kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

২৯ মে ছিল এভারেস্ট দিবস

ম্যালোরিই কি প্রথম!

দেবাশিস বল   

৩০ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ম্যালোরিই কি প্রথম!

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক অ্যাডভেঞ্চার তথা অনুসন্ধানী ভ্রমণের এক স্বর্ণালি সময়। পৃথিবীর বিপরীত দুই মেরুতে এই সময়েই মানুষের পা পড়ে। কিন্তু এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে তখনো অধরা ছিল তৃতীয় মেরুখ্যাত মাউন্ট এভারেস্ট। তাই ইতিহাসে স্থায়ীভাবে নাম লিখে রাখার ইঁদুর দৌড়ে লিপ্ত হয়েছিল ইউরোপের দেশগুলো। সবচেয়ে এগিয়ে ছিল ব্রিটিশরা। ব্রিটিশ নেতৃত্বে প্রথম এভারেস্ট অভিযান পরিচালিত হয় ১৯২১ সালে। দলের একজন সদস্য ছিলেন জর্জ ম্যালোরি। তিনি ১৮৮৬ সালে চেশায়ারের মেবারলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিব্বতের দিক থেকে চূড়ায় ওঠার রাস্তা আবিষ্কার করেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন গাই বুলক। তাঁরা বিখ্যাত নর্থ কোল পর্যন্ত উঠতে সক্ষম হলেও চূড়ায় পৌঁছানোর প্রস্তুতি তাঁদের ছিল না। তাই চূড়া ধরা বাকি থেকে যায়। তবে ইতিহাসে আঁচড় কেটে যান। কিন্তু তখনো কেউ জানত না কী ঢেউ তৈরি করবেন ম্যালোরি!

পরের বছর আরো ভালো প্রস্তুতি নিয়ে এভারেস্টে এসে পৌঁছান জর্জ ম্যালোরি ও তাঁর দল। কিন্তু সেবারও খালি হাতে ফিরতে হয়। শুধু তাই নয়, নামার পথে তুষারধসে প্রাণ হারান সাতজন শেরপা। ভাঙা হৃদয় নিয়ে বাড়ি ফেরেন ম্যালোরি। তখন মনে করা হয়েছিল লোকটা আর হয়তো এভারেস্টে যাবেন না। কারণ এরই মধ্যে তিনটি সন্তানের বাবা হয়েছেন তিনি। বয়স উঠেছে পঁয়ত্রিশে। কিন্তু ম্যালোরি ছিলেন অন্য ধাতু দিয়ে গড়া। পাহাড়ের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারতেন না তিনি। তাই সবার ধারণার গুড়ে বালি দিয়ে ১৯২৪ সালে ৩৮ বছর বয়সে আবারও এভারেস্ট অভিযানে বেরিয়ে পড়েন ম্যালোরি। তবে এবার সহজ ছিল না। একে তো বয়স অনেক, তার ওপর স্ত্রী রুথও খুশি ছিলেন না। কিন্তু ম্যালোরি পাহাড়ের ডাকে পাগল হয়ে উঠেছিলেন। আর স্ত্রীকে টোপ দিলেন, চূড়ায় রেখে আসব তোমার ছবি। অমর হয়ে থাকবে। এই ছবিটিই জন্ম দিল, এক বিরাট প্রশ্নের-ম্যালোরিই কি প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী?

অবশ্য অভিযান শুরু হওয়ার আগেই ম্যালোরি আলোচনায় চলে আসেন নিউ ইয়র্কের সংবাদ সম্মেলনে। ঘোষণা করেন-এবার এভারেস্ট বিজয় নিশ্চিত। এটাই ছিল সেই সংবাদ সম্মেলন, যেখানে এক সাংবাদিকের-হোয়াই ডু ইউ ওয়ান্ট টু ক্লাইম্ব এভারেস্ট?-এর প্রশ্নের জবাবে ম্যালোরি বলেছিলেন-বিকজ ইট ইজ দেয়ার।

১৯২৪ সালের সেবারকার অভিযানে পর পর দুবার চেষ্টা চালানো হয় শিখর আরোহণের। কিন্তু পেরে উঠছিলেন না আরোহীরা। অনুকূল সময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ম্যালোরি ছিলেন অটল। শেষ আরেকবার চেষ্টা চালাবেন বলে ঠিক করলেন। সঙ্গী নিলেন ২২ বছর বয়সী তরুণ পর্বতারোহী এন্ড্রু আরভিনকে। জুনের ৪ তারিখ অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্প থেকে ওপরের দিকে রওনা দিয়ে পরের তিন দিনে তাঁরা একে একে ৫ ও ৬ নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছেন। এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক ৮ জুন।

সেদিন দুজনের দলটাকে দুপুরের দিকে চূড়ার কয়েক শ ফুট নিচে শেষবারের মতো দেখা যায়। এর পরপরই হারিয়ে যান জর্জ ম্যালোরি ও আরভিন। তাঁদের অন্তর্ধান এখনো মাউন্টেনিয়ারিংয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে আছে। প্রায় আট হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় শেষবার তাঁদের যেখানে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়, চূড়া সেখান থেকে বলতে গেলে হাতছোঁয়া দূরত্বেই ছিল। ধারণা করা হয়, তাঁদের অক্সিজেন সিলিন্ডারে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ছিল এবং শেষ কয়েক শ ফুট পাড়ি দেওয়ার মতো যথেষ্ট ফিটও তাঁরা ছিলেন। তবে কি ১৯৫৩ সালে প্রথম এভারেস্ট জয়ের প্রায় ৩০ বছর আগেই তাঁরা প্রথম মানুষ হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়াতে পেরেছিলেন?

তাঁদের অন্তর্ধানের ৭৫ বছর পর ১৯৯৯ সালে ম্যালোরি ও আরভিনের খোঁজে এক অভিযান পরিচালিত হয়। ম্যালোরির মৃতদেহ যেখানে পাওয়া গিয়েছিল সেখানেই তাঁর পোশাক-আশাক পাওয়া গিয়েছিল। শেষ ক্যাম্প থেকে নিয়ে যাওয়া সব জিনিস ছিল এগুলোর মধ্যে। ছিল না শুধু তাঁর স্ত্রী রুথের একটা ফটোগ্রাফ, যেটা তিনি চূড়ায় রেখে আসবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন! তবে কি সত্যিই তাঁরা চূড়া জয় করে নেমে আসছিলেন? আরভিনের সঙ্গে থাকা 'কোডাক' ক্যামেরাটাই এই কোটি টাকার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারত। কিন্তু সেটাও আরভিনের সঙ্গে সঙ্গেই চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। উল্লেখ্য, আরভিনের মৃতদেহ কখনোই খুঁজে

পাওয়া যায়নি।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ম্যালোরি ও রুথের কয়েকটি টেলিগ্রাম 

 

রুথকে ম্যালোরি (১৪ জুলাই ১৯১৪)

আমরা কি হঠাৎই একদিন দেখব যে যুদ্ধটা শেষ হয়ে গেল, যেভাবে হঠাৎই শুরু হয়েছিল। ভয় হয়-তা হয়তো শিগগিরই নয়।

রুথকে ম্যালোরি (২৬ জুলাই ১৯১৪)

ঘুমাতে যাওয়ার আগে স্পষ্ট শুনতে পেলাম, তাঁবুর ভেতর কেউ ফিসফিস করে বলছে আমাদের সৈন্যদল নাকি নিজেদের গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত। শোনার পর কী ভয়ানক অনুভূতি, তোমাকে বোঝাতে পারব না।

ম্যালোরিকে রুথ (১০ আগস্ট ১৯১৫)

ভেবে অবাক হচ্ছি-আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে কি পেরে উঠব বা আমাদের বাচ্চাদের সঠিক সঙ্গী হতে পারব তো? চেষ্টা করতেই হবে আর এ-ও মনে রাখতে হবে, আমরা তাদের শেখানোর পাশাপাশি তাদের থেকেও যেন আমরা শিখি।

ম্যালোরিকে রুথ (৪ মে ১৯১৬)

ভাবলাম, আজ রাতে অবশ্যই তোমাকে লেখা উচিত, তাতে তোমার কাছে থাকতে পারব। প্রিয়, আমি ঠিক আছি। আমি আর কাঁদছি না, আর আমি এখন খুবই উৎফুল্ল। আমাদের সন্তান ঘুমাতে যাওয়ার আগেই আমি বাড়ি ফিরব আর এটা খুবই আনন্দদায়ক। আমার জীবনে আর সব কিছু থেকে তার আনন্দটাই এখন আমার কাছে বড়।

ম্যালোরিকে রুথ (২৬ ডিসেম্বর ১৯১৬)

তোমাকে বিদায় দেওয়ার পর ছোট গেটটা পেরিয়ে যে টিলাটা আছে তার ওপরে গিয়ে বসেছিলাম। আমাকে একটু কাঁদতে হতো। তুমি জানো। দেয়ালে হেলান দিয়ে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়েছিলাম। নিভৃতে প্রার্থনা করছিলাম, যেন ঈশ্বরের কাছাকাছি থাকতে পারি, তোমার কাছে থাকতে পারি, সব কিছুর কাছে। মনে হচ্ছিল না, খুব মনোযোগ দিতে পারছিলাম, কিন্তু বেশ ভালো লাগছিল, প্রশান্তি লাগছিল।

 

 

মন্তব্য