kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

স্বাধীনতা যেভাবে আমাদের হলো

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বাধীনতা যেভাবে আমাদের হলো

১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাঙালি যে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছিল তার দিশারি ও নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সত্তরের নির্বাচনে জয়ের ফলে যে আশাজাগানিয়া দৃশ্যপট তৈরি হয়েছিল তা ১ মার্চ ইয়াহিয়ার এক বেতার ভাষণে উবে গেল। সিদ্ধান্তহীন ও উত্কণ্ঠিত বাঙালি জাতির সামনে আগামীর ইঙ্গিত এলো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

 

১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লাহোরের উর্দু সাময়িকীতে সাক্ষাত্কার দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাঙালির ইতিহাস জানেন না। বাঙালিরা বেশি দিন বিদেশিদের অধীনে থাকে না। পাকিস্তানের সঙ্গেও তারা থাকবে না।’ একাত্তরে ভবিষ্যদ্বাণীটি ফলে গিয়েছিল।

সাতচল্লিশে পাকিস্তান হওয়ার কয়েক দিন পর কলকাতার বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে বঙ্গবন্ধু কয়েকজন সঙ্গীকে বলেছিলেন, ‘ওই মাউরাদের সাথে বেশি দিন থাকা যাবে না’ এবং ঢাকা ফিরে বাঙালির অধিকারের জন্য আন্দোলন শুরু করতে হবে। সাতচল্লিশ থেকেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল; আর মাউরাদের সঙ্গে থাকার ব্যাপারটি চুকেবুকে গিয়েছিল একাত্তরে।

অর্থাত্ মাওলানা আযাদ ও বঙ্গবন্ধু উভয়েই সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ তার প্রমাণ। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৪ বছর চার মাস তিন দিন লাগাতার সংগ্রাম করেই বাঙালি তাদের ইতিহাস নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছেছিল।

ভাষার প্রশ্নে সংগ্রামের সূচনা। ভাষার প্রশ্নেই ‘মাউরাদের’ মানসিকতার প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। ৫৪ শতাংশ বাঙালির বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে ৬.০৭ শতাংশের উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এই বহিঃপ্রকাশ। তবে এটাও ঠিক যে প্রতিবাদে-প্রতিরোধে বাঙালি যে ভাষা আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তার হাত ধরে শুধু ভাষিক-সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়নি; বরং বাঙালির সামগ্রিক জাতীয়তাবাদী চেতনারও স্ফুরণ ঘটেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে আমরা বলি, ভাষিক জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশ সৃষ্টির পাটাতন। কথাটি সত্যি, তবে সম্পূর্ণ নয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাঙালি জাতির মতোই মিশ্র; এর উপাদান ভাষা, ভূগোল, নৃতত্ত্ব ও ইতিহাস-ঐতিহ্য। স্মর্তব্য, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়েও আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ।’ উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুবচনে তিনটি উপাদান ছিল—নৃতত্ত্ব, ভাষা ও ভূগোল। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে স্লোগান ছিল, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।

(ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভূগোল), ‘তুমি কে? আমি কে? বাঙালি, বাঙালি।’ (নৃতত্ত্ব), ‘তোমার-আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’ (ভূগোল); এবং ‘ঢাকা না পিন্ডি? ঢাকা, ঢাকা’ (ভূগোল)। এমনকি উনসত্তরের সেপ্টেম্বর থেকে উত্থিত ‘জয় বাংলা’ স্লোগানেও ছিল ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভূগোলের উপাদান। সব মিলিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ একমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক। তবে সবচেয়ে বড় উপাদানটি হলো বাঙালিত্ব অনুভূতি; যে কথাটি বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন (১২ অক্টোবর ১৯৭২, সংবিধান সভায় ভাষণ)।

অগ্রজ অনেক নেতা বাঙালির অধিকার নিয়ে সরব-সোচ্চার থাকলেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল প্রবক্তা। স্মর্তব্য, ১৯৬৩ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ইংরেজিতে বলেছিলেন, Leave East Pakistan to work out its own destiny. (পূর্ব পাকিস্তানকে তার ভাগ্য গড়ে নিতে দাও)। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী পাকিস্তানকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন। তবে বাঙালির নাড়ির স্পন্দন একমাত্র বঙ্গবন্ধুই ঠিকমতো বুঝেছিলেন। এ কারণে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের সূচনায় সিরাজুল আলম খানের মন্তব্য ছিল, ‘শেখ মুজিবের নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন করতে হবে। কারণ লোকে তাঁর কথা শোনে।’ মন্তব্যটি নেতা-জনতার মেলবন্ধনও প্রমাণ করে। যা হোক, ইতিহাস বলে, তাঁর নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন হয়েছে।

১৯৬১ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। দলীয় ভূমিকার বাইরে তাঁর নিজস্ব প্রকল্পের নাম ছিল ‘পূর্ববঙ্গ মুক্তিফ্রন্ট’। নিজের খরচে প্রচারপত্র ছেপে সাইকেলে চড়ে তিনি ঢাকা শহরময় তা বিলি করেছেন। ১৯৬১ সালেই এক গোপন বৈঠকে কমরেড মণি সিংহ ও খোকা রায়কে সাফ কথা বলে দিলেন, স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কিছু ভাবছেন না। তেষট্টি সালে গোপনে আগরতলা গিয়ে নেহরুর কাছে একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার চেয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন। ছেষট্টি সালে ছয় দফা নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে ন্যাপ নেতা (মস্কোপন্থী) অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে বললেন, ‘আরে মিয়া বুজলা না, দফা তো একটাই। একটু ঘুরাইয়া কইলাম।’ এক দফা যে স্বাধীনতার, তা বুঝতে অধ্যাপকের অসুবিধা হয়নি (লেখকের কাছে অধ্যাপকের মন্তব্য)। উনসত্তরের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনাসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ করলেন ‘বাংলাদেশ’। পরদিন সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে মওলানা ভাসানী ও আতাউর রহমান খান এ প্রস্তাব সমর্থন করলেন। সত্তরের নির্বাচনের আগে ইয়াহিয়া খানের আইনি কাঠামো আদেশ (Legal Framework Order)  নিয়ে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত কি না এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় মন্তব্য ছিল, ‘আমার লক্ষ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা। নির্বাচন হয়ে গেলে আমি এলএফও টুকরা টুকরা করে ছিঁড়ে ফেলব।’ বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছিল (১৬৯-এর মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়)।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাঙালি যে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছিল তার দিশারি ও নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সত্তরের নির্বাচনে জয়ের ফলে যে আশাজাগানিয়া দৃশ্যপট তৈরি হয়েছিল তা ১ মার্চ ইয়াহিয়ার এক বেতার ভাষণে উবে গেল। সিদ্ধান্তহীন ও উত্কণ্ঠিত বাঙালি জাতির সামনে আগামীর ইঙ্গিত এলো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা এলো, কিন্তু প্রত্যক্ষ বা সরাসরি ঘোষণা হলো না। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেল; সাপ মারা হলো; কিন্তু লাঠি ভাঙল না। এ ভাষণের অসংখ্য ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এটি ছিল একটি।

২৫ মার্চ রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সর্বশেষ অতিথি ছিলেন তরুণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ। তাঁকে দ্রুত বিদায়ের জন্য ব্যস্ত থেকেও একপর্যায়ে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ফিসফিসিয়ে ইংরেজিতে বললেন, I have given you independence. Now you preserve it. (আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিয়েছি। এখন একে রক্ষা করো)। বাঙালি গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হয় রাত সাড়ে ১০টার দিকে; আর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শর্ট ওয়েভে বঙ্গবন্ধুর রেকর্ড করা বার্তা শোনা গিয়েছিল, ‘সম্ভবত এটাই আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ কাজেই ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস।

এভাবেই স্বাধীনতা আমাদের হলো।

 

লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা