বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর উল্টো পথে চলা বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ কখনো মসৃণ ছিল না। আর শেখ হাসিনাকে পথ চলতে হয়েছে আরো কঠিন কণ্টকাকীর্ণ পথে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছাড়াও ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। তবু তিনি পিছপা হননি তাঁর লক্ষ্য থেকে। তিনি প্রতিনিয়ত জনগণের মাঝখানে থেকে কৌশলপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছেন। ক্লান্তিহীন নীরব সংগ্রাম করে দলকে শক্তিশালী করেছেন। গণতন্ত্রের সংগ্রামে বিজয়ের লক্ষ্যে নীলকণ্ঠ হয়ে সবাইকে নিয়ে দীর্ঘ লড়াই করেছেন ঐক্যবদ্ধভাবে। অবশেষে ২০০৮ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আবার ক্ষমতায় এসে ঘোষণা দিলেন তিনি তাঁর পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন। বাংলাদেশের মানুষও খুঁজে পায় নতুন পথের দিশা। বদলাতে থাকে আগামীর সম্ভাবনা। ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল বাংলাদেশ ঠাঁই করে নেয় পৃথিবীর নতুন গন্তব্যে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বেকারত্ব হ্রাস, জেলেদের খাদ্য সহায়তা, কৃষিতে সফলতা, নারীর ক্ষমতায়ন, কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ফ্লাইওভার তথা অবকাঠামো উন্নয়নে বিপ্লব ঘটেছে। স্থলসীমানা চুক্তির বাস্তবায়ন, পদ্মা সেতু নির্মাণ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, গরিব শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান, বিনা মূল্যে এক কোটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই বিতরণ, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল তথ্য সেবা কেন্দ্র স্থাপন, মোবাইল ও ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষপণ, অভ্যরীণ ও আঞ্চলিক সন্ত্রাস কঠোর হস্তে দমন করেছেন। পিলখানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি ও জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের এক নম্বর স্থান। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা ৩৯ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামে বারবার মৃত্যুকে জয় করে ক্ষমতায় আছেন বলেই জাতির জনকের হত্যাকারীদের বিচার কার্যকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করে জাতীয় রাজনীতিতে গণমানুষের শক্তি ও সমর্থনে দেশি-বিদেশি শক্তির চাপ থাকা সত্ত্বেও মানবতাবিরোধীদের আইনের আওতায় এনে তাদের বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিচুক্তির বাস্তবায়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক আদালতে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে মামলায় জিতে সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ করে আরেক বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের ঘোষিত ২০২১ ও ২০৪১ রূপকল্প এবং ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর দূরদর্শিতা ও গতিশীল নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা ও জনপ্রিয়তা তাঁর দলের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে বৃহৎ প্রকল্প আজ যে হারে দৃশ্যমান এ যেন এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। আমার গ্রাম হবে আমার শহর, গ্রামের প্রত্যেক মানুষ আজ আধুনিক নগরজীবনের সুবিধা পেতে চায়, তারুণ্যের শক্তিতে জ্বলে উঠতে চায় যুবসমাজ, আর ডেল্টা প্ল্যান কার্যকর করে নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখে মানুষ। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের রোল মডেল। দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য হ্রাস, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন, শিল্প উন্নয়ন, বিদ্যুৎ-জ্বালানির উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুকল্যাণ, যোগাযোগ ও পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের সাফল্য আজ ঈর্ষণীয়। এমডিজি অর্জন করে বাংলাদেশ আজ হাঁটছে এসডিজি বাস্তবায়নের পথে। বাংলাদেশের পরম সৌভাগ্য যে এ দেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো ভিশনারি কর্মঠ ও প্রচণ্ড সৎ এমন বিরল নেতা পেয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের বা উন্নয়নশীল দেশে একজন নেতা দেশকে কিভাবে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারেন, তা শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না। দেশের প্রধানমন্ত্রী সৎ ও আন্তরিক থাকলে যেকোনো দেশের উন্নয়ন সম্ভব, তার জ্বলন্ত প্রমাণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বারবার এই একটি কথাই বলে থাকেন, আমরা যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করেছি, তাই কোনো বিজয়ী জাতি কখনো মাথা নত করে থাকতে পারে না। এই একটি মন্ত্রই শেখ হাসিনার হয়তো মূলমন্ত্র। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের একটানা তিনবারের ধারাবাহিকতায় চারবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় দেশের আমূল অবস্থার পরিবর্তন করেছেন। একসময় দেশে চরম দুর্ভিক্ষ ছিল, ছিল ঘরে ঘরে হাহাকার, মানুষ আশ্রয় নিত ফুটপাতে, রেলস্টেশনের পাশে, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছিল চরম ঘাটতি, হতদরিদ্র মানুষকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হতো, সমাজে বিরাজ করত বিরাট বৈষম্য। এখন কিন্তু আর সেই আগের অবস্থা নেই। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশে নিজেদের উপার্জনে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা একটি বিস্ময়কর বিষয়। দেশের সব কিছুতে পরিবর্তন হয়েছে, আর্থ-সামাজিক সূচকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যাশাজনক সাফল্য অর্জন করেছে এবং বৃদ্ধি পেয়েছে মাথাপিছু আয়ও। বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কাজও অব্যাহতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সমানতালে। নিজস্ব অর্থে পদ্মার ওপর ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করার সাহস দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পরও এই প্রকল্প হাতে নেওয়ায় অনেক দেশ ও সংস্থা সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করলেও সে স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্ব বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে এই বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নেই, বাংলাদেশ পারে। সম্পূর্ণ দেশের টাকায় বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বৃহৎ প্রকল্প পদ্মা সেতুর কাজ এরই মধ্যে অর্ধেক শেষ হয়েছে। ঢাকাবাসীর দুর্ভোগ কমাতে মেট্রো রেল নির্মাণের কাজও চলছে ভালোভাবেই। এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ঢাকাবাসীর ভোগান্তি আর থাকবে না। সত্যি বলতে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাংলাদেশ প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাফল্য দেখিয়ে উন্নয়নের ফানুস উড়িয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার, যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রশংসিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নয়, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবেও প্রশংসিত। বিশ্বের এমন কোনো দেশ বা জাতি নেই, যারা আজ বাংলাদেশকে জানে না, চেনে না। শেখ হাসিনার ভেতরে বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। পিতার রক্তের যোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একই পথে হাঁটছেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এক বিরাট বিস্ময় বিশ্ববাসীর কাছে। আজ আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ কর্তৃক পৃথিবীর দ্বিতীয় ফেভারিট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বীকৃত। ৭৪তম জাতিসংঘের অধিবেশনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অসামান্য অবদান ও কৃতিত্বের সুবাদে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় দুটি পুরস্কার। শিশু স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে সম্মানজনক ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ‘চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট অব ইয়ুথ’ সম্মাননায় ভূষিত হন। এর আগেও তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ ২০১৫ ভূষিত করা হয়। জাতিসংঘে ক্রমেই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছেন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী ব্যাবসায়িক সাময়িকী ফোর্বস এরই মধ্যে তাঁকে বিশ্বের ২৬তম ক্ষমতাধর নারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। স্থান করে নিয়েছেন ‘দ্য ফরেন পলিসি’ প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ ১০০ চিন্তাবিদের তালিকায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন বিশ্বের অন্যতম নেত্রী ও পথপ্রদর্শক। সে জন্যই ভারত ও পাকিস্তান তাঁর কাছ থেকে উন্নয়নের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব শিখতে চায়। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সম্প্রতি বলেছেন, শেখ হাসিনা আমার পথপ্রদর্শক এবং উন্নয়নের রাজনীতির জন্য প্রেরণার উৎস। শুধু প্রিয়াঙ্কা গান্ধীই নন, আমাদের নেত্রীকে বিশ্বনেতাদের মোড়লরাও এরই মধ্যে বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সব মিলিয়ে আজ বিশ্বনেতৃত্বে শেখ হাসিনা, বিশ্বনেতৃত্বে বাংলাদেশ। এটি আমাদের গর্ব, বাঙালি জাতির গর্ব, বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের গর্ব। আসলে তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই ফুল ফুটেছে। লেখক : আওয়ামী কৃষক লীগ নেতা, সংসদ সদস্য ও তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ebadul@beaconpharma.com.bd