধীনতা রক্ষায় নিজের প্রাণ দেওয়ার জন্যও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে বীরোচিত ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেন। বঙ্গবন্ধু বলেই এটি সম্ভব। বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে সব স্বাধীন ও মুক্ত দেশকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। এমনকি তিনি বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত দেশ করারও আহ্বান জানান। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’—এটি ছিল তাঁর পররাষ্ট্রনীতি। এহেন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে তিনি বৈশ্বিক অঙ্গনে হয়ে উঠেন একজন ক্ষমতাধর ও প্রতাপশালী নেতা। তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমান, প্রতিভাধর, তেজস্বী, রাজসিক, বজ্র কণ্ঠাধিকারী অসম সাহসী নেতা হলেও তিনি নিজেকে সাধারণ গণমানুষের নেতা মনে করতেন। জনগণের মতামতকে তিনি সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতেন। এ ধরনের ব্যক্তিত্ববান, বীরপুরুষ এবং সংগ্রামী নেতা বিশ্বে বিরল। তাই তাঁকে বলা হয় ইতিহাসের মহানায়ক। বঙ্গবন্ধুর সোনার সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে সর্বস্তর থেকে সব দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চোরাকারবারি, মাদকব্যবসা, অর্থপাচার, বাল্যবিবাহ, মজুদদারিসহ সর্ব প্রকার অন্যায় কর্ম সম্পাদন থেকে বিরত থাকতে হবে। এ দেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে সমুন্নত রেখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সবাইকে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। বিভিন্ন সূচকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আসুন, এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করার দৃপ্ত শপথ গ্রহণ করি। জয়তু বঙ্গবন্ধু\ জয়তু বাংলাদেশ\ লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ