হামের টিকা যথাসময়ে আমদানি না করে শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা এবং দেশব্যাপী মহামারি সৃষ্টি করে শিশুদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার আবেদন-পরবর্তী শুনানি শেষে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই আদেশ দেন।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বাদী হয়ে মামলাটির আবেদন করেন। মামলায় অন্য অভিযুক্তরা হলেন সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সায়েদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর।
মামলা খারিজের তথ্য নিশ্চিত করে বাদীপক্ষের আইনজীবী সালাউদ্দিন লস্কর বলেন, ‘আজ (গতকাল) আমরা আদালতে ৪২০/৪০৮/৩০৪/৩৪ ধারায় মামলাটি দায়েরের আবেদন করেছিলাম। আদালত ৪০৯ ধারাটি দুদক সম্পর্কিত ধারা বিবেচনায় রেখে তা খারিজ করেছেন। এ সময় আমরা অন্য ধারার অধীনে মামলাটি নিতে আবেদন জানিয়েছিলাম। আদালত বলেছেন, আদেশে বিস্তারিত উল্লেখ করা হবে। আদেশটি হাতে পেলে আমরা পরে সিদ্ধান্ত নেব যে উচ্চ আদালতে যাব কি না।’ মামলার আবেদনের শুনানিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খানও উপস্থিত ছিলেন। মামলাটি খারিজের পর রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাডিশনাল পিপি শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, ‘মামলাটিতে বাদী যেসব সেকশনে মামলার আবেদন করেছেন তার মধ্যে ৪০৯ সেকশনটি (ধারা) দুদকের আওতাভুক্ত। এ ছাড়া মামলার আবেদনে কোনো নির্দিষ্ট জায়গার নাম উল্লেখ করা হয়নি। শুনানিতে আদালত মামলাটি আমলে নেওয়ার মতো কোনো উপাদান না পাওয়ায় তা খারিজ করে দেন।’
আবেদনের পর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সামনে মামলার বাদী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, ‘আমার এলাকাসহ সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে অনেক শিশু মারা গেছে। সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে যারা এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য আদালতে আবেদন জানিয়েছি। বর্তমান সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যই বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এই পরিস্থিতি তৈরি করে গেছে।’
তিনি বলেন, হামে সারা বাংলাদেশে অনেক শিশু মারা গেছে এবং লাখো শিশু আক্রান্ত হয়েছে। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কাজের অবহেলা এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ইউনিসেফের ভ্যাকসিন আমদানি বন্ধ করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গিয়ে ভ্যাকসিন আনা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে এই মারণব্যাধি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সারা বিশ্বে যখন কোনো হামের উপসর্গ নেই তখন বাংলাদেশে তাদের অবহেলার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বাদী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে শিশু জন্মের পর সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে হাম ও রুবেলার টিকা নিয়মিত ও বাধ্যতামূলকভাবে দেওয়া হয়। তবে ১ নম্বর আসামি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়মিত টিকা আমদানির যে প্রচলিত প্রক্রিয়া ছিল, তা বন্ধ করে দেয়। পরে উন্মুক্ত (টেন্ডার) দরপত্র প্রক্রিয়ায় টিকা আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দীর্ঘ দেড় বছর সময় ক্ষেপণ করা হয়, যার ফলে দেশে টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয়। অভিযোগে আরো বলা হয়, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার (মামলার ২ নম্বর সাক্ষী) গত ২০ মে গণমাধ্যমে জানান, হাম-রুবেলা টিকার সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে ১ থেকে ৫ নম্বর আসামির দপ্তরের পাঁচ-ছয়টি চিঠির মাধ্যমে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে আমদানিপ্রক্রিয়া বন্ধ না করার অনুরোধও জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার ও চরম অবহেলা প্রদর্শন করে সেই সতর্কবার্তায় কর্ণপাত করেননি।
টিকা না পাওয়ায় দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং মহামারি আকার ধারণ করে। মামলার আবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি হিসাবেই গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৫ হাজার ৭০৮ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। টিকার অভাবে সরকারি তথ্য মতেই দেশে প্রায় ৬১০ কোমলমতি শিশুর নির্মম মৃত্যু ঘটেছে এবং প্রায় ৭৫ হাজার ৭০০ শিশু শারীরিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অভিযোগে কয়েক শিশুর মৃত্যুর বিবরণ দিয়ে বলা হয়, চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের হারুনুর রশিদ ও ইশরাত জাহান দম্পতির দুই সন্তান আবদুল্লাহ আল ফাহিম গত ২ জুন এবং আবদুল্লাহ আল নোমান ২২ মে ঢাকার হাসপাতালে মারা যায়। ২২ এপ্রিল জাফরজান ইসলাম ও হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির একমাত্র সন্তান ফাইয়াজ হাসান তাজিম ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে।
বাদী অভিযোগে উল্লেখ করেন, আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ভিআইপি ব্যক্তি হওয়ায় স্থানীয় বনানী থানায় মামলা করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ মামলা না নিয়ে তা আদালতে করার পরামর্শ দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিসহ জেলহাজতে আটক রাখা এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়।

