ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল ঠেকাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পেছনে কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘোরার অভিযোগ ঠিক নয় বলে দাবি করেছেন আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি তাঁর (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) পেছনে টাকা নিয়ে ঘুরিনি।’
গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালের নিচতলায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. শেখ মহিউদ্দিন এ কথা বলেন। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সরকার হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করার পর বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গত শনিবার নরসিংদীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, আদ-দ্বীন হাসপাতাল তাঁর পেছনে কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে। তবে টাকার প্রতি তাঁর কোনো লোভ নেই। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে প্রথমে জবাব দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন শেখ মহিউদ্দিন। পরে তিনি অভিযোগটি নাকচ করেন।
ডা. শেখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না। মন্ত্রী সাহেবকেই জিজ্ঞেস করেন এই প্রমাণটা উনাকে দেখাতে। মন্ত্রীকে প্রুভ করতে বলেন। হি হ্যাজ টু প্রুভ ইট। আমি তাঁর পেছনে টাকা নিয়ে কেন ঘুরব? আমার তো টাকা নিয়ে ঘোরার দরকার নেই। আমার কথা হলো, তাঁর পেছনে আমি টাকা নিয়ে ঘুরিনি।’
তিনি বলেন, সরকার তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। তবে যে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, সেখানে চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অগ্রগতির বিষয় সরকারকেও জানানো হবে।
আজ আপিল করা হবে : লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ মহিউদ্দিন বলেন, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার (আজ) আপিল করা হবে।
সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপাতত সে ধরনের কোনো চিন্তা নেই। ঘাটতিগুলো দূর করার পর সরকার সহযোগিতা করবে এবং হাসপাতালটি আবার লাইসেন্স পাবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁদের।
‘প্রকৃত কারণ জানতে ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন’ : হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি থাকা রোগীদের বিষয়ে শেখ মহিউদ্দিন বলেন, নতুন কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। তবে কিছু রোগী, বিশেষ করে নবজাতক ও সংকটাপন্ন রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করা ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে আইসিইউতে পাঁচজন, এনআইসিইউতে ৩৬ জন, শিশু বিভাগে ছয়জন, গাইনি বিভাগে ৯ জন এবং অন্যান্য বিভাগে আরো কয়েকজন রোগী ভর্তি আছেন।
শিশুমৃত্যুর ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতগুলো শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তাঁর দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
ডা. শেখ মহিউদ্দিন বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে আরো বিস্তৃত ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হওয়া উচিত।
লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে রিট : এদিকে আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনূছ আলী আকন্দ।
গতকাল এই রিট করা হয় জানিয়ে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আগামী রবিবার বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটটির শুনানি হবে।’
আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানিয়েছেন, এই রিটের সঙ্গে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পর্ক নেই।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর দায়ে গত ১১ জুন আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে সরকার। হাসপাতালটির নির্বাহী পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী ডা. শেখ মহিউদ্দিনকে সম্বোধন করে লাইসেন্স বাতিলের চিঠিতে বলা হয়, ‘গত ২৭ মে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় আদ-দ্বীন হাসপাতালের পাঠানো জবাব ও ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ১৯৮২ সালের দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিনেন্সের ১১ (২) (খ) ধারা অনুযায়ী আপনার হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলো।’
অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুসারে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে লাইসেন্স বাতিলের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয় চিঠিতে। এই চিঠি চ্যালেঞ্জ করেই গতকাল রিট করেন আইনজীবী ইউনূছ আলী আকন্দ।