kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

মারমা ভাষায় লিখলেন তিনি নিজেদের ইতিহাস

নিজেদের মাতৃভাষায় এর আগে মারমাদের পূর্ণাঙ্গ বই লেখা হয়নি বাংলাদেশে। এই প্রথম লিখলেন নুথোয়াই মারমা বারাঙ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতকোত্তরের ছাত্র তিনি। ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থটির নাম ‘মারমা তইংরাংস্বা। ’বইটি লিখতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে নুথোয়াইকে। সেই গল্প বলছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১০ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মারমা ভাষায়  লিখলেন তিনি নিজেদের ইতিহাস

নুথোয়াই মারমা বারাঙ,ছবি : কাকলী প্রধান

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির দুর্গম অংজাইপাড়ায় জন্ম নুথোয়াইয়ের। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। ছেলেবেলা থেকেই অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী। মা-বাবা জুম চাষি।

বিজ্ঞাপন

এত বড় পরিবারের মুখে আহার জোগাতে হিমশিম খেতে হতো তাঁদের। জুমের মৌসুমে বাবা   দূর-দূরান্তে চলে যেতেন অন্যের জমিতে মজুর খাটতে।   এক-দেড় মাস পরে ফিরতেন। তত দিনে নুথোয়াইদের খাবারের চাল ফুরিয়ে আসত। ফলে কোনো কোনো সময় এক বেলা খেয়েও দিন কাটাতে হয়েছে। এসবের মধ্যেও স্কুল ফাঁকি দিতেন না। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে মেধাতালিকায় বোর্ড বৃত্তিও পেয়েছিলেন। রোয়াংছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং বান্দরবান সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কলেজ পর্যন্ত অনাথ আশ্রম ও বিভিন্ন হোস্টেলে কেটেছে তাঁর জীবন। এইচএসসি পাসের পর দেখলেন, বন্ধুদের প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করছে। কিন্তু টাকার অভাবে কোচিং করতে পারেননি। জুম চাষে   মা-বাবাকে সহযোগিতা করার পর যে সময় পেতেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতেন। এভাবে পড়েই ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ভর্তির সুযোগ পান।

 ‘মারমাদের ইতিহাস নিয়ে আগেও বই লেখা হয়েছে, কিন্তু সেটা বাংলায়। এর বাইরে মারমা হরফে কিছু ছড়া, গল্প ইত্যাদি লেখা হয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে। মারমা ভাষায় তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে এ রকম গ্রন্থ এই প্রথম। এই বয়সে নুথোয়াই যে সাহস দেখিয়েছেন সেটা প্রশংসার যোগ্য 
ক্য শৈ প্রু মারমা (খোকা)
মারমা ভাষার গবেষক ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বান্দরবান 

 

তখন তিনি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র

নিজের মাতৃভাষা নিয়ে নুথোয়াইয়ের আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকতেই মারমা ভাষা শিখেছেন বাবার কাছে। ঈদের ছুটিতে মাসখানেক বন্ধ থাকত স্কুল। সে সময় জুমের টংঘরে বসে আয়ত্ত করতে থাকেন মারমা ভাষার বর্ণমালা। পরে শ্রমণজীবন গ্রহণ করে দুই বছর কাটান রোয়াংছড়ি কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহারে। বিহারাধ্যক্ষ উ.পঞ্যানন্দ মহাথেরোর হাত ধরেই শিখে ফেলেন সূত্র পিটক, লোকনীতিসহ বৌদ্ধ ধর্মীয় বিভিন্ন গাথাশাস্ত্র। মারমা ভাষা লিখতে ও পড়তে পারেন নুথোয়াই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন ভালোভাবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় গিয়েও দেখেন স্টলে স্টলে শোভা পাচ্ছে হরেক রকম বই। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর কিছু বই থাকলেও সেখানে মারমা ভাষার বই নেই বললেই চলে। দু-একটি স্টলে মারমাদের নানা বিষয় নিয়ে লেখা বই আছে। কিন্তু সেটিও বাংলা কিংবা ইংরেজিতে লেখা। দেখে খারাপ লাগে নুথোয়াইয়ের। জেদ চেপে যায় মনে। ঠিক করলেন নিজেই লিখবেন মারমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি।

 

মারমা তইংরাংস্বা বইয়ের প্রচ্ছদ

কাজ শুরু করলেন

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি দ্বিতীয় বর্ষে এসে সংগ্রহ করতে থাকেন মারমা জাতিসংক্রান্ত দেশি-বিদেশি বই, ম্যাগাজিন ও জার্নাল। বন্ধুবান্ধব ও সিনিয়রদের কাছ থেকে বইপত্র নিয়েও পড়তে শুরু করলেন। ইন্টারনেট ঘেঁটে অনেক কিছু জোগাড় করলেন।   বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদেও অনেকের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল নুথোয়াইয়ের। তাঁদের কাছ থেকেও অনেক তথ্য-উপাত্ত পেলেন। ফেসবুকেও এ বিষয়ে একটি গ্রুপ খুলে লোকজনের কাছে মারমাদের সম্পর্কিত নানা তথ্য চাইলেন। ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবের ছুটিগুলোতে গ্রামে যেতেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানে বসবাসরত মারমাদের কাছেও গেলেন। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে গিয়ে প্রবীণ ব্যক্তি, পাড়ার কার্বারি, হেডম্যান, বৌদ্ধ ভিক্ষু, শিক্ষকসহ অনেকের সাক্ষাৎকার নিলেন। মোবাইলে রেকর্ডের পাশাপাশি শুনে শুনে নোট করলেন খাতায়। ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্যের পাশাপাশি মারমা লোকসাহিত্যও সংগ্রহ করলেন।

নিজের লেখা বই হাতে মা-বাবার সঙ্গে নুথোয়াই মারমা।

এবার লেখার পালা

তথ্য-উপাত্ত তো সংগ্রহ হলো। বৈচিত্র্যময় তথ্যগুলোকে এবার এক সুতায় গাঁথার পালা। এ ক্ষেত্রে করোনা আশীর্বাদ হয়ে এলো নুথোয়াইয়ের জীবনে। করোনার কারণে দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস বন্ধ ছিল। সময়টা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন তিনি। খাতায় খসড়া লেখা এবং মোবাইলে রেকর্ড করা সাক্ষাৎকারগুলো আবার পর্যায়ক্রমে সাজালেন। পরে সেগুলো মারমা ভাষায় অনুবাদ শুরু করলেন। কম্পিউটার নেই নুথোয়াইয়ের। তাই হাতের মোবাইলই ভরসা। মোবাইলে টাইপ শুরু করলেন। দেখা গেল সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার শব্দ হয়ে গেছে। কয়েকবার সম্পাদনার পর সেটা এসে ঠেকল ৪০ হাজারে।

 

লেখা হলো, কিন্তু ছাপবে কে?

পাণ্ডুলিপি তো তৈরি, কিন্তু কোন প্রকাশক ছাপবেন এই তরুণ লেখকের বই, যেটির আবার বাজার কাটতির সম্ভাবনাও খুব বেশি নেই? গাঁটের পয়সা খরচ করে ছাপানোর সামর্থ্যও নেই। বেশ কয়েকজন প্রকাশকের কাছে ধরনা দিয়ে নিরাশ হয়েছেন। বললেন, ‘অনেকে বলেছেন এই বই ছেপে আমাদের কী লাভ? কিন্তু এটা আমার আবেগ। তাই ভাবলাম, লিখেই যখন ফেলেছি, ধারদেনা করে হলেও প্রকাশ করব। ’ টিউশনি করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। ছোট ভাই চিংসাথুই মারমা ও বন্ধু থুইনুমংয়ের কাছ থেকে ধার নিলেন ৪০ হাজার টাকা। টংসা প্রডাকশনও কিছু টাকা ধার দিল। সেই অর্থে ৩০০ কপি বই ছাপালেন নীলক্ষেতের একটি প্রকাশনা থেকে।

২৯ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে।

কী আছে বইয়ে

গত ২৯ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। এটি মূলত মারমাদের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়েই লেখা। নাম ‘মারমা তইংরাংস্বা’। বাংলায় ‘মারমা আদিবাসী’। মোট ২৫৬ পৃষ্ঠার বইটি নুথোয়াই উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা-বাবাকে। অধ্যায় আছে মোট ১১টি। রাজোয়াং-ইতিহাস কী, মারমা-মগ জাতিসত্তা, রাখাইন-মারমা-ম্রাইমা, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাক-ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস, মারমা ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস, বোমাং ও মং সার্কেলের রাজাদের জীবনবৃত্তান্ত ও ইতিহাস, মারমাদের জীবন-জীবিকা, সামাজিক রীতিনীতি, উৎসব-পার্বণ, লোকসাহিত্য, আধুনিক মারমা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবদান, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস শিরোনামের অধ্যায়গুলোতে মূলত মারমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি আলোকপাত করেছেন নুথোয়াই।

 

লেখক বললেন

কখনো ভাবিনি মারমা বর্ণমালায় মারমা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখব। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই ‘মারমা তইংরাংস্বা’ লিখেছি। এটি আমার দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সাধনার ফসল। মাতৃভাষায় আমাদের ইতিহাস বা সংস্কৃতি নিয়ে বই না থাকায় মনে আক্ষেপ ছিল। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলার অনেকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে। ফেসবুকের কল্যাণে দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের সাহায্য পেয়েছি। পড়াশোনার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই মারমা ভাষার বিশারদদের প্রশ্ন করতাম, নোট করে রাখতাম। মানুষ বইটি গ্রহণ করছে দেখে ভালো লাগছে। সামনে মারমা ভাষা নিয়ে আরো বিশদ কাজ করতে চাই।



সাতদিনের সেরা