kalerkantho

সোমবার । ১১ মাঘ ১৪২৭। ২৫ জানুয়ারি ২০২১। ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

টাঙ্গাইল

বৈরান নদী এখন দখলে বিরান

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

১৫ জুন, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বৈরান নদী এখন দখলে বিরান

টাঙ্গাইলের গোপালপুরে বৈরান নদী দখল করে এভাবে গড়ে উঠছে স্থাপনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কয়েক যুগ আগেও টাঙ্গাইলের গোপালপুরের বৈরান নদী ছিল খরস্রোতা। পাল তুলে চলত বড় বড় নৌকা। একসময়ের স্রোতস্বিনী বৈরান দখলে দখলে এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে। দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থাপনা। কেউ কেউ নদীর জায়গা দখল করে কৌশলে প্রয়োজনীয় কাগজ তৈরি করে নিয়েছে। মাঝেমধ্যে বৈরান নদী দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। দখলদারদের উচ্ছেদ করে নদীটি দখলমুক্ত করে এর প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।

ধনবাড়ীর বাসিন্দা ব্যবসায়ী কামরুল হাসান শাহীন ও কোনাবাড়ী মহিলা কলেজ রোডের বেলায়েত হোসেন জানান, ধনবাড়ী উপজেলার মুসুদ্দী-কেন্দুয়া অংশে ঝিনাই নদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে বৈরান নদীর। পরে নদীটি গোপালপুরের মির্জাপুর ইউনিয়নের বড়শিলায় পুনরায় ঝিনাই নদীর সঙ্গে মিশেছে। গোপালপুর শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীটিকে কেন্দ্র করেই গোপালপুর হয়ে ওঠে বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র।

গোপালপুরের প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, একসময় মালবাহী বড় বড় নৌকা চলত এই নদী দিয়ে। ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাল নৌকায় করে গোপালপুরে আনা-নেওয়া করতেন। বৈরান নদীর কারণে খুব সহজেই উত্তর টাঙ্গাইল তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্যতম প্রসিদ্ধ ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে গোপালপুর। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হওয়ায় পাকিস্তান আমল থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বৈরান নদীর তীরে দোকানপাট নির্মাণ শুরু করেন। স্বাধীনতার পর গোপালপুর শহরের আরো প্রসার ঘটে। তখন বৈরান নদীর দুই পারে দোকানপাট গড়ে উঠতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা নদীর পার দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করতে থাকে। একপর্যায়ে পাকা ভবনও উঠতে থাকে। অল্প দিনের মধ্যে বৈরানের দুই পারে দখলের হিড়িক পড়ে যায়। দোকান ছাড়াও ঘরবাড়ি তুলে বসতি গড়ে ওঠে। এভাবে কয়েক দশকের ব্যবধানে দখলে দখলে বৈরান নদী সরু খালে পরিণত হয়।

গোপালপুর শহরের মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান বলেন, পাকিস্তান আমলে ১৪ আগস্ট এই নদীতে নৌকাবাইচ হতো। ২০ বছর আগেও বৈরানে প্রায় সারা বছর পানি থাকত। স্রোতও থাকত। আস্তে আস্তে দখল হতে হতে এখন দুই পাশ চেপে সরু খাল হয়ে গেছে। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই যে বৈরান একসময় খরস্রোতা ছিল।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সুভাস চন্দ্র পাল বলেন, 'ছোটবেলায় যে বৈরান নদী দেখেছি তার কথা মনে হলে খুব কষ্ট লাগে। মানুষ জায়গা দখল করে নদীকে শেষ করে দিয়েছে। আবার অনেকে নিজেদের জায়গা হিসেবে কাগজ দেখায়। এটা কী করে সম্ভব হলো! সরকারি অফিসের লোকজনের মাধ্যমে তারা কিভাবে কাগজ করতে পারল?'

কোনাবাড়ী মহিলা কলেজ রোডের বেলায়েত হোসেন বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছাড়াও দখলদারের তালিকায় রয়েছে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। অনেকে ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় জাল দলিল তৈরি করে নিয়েছে। ফলে তাদের উচ্ছেদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বৈরান দখল হওয়ায় পরিবেশ নষ্ট হয়ে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। বৃহত্তর স্বার্থে নদী দখলমুক্ত করে এর প্রবাহ ঠিক রাখা উচিত বলে বৈরান নদীর পারে বসবাস করা লোকজনের দাবি।

এ ব্যাপারে গোপালপুর পৌরসভার মেয়র জাহাঙ্গীর আলম রুবেল কালের কণ্ঠকে বলেন, আগের বৈরান এখন আর নেই। দুই দিক দিয়েই দখল হয়ে গেছে। নদীর পারের খাসজমি অনেকে তহশিল অফিসের অসৎ ব্যক্তিদের মাধ্যমে কাগজ করে নিয়েছে। বৈরানকে দখলমুক্ত করার জন্য একবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সফল হওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনসহ সবার সহযোগিতা পেলে আবার বৈরানকে দখলমুক্ত করার আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা