kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বিপাকে মাঠ প্রশাসন

শাস্তি দিয়ে মাস্ক পরানো কঠিন

বাহরাম খান   

৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শাস্তি দিয়ে মাস্ক পরানো কঠিন

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলানোর প্রস্তুতিতে হিমশিম অবস্থায় মাঠ প্রশাসন। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর বিষয়ে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু খুব কম মানুষই স্বাস্থ্যবিধি মানছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মানুষ মাস্ক পরতেই চায় না। সেখানে কিভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব, তা বুঝতে পারছেন না ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)।

দেশের আটটি বিভাগের ডিসি, ইউএনও ও সহকারী কমিশনার পর্যায়ের অন্তত সাতজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিবেদক। তাঁদের মূলকথা, মোবাইল কোর্ট করে স্বাস্থ্যবিধি মানানো অসম্ভব কাজ। সরকারের কঠোর নির্দেশনা থাকায় তাঁরা কমবেশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সঙ্গে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। তাঁদের মতে, এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বেশি করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

কমিউনিটির বড় অংশগ্রহণ ছাড়া শুধু প্রশাসনের মাধ্যমে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানো সম্ভব নয়। গত কয়েক সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে করা ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম মাস্ক পরার ওপর গুরুত্বারোপ করে না পরলে কঠোর সাজা দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, খুব বেশি কঠোর হতে গেলে উল্টো প্রশাসনের ওপর খেপে যেতে পারে সাধারণ মানুষ। তাই আর্থিক দণ্ড দেওয়া হলেও এ বিষয়ে জেল দেওয়া হচ্ছে না।

এ ছাড়া মাঠ প্রশাসনে ম্যাজিস্ট্রেটের ঘাটতি আছে। যাঁরা আছেন তাঁদের অনেকেরই মোবাইল কোর্ট সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নেই। অনভিজ্ঞরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে সরকারকে বিব্রত হতে হয়। এ ক্ষেত্রে অনেকে যশোরের মণিরামপুরের এক বৃদ্ধকে কানে ধরানোর ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে দেখান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট বিভাগের এক ডিসির মন্তব্য, ‘উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ দিলে আমাদের সেই সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থাকা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।’

মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী সুনামগঞ্জের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট একটি জরিমানার মামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, একজনকে জরিমানা করলে সে আঙুল দিয়ে দূরের ১০ জনকে দেখায়। বলে, সবাইকে মাস্ক পরাতে পারবেন না। তাই হালকা অভিযান পরিচালনার সঙ্গে বড় ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

স্ববিরোধিতা?

সরকারের পক্ষ থেকে মাস্ক পরার বিষয়ে জোর দেওয়া হলেও করোনার মধ্যে সরকারি অনেক কার্যক্রম নিয়ে সচিবালয়ের কর্মকর্তারাই প্রশ্ন তুলছেন। তাঁরা বলছেন, শীর্ষপর্যায় থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানার উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সেই ছাপ থাকছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর করোনার কারণে ডিসি সম্মেলন না হলেও আগামী বছরের শুরুতে সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা চলছে। জানুয়ারির ৫, ৬ ও ৭ তারিখ ডিসি সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব গেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। সরকারপ্রধান সম্মতি দিলে ৬৪ জেলার ডিসি, আট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং মন্ত্রী-সচিবদের নিয়ে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

ফেব্রুয়ারি মাসে পুলিশ প্রশাসনের বার্ষিক বড় সম্মেলন ‘পুলিশ সপ্তাহ’ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ঘরোয়াভাবে বিজয় দিবস উদযাপন করা যাবে বলেও জানিয়েছেন। করোনার মধ্যে একাধিক সংসদীয় আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন চলছে দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচনের ডামাডোল। প্রথম পর্যায়ে ২৫টি পৌরসভা নির্বাচন হবে ২৮ ডিসেম্বর। আগামী মার্চে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হবে। স্থানীয় সরকারের এসব নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ পেতে প্রচুরসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে ঢাকায় যাতায়াত করতে হয়। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে ঘরোয়া বৈঠক ও প্রচারণা চলে অনেক আগে থেকেই। এসব কার্যক্রম করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সরকারি সতর্কতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে অক্টোবরের প্রথম দিকে ডিসিদের কাছে পরিকল্পনা চেয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত মাসের মধ্যেই বিভাগীয় কমিশনাররা ডিসিদের করা পরিকল্পনা ঢাকায় পাঠিয়েছেন। এসংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ জেলা থেকেই সামাজিক সচেতনতার ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন ও ক্লাবগুলোকে যুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের ডামাডোলের মধ্যে রাজনৈতিক লোকজনই স্বাস্থ্যবিধি ভাঙার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। অথচ প্রভাবশালী এই অংশকে করোনাসচেতনতায় কাজে লাগানো প্রয়োজন।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জীবন-জীবিকা চালানোর সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধিও মানতে হবে। নিজেদের সচেতনতার জায়গাটা তৈরি করা এবং সে অনুযায়ী চলার জন্য সরকারের চেষ্টার কমতি নেই।’

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, ‘মানুষকে মাস্ক ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে মাঠ প্রশাসন আপ্রাণ চেষ্টা করছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা