৯. (বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা একে অন্যকে বলল) তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে (দূরবর্তী) কোনো স্থানে ফেলে আসো, তাহলেই তোমাদের পিতার দৃষ্টি কেবল তোমাদের প্রতি নিবিষ্ট হবে। তারপর তোমরা ভালো মানুষ হয়ে যাবে। [সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯ (দ্বিতীয় পর্ব)] তাফসির : হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল। বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে আলোচ্য আয়াতে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মূল কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ইসলাম ধর্ম মতে, এক ও অভিন্ন উৎসমূল থেকে মানুষের সৃষ্টি। সব মানুষ আদম (আ.)-এর সন্তান। হাওয়া (আ.)-এর গর্ভ থেকে মানববংশের বিস্তার শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে আদমসন্তান বিভিন্ন গোত্রে, পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেন এই বিভক্তি? এর কারণ হলো, যাতে মানুষ সামাজিক হতে পারে। বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্যের সূতিকায় আবদ্ধ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। তারপর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩) মানব ইতিহাসের প্রথম সংঘাতের ঘটনাটি ছিল নারীকেন্দ্রিক। পছন্দের নারীকে পাওয়ার জন্য, নারীকে ভোগ করার জন্য মানুষ সংঘাতে লিপ্ত হয়। আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল তার পরমা সুন্দরী বোনকে স্ত্রী হিসেবে পেতে তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে। ওই বোনকে বিয়ে করা কাবিলের জন্য অবৈধ ছিল। এভাবে পৃথিবীতে রক্তপাতের সূচনা হয়। ইসলাম নারীকেন্দ্রিক অপরাধ দমন করার জন্য মানুষকে তার চক্ষু সংযত রাখতে বলেছে। বৈধভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা : নূর, আয়াত : ৩০) সংঘাতের দ্বিতীয় কারণ হলো, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা ও বিত্তবিলাস। যেকোনো উপায়ে অর্থ উপার্জন ও অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে দানব করে তোলে। নিজের সুখ ও সম্পদের আশায় অন্যের বৈধ অধিকার সে ছিনিয়ে নিতে প্রাণান্ত প্রয়াস চালায়। আল্লাহ বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছন্ন রাখে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও। এটি সংগত নয়, শিগগিরই তোমরা তা জানতে পারবে।’ (সুরা : তাকাসুর, আয়াত : ১-৩) সংঘাতের তৃতীয় কারণ হলো, ধর্ম, মতাদর্শ ও চিন্তার ভিন্নতা। যুগে যুগে মানুষ ধর্মের নামে, ধর্মকে কেন্দ্র করে কিংবা আদর্শের লড়াইয়ে ভিন্ন ধর্ম, আদর্শ ও চিন্তার মানুষের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু ইসলাম কারো ওপর ধর্ম ও বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নয়। আল্লাহ বলেন, ‘দ্বীন গ্র্রহণে কোনো জোরজবরদস্তি নেই।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৬) সংঘাতের চতুর্থ কারণ হলো, ক্ষমতার লোভ ও ক্ষমতার লড়াই। সংঘাত সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে মানুষ যখন ক্ষমতার উন্মাদনায় মেতে ওঠে। ক্ষমতায় থাকার জন্য, ক্ষমতা দখলের জন্য, রাজ্য জয়ের জন্য, দেশ দখলের জন্য ক্ষমতাপাগল মানুষ দানবের রূপ ধারণ করে। ন্যূনতম মনুষ্যত্ব ও বিবেক বোধ তারা বিসর্জন দেয়। ক্ষমতান্ধদের সেসব লড়াইয়ে কেউ না কেউ জয়ী হয়। তবে সব সময় পরাজিত হয় মানবতা ও সাধারণ মানুষ। ক্ষমতার মদমত্ত মানুষ ভুলে যায় ক্ষমতা কোনো চিরস্থায়ী বস্তু নয়। আল্লাহ বলেন, ‘বলো, হে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করো, আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নাও।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ২৬) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে আমি এই দিনগুলোর (সুদিন-দুর্দিন ও জয়-পরাজয়) আবর্তন ঘটাই।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪০) গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ